ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

৩০ শয্যার কিডনি ওয়ার্ডে ভর্তি থাকে ১০০ রোগী

৩০ শয্যার কিডনি ওয়ার্ডে  ভর্তি থাকে ১০০ রোগী
×

 শৈবাল আচার্য্য, চট্টগ্রাম

প্রকাশ: ১২ মার্চ ২০২৬ | ০৮:২৭

| প্রিন্ট সংস্করণ

কিডনির জটিলতায় অনেক রোগীকে প্রতি মাসে ৮ থেকে ১২ বার ডায়ালাইসিস করাতে হয়। বেসরকারিভাবে একবার ডায়ালাইসিস করতেই রোগীকে গুনতে হয় ছয় হাজার টাকার বেশি। এ হিসাবে প্রতি মাসে একজন রোগীর প্রয়োজন ৫০ থেকে ৬০ হাজার টাকা। গরিব রোগীর পক্ষে এ খরচ বহন করা অসম্ভব। সরকারিভাবে চিকিৎসায় খরচ কম হলেও সে সুযোগ অত্যন্ত সীমিত। এ কারণে অনেকেই চিকিৎসাবঞ্চিত।

চট্টগ্রাম অঞ্চলে কয়েক লাখ রোগীর একমাত্র ভরসা চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালের কিডনি ওয়ার্ডের অবস্থা নাজুক। এখানে ডায়ালাইসিস মেশিন মাত্র ১৫টি। তিন শিফটে প্রায় অর্ধশত রোগীর ডায়ালাইসিস করার সুযোগ আছে এখানে। অথচ প্রতিদিন সেবা নিতে আসা রোগীর সংখ্যা এর ১০ গুণ। এ কারণে ডায়ালাইসিসের সিরিয়াল পেতে চলে যায় কয়েক মাস। নির্ধারিত সময়ে ডায়ালাইসিস করাতে না পেরে অনেক রোগীর শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটে। হুমকিতে পড়ে অনেকের জীবন। 

বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান (বিআইডিএস) পরিচালিত এক গবেষণায় জানা গেছে, নিয়মিত ডায়ালাইসিস সেবা নিতে গিয়ে রোগীদের মাসে গড়ে ৪৬ হাজারের বেশি টাকা ব্যয় হয়। এই ব্যয় সামাল দিতে গিয়ে ৯৩ শতাংশ রোগীর পরিবার আর্থিক সমস্যায় পড়ে। টাকার অভাবে সাড়ে ১৯ শতাংশ রোগী প্রয়োজনের চেয়ে কম ডায়ালাইসিস করান। কম ডায়ালাইসিস করানো রোগীর মধ্যে ৯৫ শতাংশই কারণ হিসেবে অনেক বেশি ব্যয়ের কথা উল্লেখ করেছেন। ডায়ালাইসিসের পেছনে একজন রোগীকে মাসে সর্বনিম্ন ৬ হাজার ৬৯০ টাকা খরচ করতে হয়। বেসরকারি হাসপাতালে মাসে একজন রোগীর গড়ে খরচ হয় ৭৭ হাজার ৫৮৯ টাকা। সরকারি হাসপাতালে খরচ হয় ৩২ হাজার ৫৫২ টাকা। সবচেয়ে বেশি খরচ হয় ডায়ালাইসিস ফি ও হাসপাতালে যাতায়াত বাবদ।
চমেক হাসপাতালের কিডনি বিভাগটি এখনও স্বয়ংসম্পূর্ণ নয়। প্রতিষ্ঠার পর থেকে মাত্র চারটি ডায়ালাইসিস মেশিন দিয়ে সেবা কার্যক্রম চলে আসছিল ওয়ার্ডটিতে। এ অবস্থায় দূর-দূরান্ত থেকে আসা অনেক রোগীকে ফেরত যেতে হয়। চিকিৎসা নিতে এসে ডায়ালাইসিস মেশিন বাড়ানো, ফি কমানো, সেবা বাড়ানোসহ নানা দাবিতে একাধিকবার সড়কে নেমে বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করেছেন রোগী ও স্বজনরা। দাবির মুখে জোড়াতালি দিয়ে মেশিনের সংখ্যা ১৭টি করা হয়। তবে কিছুদিন পরপর কয়েকটি অচল হয়ে পড়ে থাকে। তাই সচল থাকা ১৩ থেকে ১৫টি মেশিন দিয়ে প্রতিদিন মাত্র ৪০ জনের মতো রোগীকে ডায়ালাইসিস করানো সম্ভব হয়। 

এ প্রসঙ্গে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন বলেন, ‘কিডনি রোগীর অন্যতম প্রধান চিকিৎসা হলো ডায়ালাইসিস। কিন্তু চট্টগ্রাম শহরেও ডায়ালাইসিস মেশিনের সংখ্যা একেবারে কম। এতে রোগীদের দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয়। অনেকে সময়মতো চিকিৎসা পান না। চিকিৎসার ব্যয়ভার বহন অধিকাংশ মানুষের জন্য কষ্টসাধ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাই কিডনি চিকিৎসা সহজলভ্য করতে সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগের সমন্বয় প্রয়োজন।’
চমেক হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. তসলিম উদ্দিন বলেন, ‘বৃহত্তর চট্টগ্রামের কিডনি রোগীদের একমাত্র ভরসা সদর হাসপাতাল হওয়ায় ওয়ার্ডে প্রতিনিয়ত রোগী বাড়ছে। রোগীর তুলনায় ডায়ালাইসিস মেশিনের সংখ্যা কম হওয়ায় চাপ সামাল দেওয়া কঠিন। কিডনি ওয়ার্ডকে স্বয়ংসম্পূর্ণ করতে এবং ডায়ালাইসিস মেশিনের সংখ্যা বাড়াতে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, মন্ত্রণালয়ে নানা প্রস্তাবনা পাঠিয়েছি।’ তিনি জানান, ডায়ালাইসিস মেশিন চেয়ে কয়েকটি সংগঠন, ট্রাস্টের কাছেও আহ্বান জানাতে বাধ্য হয়েছি আমরা। শাহানশাহ হযরত সৈয়দ জিয়াউল হক মাইজভাণ্ডারী (ক.) ট্রাস্ট-এর অর্থায়নে তিনটি ডায়ালাইসিস মেশিন প্রদান করা হয়। এর পরও রোগীর চাপ সামাল দিতে প্রতিনিয়ত হিমশিম খেতে হয় সবাইকে।

পঞ্চাশোর্ধ্ব রোগী ফিরোজা বেগম বলেন, ‘প্রতি মাসে আমার আটবার ডায়ালাইসিসের প্রয়োজন হয়। এর সঙ্গে আছে কয়েক প্রকারের ওষুধ। সবকিছু মিলিয়ে মাসে ৩০ হাজারের বেশি টাকা লাগে। দুই সন্তান আমার চিকিৎসা খরচ সামাল দিতে দিতে নিঃস্ব হয়ে গেছে।’ সুমন চৌধুরী নামে একজন বলেন, ‘মেশিন সংকটের কারণে কয়েক ঘণ্টা অপেক্ষার পরও বেশির ভাগ সময় আমার বাবার ডায়ালাইসিস করাতে পারি না। অনেক সময় ডায়ালাইসিস না করিয়েই ফিরে যেতে বাধ্য হই।’
চমেক হাসপাতালের ৩০ শয্যার কিডনি ওয়ার্ডে প্রতিদিন গড়ে ৭০ থেকে ১০০ রোগী ভর্তি থাকে। তাই মেঝেতে রেখেও অনেককে সেবা দিতে হয়।  
কিডনি বিভাগের চিকিৎসকরা বলেন, দ্রুত রোগ শনাক্ত না হওয়ায় অনেক রোগীর অবস্থা খারাপ হয়ে যায়। এতে কিডনি অকার্যকর হওয়ার ঝুঁকি বাড়ে। এ ক্ষেত্রে ডায়ালাইসিস বা কিডনি প্রতিস্থাপনের মতো ব্যয়বহুল চিকিৎসা নেওয়া জরুরি হয়ে পড়ে। সঠিক সময়ে ডায়ালাইসিস নেওয়া সম্ভব না হলে রোগীর মৃত্যুঝুঁকি বেড়ে যায়। কিডনি ডায়ালাইসিস সেবা এখনও শহরকেন্দ্রিক। তা ছাড়া কিডনি ওয়ার্ডটিও স্বয়ংসম্পূর্ণ নয়। 

আরও পড়ুন

×