পাচার ঠেকাতে স্কেল দিয়ে মাপা হচ্ছে ট্রাকের তেল
শনিবার যশোরের বেনাপোল স্থলবন্দরে পণ্য বোঝাই ভারতীয় ট্রাক ঢোকার সময় স্কেল দিয়ে তেল মাপছেন এক বিজিবি সদস্য। ছবি: সমকাল
সিলেট ব্যুরো, সুনামগঞ্জ ও বেনাপোল (যশোর) প্রতিনিধি
প্রকাশ: ০৭ মার্চ ২০২৬ | ২০:৩৬
আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের মূল্য বাড়ার পরিপ্রেক্ষিতে দেশের সীমান্ত এলাকায় সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নিয়েছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)। তেল পাচার রোধে সীমান্তরক্ষী বাহিনীর সদস্যরা টহল, তল্লাশি ও গোয়েন্দা নজরদারি বাড়িয়েছেন। যশোরের বেনাপোল স্থলবন্দরে ভারতীয় ও বাংলাদেশি ট্রাকের আসা-যাওয়ার পথে স্কেল দিয়ে তেল মাপা হচ্ছে।
ভারতীয় ট্রাক চালক নাজির হোসেন বলেন, ‘পণ্য নিয়ে আজ শনিবার বেনাপোল বন্দরে এসেছি। বন্দরে প্রবেশ ফটকের মুখে বিজিবি সদস্যরা ট্রাকের তেল স্কেল দিয়ে মেপেছেন। তারা বের হওয়ার সময় আবার মাপবেন বলে জানিয়েছেন।’
ইরানে ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্রের হামলার পরিপ্রেক্ষিতে মধ্যপ্রাচ্যে অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। হরমুজ প্রণালি বন্ধের ইরানি ঘোষণায় সারাবিশ্বে জ্বালানি তেল সরবরাহ বাধাগ্রস্ত হয়েছে। ফলে অন্য দেশের মতো বাংলাদেশেও জ্বালানি খাতে সংকট তৈরির আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
যশোর ৪৯ বিজিবি ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল সাইফুল্লাহ সিদ্দিকী বলেন, সাম্প্রতিক বৈশ্বিক অস্থিরতা ও যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দামে ঊর্ধ্বগতি দেখা দিয়েছে। এই সুযোগে অসাধু চক্র দেশে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি ও অধিক মুনাফার আশায় জ্বালানি তেল মজুত বা পাচারের অপচেষ্টা চালাতে পারে। বিজিবির সদরদপ্তরের নির্দেশ অনুযায়ী বেনাপোল স্থলবন্দর ও শার্শা সীমান্তে জনবল বাড়ানো হয়েছে। পাশাপাশি টহল ও গোয়েন্দা নজরদারি জোরদার করেছে।
এই কর্মকর্তা জানান, গুরুত্বপূর্ণ স্থানে অস্থায়ী চেকপোস্ট বসিয়ে তল্লাশি চালানো হচ্ছে। বিশেষ করে, যেসব রুট দিয়ে অতীতে ডিজেল ও পেট্রোল পাচারের চেষ্টা হয়েছে, সেসব পয়েন্টের সীমান্তবর্তী রুটে অতিরিক্ত বিজিবি সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। শুক্রবার বিকেল থেকে নিয়মিত টহলের পাশাপাশি সন্দেহজনক যে কোনো চলাচলের ওপর কঠোর নজর রাখা হচ্ছে।
নজরদারি সুনামগঞ্জের সীমান্তে
সুনামগঞ্জে পেট্রোলের দাম প্রতিলিটার ১১৬ টাকা হলেও সীমান্তলাগোয়া ভারতের মেঘালয় রাজ্যে শনিবার ছিল প্রতি লিটার ৯৮ দশমিক ৩২ রুপি অর্থাৎ প্রায় ১৩১ টাকা। এ কারণে সীমান্ত পথে পেট্রোল পাচার হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
এ পরিস্থিতিতে বিজিবি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, পাচার ঠেকাতে নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। শনিবার তাহিরপুরের শুল্ক স্টেশনে আসা কয়লাবোঝাই ভারতীয় ট্রাকে তল্লাশি করা হয়েছে। এসব ট্রাকের তেলের ট্যাঙ্কের মিটারও যাচাই করা হয়েছে।
জেলার বিশ্বম্ভরপুর সীমান্তের ডলুরা এলাকার বাসিন্দা এক ব্যবসায়ী জানিয়েছেন, ওপারের (ভারতের) ওয়েস্ট খাসিয়া হিলের পেট্রোল পাম্পে শনিবার পেট্রোলের দাম ছিল প্রতি লিটার ৯৮.৩২ রুপি ও ডিজেল ৮৭.৭১ রুপি। অর্থাৎ টাকায় প্রতি লিটার পেট্রোল ১৩১ ও ডিজেল ১১৭ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। অথচ সুনামগঞ্জে ১১৬ ও ১০০ টাকা লিটারে বিক্রয় হচ্ছে পেট্রোল-ডিজেল।
তার ভাষ্য, অতীতেও তেল নিয়ে গুজব বা সংকট দেখা দিলেই ভারতে পেট্রোল-ডিজেল পাচার করেছে চোরাচালানি চক্র।
সুনামগঞ্জ ২৮ বিজিবির অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল জাকারিয়া কাদির বলেন, ভারতের মেঘালয়ে বাংলাদেশের চেয়ে জ্বালানি তেলের দাম বেশি হওয়ায় পেট্রোল-ডিজেল পাচারের আশঙ্কায় শনিবার থেকে নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। এর অংশ হিসেবে ভারত থেকে আসা কয়লাবাহী ট্রাকের ট্যাঙ্কের মিটার দেখে লিখে রাখা হচ্ছে। আবার ফিরে যাওয়ার সময় মিটার দেখা হচ্ছে। এ ছাড়া ট্রাকের ভেতরেও তল্লাশি করা হচ্ছে।
পাম্পে যানবাহনের ভিড়
সুনামগঞ্জের দুটি পেট্রোল পাম্পেই ভিড় বেড়েছে। শনিবার বিকেল ৪টা থেকে ৫টা পর্যন্ত সরেজমিন দুটি পাম্পে গিয়ে দেখা গেছে, অসংখ্য মোটরসাইকেল লাইনে দাঁড়িয়ে আছে। কোনো পাম্পেই অকেটেন নেই। পেট্রোল-ডিজেল আছে। নির্ধারিত কোটায় পেট্রোল ও ডিজেল দিতে গিয়ে ক্রেতাদের সঙ্গে পাম্প কর্মচারীদের তর্কাতর্কি হচ্ছে।
তাহিরপুরের সোলেমান মিয়া এসেছিলেন মোটরসাইকেলে তেল নিতে। তিনি বলেন, ‘ট্যাঙ্কে চার-পাঁচ লিটার পেট্রোল আছে। এরপরও নিতে এসেছি। শুনেছি তেলের দাম বাড়বে, নাও পাওয়া যেতে পারে। এ জন্য তেল নিয়ে রাখার চেষ্টা করছি।’
লাইনে দাঁড়ানো অন্যরাও একই ধরনের মন্তব্য করলেন। ওয়েজখালীর বলাকা ফিলিং স্টেশনের কর্মচারী অমিত রায় বলেন, শুক্রবার থেকেই অকটেন নেই। পেট্রোল-ডিজেল আছে। অন্য সময়ের চেয়ে ভিড় বেড়েছে। অনেকে মনে করছেন, তেলের দাম বেড়ে যাবে। যারা আগে ৪০০ টাকার তেল কিনতেন, তারা ট্যাঙ্ক লোড করে নিচ্ছেন। বোতলেও নিতে আসছেন। তারা বোতলে দিচ্ছেন না। সরকারের নির্ধারিত কোটায় তেল দিচ্ছেন। এতে অনেকে বিরক্ত হচ্ছেন।
আতঙ্কিত না হওয়ার আহ্বান
তেল পাচারের শঙ্কায় সিলেট সীমান্তেও অতিরিক্ত সতর্কতা নিয়েছে ৪৮-বিজিবি। শনিবার বিজিবির পাঠানো সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ বিষয়ে তাদের উদ্যোগের কথা জানানো হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, সীমান্ত-সংলগ্ন এলাকা (শূন্যরেখা থেকে আট কিলোমিটার অভ্যন্তরে) ও স্থলবন্দর এলাকায় অতিরিক্ত সতর্কতা বজায় রাখা হচ্ছে। স্পর্শকাতর ও ঝুঁকিপূর্ণ সীমান্ত পয়েন্ট, নদীপথ ও চিহ্নিত রুটসমূহে টহল বাড়ানো, গোয়েন্দা তৎপরতা জোরদার, জ্বালানি স্টেশন ও পরিবহন কার্যক্রম মনিটরিং এবং সন্দেহভাজন রুটে অস্থায়ী চেকপোস্ট বসিয়ে আকস্মিক তল্লাশি পরিচালনা করা হচ্ছে।
শুক্রবার সিলেটের পেট্রোল পাম্পগুলোতে ভিড় দেখা গেলেও শনিবার ভিড় ছিল কম। সরকারি নির্দেশনামতো জ্বালানি বিক্রি হচ্ছে বলে কর্মীরা জানিয়েছেন। উপজেলা পর্যায়ের পেট্রোল পাম্প মালিকরা স্থানীয়ভাবে সংকট সৃষ্টির চেষ্টা করছেন বলে কৃষকরা জানিয়েছেন।
জ্বালানি তেল নিয়ে অযথা আতঙ্কিত না হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন সিলেট বিভাগীয় পেট্রোল পাম্প মালিক সমিতির নেতারা। সিলেট বিভাগীয় পেট্রোল পাম্প মালিক সমিতির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ব্যারিস্টার রিয়াসাদ আজিম আদনান বলেন, পেট্রোল ও অকটেনসহ অন্যান্য জ্বালানি তেলের সংকট নেই। সিলেটের ডিপোগুলো থেকে নিয়মিত সরবরাহ করা হচ্ছে।
