রেশনের তালিকায় নাম-কার্ড নম্বর সবই আছে, নেই মানুষ
জিয়াউল হাসান পলাশ, ঝালকাঠি
প্রকাশ: ১৪ মার্চ ২০২৬ | ০৮:১৪
| প্রিন্ট সংস্করণ
ঝালকাঠি পুলিশ লাইন্সের রেশন স্টোর। বাইরে থেকে দেখলে সাধারণ একটি সরকারি গুদামঘর। প্রতিদিনের মতো এখান থেকে চাল, ডাল, তেলসহ নানা রেশনসামগ্রী তুলতেন পুলিশ সদস্যরা। কাগজে-কলমে হিসাবও মিলত ঠিকঠাক। কিন্তু ভিতরে ছিল এক অদৃশ্য তালিকা। যাদের তালিকায় নাম ও কার্ড নম্বর দুটোই ছিল, নেই শুধু মানুষ। দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) অনুসন্ধানে উঠে এসেছে এই অদৃশ্য তালিকা।
দুদক সূত্রে জানা যায়, ২০১৩ সাল থেকে ২০২১ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত ঝালকাঠি পুলিশ লাইন্সের রেশন স্টোরে ২৫২টি ভুয়া রেশন কার্ড তৈরি করা হয়। সেই কার্ড দেখিয়ে বছরের পর বছর রেশনসামগ্রী উত্তোলন করা হয়েছে। এইভাবে আত্মসাৎ করা হয়েছে ৩ কোটি ৯৪ লাখ ৪০ হাজার ৮৮৫ টাকা। এ ঘটনায় বৃহস্পতিবার ১১ জন পুলিশ সদস্য ও কর্মচারীর বিরুদ্ধে মামলা করেন পিরোজপুরে দুদকের সমন্বিত জেলা কার্যালয়ে সহকারী পরিচালক মো. জাকির হোসেন।
যেভাবে তৈরি হলো ‘ভূতুড়ে’ কার্ড
তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, রেশন স্টোরের হিসাবপত্রে এমন অনেক কার্ড নম্বর পাওয়া গেছে, যেগুলোর বিপরীতে বাস্তবে কোনো পুলিশ সদস্যের অস্তিত্ব নেই। এই কার্ডগুলো ব্যবহার করে নিয়মিত রেশন তোলা হতো। পরে সেই রেশন বাজারে বিক্রি করা বা অন্যভাবে নগদে রূপান্তর করতেন চক্রের সদস্যরা। অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছেন ঝালকাঠি পুলিশ লাইন্সের সাবেক মেস ম্যানেজারসহ কয়েকজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা ও কর্মচারী।
বছর বাড়ার সঙ্গে বেড়েছে জালিয়াতির অঙ্ক
মামলার নথি ঘেঁটে দেখা যায়, জালিয়াতির এই চক্র একদিনে তৈরি হয়নি; বরং বছর গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে এর পরিধি ও টাকার অঙ্ক বেড়েছে। জালিয়াতির শুরুটা হয়েছিল ২০১৩ সালের দিকে। ওই বছর ৬০টি ভুয়া কার্ড তৈরি করে প্রায় ১৪ লাখ ৮১ হাজার টাকা মূল্যের রেশন উত্তোলন করা হয়। পরের বছর ৫৬টি কার্ডে প্রায় ২৯ লাখ টাকার রেশন তোলা হয়। একই ধারা পরবর্তী দুই বছর অব্যাহত থাকে। এরপর ২০১৮ ও ২০১৯ সালে সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে আত্মসাতের পরিমাণ আরও বাড়ে। সবচেয়ে বড় অঙ্কের অত্মসাতের ঘটনা ঘটে ২০২০ ও ’২১ সালে। ২০২০ সালে ১৪৮টি ভুয়া কার্ডে প্রায় ৭৩ লাখ টাকার রেশন তোলা হয়েছে। পরের বছর ২৫২টি কার্ড ব্যবহার করে প্রায় ১ কোটি ৪০ লাখ টাকার রেশন উত্তোলন করা হয়। সব মিলিয়ে আট বছরে আত্মসাতের অঙ্ক দাঁড়ায় প্রায় চার কোটি টাকায়।
তদারকি নিয়েও প্রশ্ন
এই ঘটনা সামনে আসার পর বড় প্রশ্ন উঠেছে তদারকি নিয়ে। পুলিশ লাইন্সের রেশন স্টোরে নিয়ম অনুযায়ী কার্ড যাচাই, হিসাব মিলানো এবং নির্দিষ্ট কর্তৃপক্ষের পর্যবেক্ষণ থাকার কথা। তাহলে এত বছর ধরে কীভাবে ভুয়া কার্ডে রেশন তোলা হলো, সেই প্রশ্ন উঠছে। তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা উপপরিচালক মো. আমিনুল ইসলাম বলেন, হিসাবের খাতায় সবকিছু ঠিকঠাক দেখানোর চেষ্টা ছিল। কিন্তু বাস্তবের সঙ্গে মিলিয়ে দেখলেই গরমিল ধরা পড়ে।
পুলিশ সুপার মো. মিজানুর রহমান বলেন, মামলায় অভিযুক্তরা বর্তমানে বিভিন্ন জেলায় কর্মরত রয়েছেন। অভিযোগ প্রমাণিত হলে বিধি অনুযায়ী তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবে পুলিশ বিভাগ।
- বিষয় :
- তালিকা
