সর্বনিম্ন দরদাতাদের বঞ্চিত করে কার্যাদেশ
রংপুর অফিস
প্রকাশ: ১২ মার্চ ২০২৬ | ০৮:৪৪
| প্রিন্ট সংস্করণ
রংপুরের গঙ্গাচড়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের টেন্ডার প্রক্রিয়ায় ব্যাপক অনিয়ম ও নিয়মবহির্ভূতভাবে কার্যাদেশ দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। ধোলাই, স্টেশনারি ও খাদ্য সরবরাহ-সংক্রান্ত টেন্ডারে কর্তৃপক্ষ সর্বনিম্ন দরদাতাকে বঞ্চিত করে পছন্দের প্রতিষ্ঠানকে কাজ পাইয়ে দিয়েছে বলে জানা গেছে। এ নিয়ে সুলতান মাহমুদ ডায়েল নামের এক ভুক্তভোগী ঠিকাদার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) বরাবর লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন।
স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স সূত্রে জানা গেছে, গত ১০ জানুয়ারি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ দৈনিক পত্রিকায় দরপত্র আহ্বান করে। ২৬ ফেব্রুয়ারি তিনটি ভিন্ন খাতে কার্যাদেশ প্রদানের ক্ষেত্রে সর্বনিম্ন দরদাতাদের বাদ দিয়ে উচ্চ দরদাতা প্রতিষ্ঠানগুলোকে কাজ দেওয়া হয়েছে।
কাজের টেন্ডারে মোট ৬টি প্রতিষ্ঠান অংশ নিলেও সর্বনিম্ন দরদাতা ‘অফি ট্রেডার্স’কে (২১ লাখ ২৫ হাজার ৭০ টাকা) বঞ্চিত করা হয়েছে। সরকারি নিয়ম উপেক্ষা করে কর্তৃপক্ষ পঞ্চম অবস্থানে থাকা ‘বাঁধন ট্রেডার্স’কে কার্যাদেশ দিয়েছে, যাদের দর ছিল অনেক বেশি (৩১ লাখ ৫৫ হাজার ১৫৬ টাকা)। একই চিত্র দেখা গেছে ধোলাই (লন্ড্রি) কাজের ক্ষেত্রেও। ৪টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ৩ লাখ ২৪ হাজার ৯৭০ টাকার সর্বনিম্ন দরদাতাকে কাজ না দিয়ে কার্যাদেশ দেওয়া হয়েছে পঞ্চম পর্যায়ের ‘সানি লন্ড্রি’কে, যার দর ছিল ৪ লাখ ৫০ হাজার টাকা।
এছাড়া স্টেশনারি সরঞ্জাম সরবরাহ কাজেও ৫টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সর্বনিম্ন দরদাতা ‘মেধা কনস্ট্রাকশন’ (৬ লাখ ৯১ হাজার ৪২৫ টাকা) কাজ পায়নি। অভিযোগ উঠেছে, এই সর্বনিম্ন দরদাতাকে বাদ দিয়ে অন্য একটি প্রতিষ্ঠানের নাম ব্যবহার করে কার্যাদেশ দেওয়া হয়েছে। প্রতিটি ক্ষেত্রেই সর্বনিম্ন দরদাতাদের পাশ কাটিয়ে পছন্দের প্রতিষ্ঠানকে কাজ পাইয়ে দেওয়ার মাধ্যমে সরকারি ক্রয় নীতিমালা লঙ্ঘন ও আর্থিক অনিয়মের প্রমাণ মিলেছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকজন ঠিকাদার বলেন, এমন অনিয়ম এবারই প্রথম নয়। গত অর্থবছরেও একই ধরনের অভিযোগ উঠেছিল। গত বছর খাদ্য সরবরাহের কার্যাদেশ পেয়েছিলেন আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত বাঁধন ট্রেডার্সের স্বত্বাধিকারী মো. শাহজাহান। এ বছরও সর্বনিম্ন দরদাতা প্রতিষ্ঠানকে পাশ কাটিয়ে বাঁধন ট্রেডার্সকেই ৩১ লাখ ৫৫ হাজার টাকায় খাদ্য সরবরাহের কার্যাদেশ দেওয়া হয়েছে। এতে স্থানীয় ঠিকাদারদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ বিরাজ করছে। তারা সরকারি ক্রয় প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে প্রশাসনের নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন।
এ বিষয়ে কথা বলতে বাঁধন ট্রেডার্সের স্বত্বাধিকারী মো. শাহজাহানের মোবাইল ফোনে একাধিকবার কল দেওয়া হয়; কিন্তু সাড়া মেলেনি।
অভিযোগকারী অফি ট্রেডার্সের স্বত্বাধিকারী সুলতান মাহমুদ ডায়েল বলেন, ‘কাজ পাইয়ে দিতে আর্থিক লেদেন হয়েছে। অথচ স্বাস্থ্য কর্মকর্তা একে সময় একেক ধরনের কথা বলছেন। দাখিলকৃত টেন্ডারে যদি কাগজপত্র অসম্পন্ন থাকে তাহলে আমার প্রতিষ্ঠান সর্বনিম্ন দরদাতা হয় কী করে!’
টেন্ডার প্রক্রিয়ায় অনিয়মের অভিযোগের বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে গঙ্গাচড়া উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. আলেমুল বাসার সরাসরি কোনো সন্তোষজনক ব্যাখ্যা না দিয়ে বিষয়টি সুকৌশলে এড়িয়ে যান। তবে তিনি দাবি করেন, ‘অনিয়মের অভিযোগ সঠিক নয়। এবারই প্রথম গঙ্গাচড়ায় ই-টেন্ডারের মাধ্যমে ঠিকাদাররা অনলাইনে দরপত্র দাখিল করেছেন, যেখানে আমার ব্যক্তিগত কোনো ভূমিকা রাখার সুযোগ নেই। পুরো বিষয়টি ডিজিটাল সিস্টেমের মাধ্যমে স্বয়ংক্রিয়ভাবে নির্ধারিত হয়।’
তিনি আরও যুক্তি দেন, ‘কাগজপত্র ও প্রয়োজনীয় নথিপত্র আপডেট না থাকলে শুধু সর্বনিম্ন দরদাতা হলেই কার্যাদেশ পাওয়া সম্ভব নয়। এই টেন্ডার কমিটিতে জেলা সিভিল সার্জন অফিসের প্রতিনিধি ও কনসালট্যান্ট ছাড়াও বিভিন্ন দপ্তরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা অন্তর্ভুক্ত থাকেন।’ তবে কমিটির অন্য সদস্যদের ভূমিকা থাকলেও কেন সর্বনিম্ন দরদাতাদের বাদ দেওয়া হলো, সে বিষয়ে তিনি কোনো স্পষ্ট উত্তর দেননি।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) জেসমিন আক্তার অভিযোগ পাওয়ার সত্যতা নিশ্চিত করে বলেন, ‘লিখিত অভিযোগটি আমরা পেয়েছি। বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট কাগজপত্র পর্যালোচনা করে তদন্ত করা হবে। তদন্তে অনিয়ম প্রমাণিত হলে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
এ বিষয়ে রংপুরের সিভিল সার্জন ডা. শাহীন সুলতানা বলেন, ‘লিখিতভাবে অভিযোগ না পেলেও ঘটনাটি শুনেছি। ই-টেন্ডারে সাধারণত অনিয়মের সুযোগ নেই। আর সর্বনিম্ন দরদাতাকেই কার্যাদেশ দিতে হবে এমন বাধ্যবাধকতাও নেই। তারপরও অভিযোগের বিষয়টি খতিয়ে দেখা হবে।’
- বিষয় :
- টেন্ডার
