ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

চট্টগ্রামে ঈদবাজার

সব শ্রেণির মানুষের ভরসা জহুর হকার্স মার্কেট

সব শ্রেণির মানুষের ভরসা জহুর হকার্স মার্কেট
×

সাধ্যের মধ্যে স্বস্তিতে ঈদের কেনাকাটা করতে নিম্ন-মধ্যবিত্তদের অন্যতম ভরসা চট্টগ্রাম নগরের ঐতিহ্যবাহী জহুর হকার্স মার্কেট। প্রায় ৬২ বছরের পুরোনো এই মার্কেট এখন কেনাকাটায় জমজমাট। গতকাল শনিবার তোলা সমকাল

 শৈবাল আচার্য্য, চট্টগ্রাম

প্রকাশ: ১৫ মার্চ ২০২৬ | ০৭:৪২

| প্রিন্ট সংস্করণ

সাধ্যের মধ্যে স্বস্তির কেনাকাটার অন্যতম ভরসা চট্টগ্রাম নগরের ঐতিহ্যবাহী জহুর হকার্স মার্কেট। প্রায় ৬২ বছরের পুরোনো এই মার্কেট ঈদ উপলক্ষে এখন কেনাকাটায় জমজমাট। গতকাল শনিবার প্রধান প্রবেশ পথ দিয়ে ঢুকতে পাথরঘাটা এলাকার বাসিন্দা চাকরিজীবী ইমন হোসেনের সঙ্গে দেখা। তাঁর সঙ্গে স্ত্রী ও তিন ছেলেমেয়ে। পরিবারের ঈদের কেনাকাটা সচরাচর তিনি করেন নিউমার্কেট কিংবা অন্য কোনো শপিং সেন্টার থেকে। এবার এলেন হকার্সে। 

জানতে চাইলে ইমন বলেন, ‘এবার চাল, ডাল, তেল, মুরগিসহ বেশ কয়েকটি পণ্যের দাম বেশি। এর মধ্যে ঈদ মার্কেটেও পোশাক থেকে শুরু করে জুতা সবকিছুর দাম চড়া। ঈদের কেনাকাটা করতে দুই অভিজাত মার্কেটে গিয়েছিলাম। সেখানে আকাশচুম্বী দামের কারণে কেনাকাটা না করে ফিরতে হয়েছে। পরিবারের ঈদের কেনাকাটা করতে জহুর হকার্স মার্কেটে এসেছি। এখানে দাম তুলনামূলক কম, জিনিসের মানও খারাপ না।’
তিনি আরও বলেন, ‘বাজেটের মধ্যে কেনার সুযোগ থাকায় এটি আমার মতো অনেকের জন্য স্বস্তির ঠিকানা। এখানে পরিচিত অনেকের সঙ্গে দেখা হয়েছে। তারাও আমার মতো নির্দিষ্ট বাজেটে মার্কেট থেকে কেনাকাটা করতে না পেরে ছুটে এসেছেন।’

হকার্স মার্কেট ঘুরে ইমনের মতো আরও অনেক মধ্যবিত্তকে পাওয়া গেছে, যারা গত ঈদে চট্টগ্রামের কোনো মার্কেট কিংবা শপিং সেন্টারে কেনাকাটা করছিলেন। এবার তারা এসেছেন জহুর হকার্স মার্কেটে। এর প্রধান কারণ ঈদ পোশাকের বাড়তি দাম ও আয়ের সঙ্গে ব্যয়ের সামাল দিতে না পারা।
ক্রেতাদের অভিযোগ, মার্কেট-শপিং সেন্টারে গতবারের চেয়ে এবার পাঞ্জাবি থেকে শুরু করে শাড়ি, থ্রি-পিসসহ প্রায় সব পোশাকের দাম বেশি। গতবার শিশুর যে পাঞ্জাবি ৪০০ টাকায় কেনা গেছে, এবার একই পাঞ্জাবির দাম হাজার টাকার ওপরে। দুই-তিন হাজারের নিচে মিলছে না শিশুর একজোড়া জুতাও। এই পরিস্থিতিতে নির্দিষ্ট বাজেটে ঈদের কেনাকাটা করতে হিমশিম খাচ্ছেন অনেককেই। যে কারণে উপায় না পেয়ে মধ্যবিত্তদের অনেকেই ছুটছেন হকার্স মার্কেটে। 

হকার্স মার্কেটের প্রতিটি দোকানেই শিশু থেকে বয়স্ক সব বয়সীর নানা পণ্যের সমাহার। নামিদামি ব্র্যান্ড থেকে স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত ও আমদানি করা সব ধরনের পণ্যও রয়েছে এখানে। চট্টগ্রামের যে কোনো মানুষের কাছে অতিপরিচিত নাম জহুর হকার্স মার্কেট। চট্টগ্রাম নগরের ঐতিহাসিক লালদীঘি মাঠের পশ্চিমে অবস্থিত মার্কেটটির যাত্রা শুরু ১৯৬৪ সালে। এই অঞ্চলের সর্ববৃহৎ কাপড়ের পাইকারি ও খুচরা মার্কেট হিসেবে ঐতিহ্য রয়েছে এই মার্কেটের। এখানে থান কাপড়, তৈরি পোশাক, শাড়ি, পাঞ্জাবি, কসমেটিকস, জুতা, ঘড়িসহ প্রায় সব পণ্যই রয়েছে। এক সময় বিদেশি পুরোনো কাপড়ের রমরমা বাণিজ্য হতো এখানে। তবে বর্তমানে বেড়েছে দেশি-বিদেশি গার্মেন্টস পোশাকের সরবরাহ। বিভিন্ন দেশে রপ্তানি করা পোশাকও তুলনামূলক কম দামে পাওয়া যায় এ মার্কেটে।
গৃহিণী শিমলা হক বলেন, ‘আয়ের সঙ্গে ব্যয় সামাল দেওয়া কঠিন। তারপরও তো ঈদ করতে হবে। তবে আমাদের মতো নিম্ন-মধ্যবিত্তের পক্ষে অভিজাত মার্কেট থেকে ঈদের কেনাকাটা করা অসম্ভব। কারণ সেখানে প্রায় সবকিছুর দামই আকাশছোঁয়া। তাই এই হকার্স মার্কেটই আমার মতো অনেকের আস্থার ঠিকানা। এখানে আড়াই হাজার টাকায় তিন সন্তানের ঈদের বাজার করতে পেরেছি। সেটি অভিজাত মার্কেটে অসম্ভব।’

জহুর হকার্স ব্যবসায়ী সমিতির আহ্বায়ক কমিটির সদস্য সচিব জালাল উদ্দিন বলেন, ‘চট্টগ্রামের কম আয়ের মানুষদের কাছে হকার্স মার্কেট ভরসার অন্যতম ঠিকানা। কারণ মার্কেট, শপিং সেন্টারের তুলনায় এখানে সবকিছুর দাম অনেক কম। আমরা চাই সবাই যাতে কম টাকায় পছন্দের জিনিসটি কিনে আনন্দে ঈদ উদযাপন করতে পারেন। সেজন্য পোশাক থেকে শুরু করে জুতা সবকিছুর দামই ক্রয় ক্ষমতার মধ্যে রাখা হয়। এবার মধ্যবিত্তরাও নির্দিষ্ট বাজেটে এখান থেকেই সারছেন পরিবারের ঈদের কেনাকাটা।’ 
আরেক ব্যবসায়ী নেতা মো. হারুন বলেন, ‘অভিজাত মার্কেটে যে পোশাকটি দুই হাজার টাকায় কিনতে হয়, প্রায় একই পোশাক এখানে হাজারের নিচে পাওয়া যায়। এখানে একটু ভালোভাবে খুঁজলে কম টাকায় ভালো পোশাক পাওয়া যায়। এক্সপোর্ট কোয়ালিটির পোশাকও কম দামে পাওয়া যায়।’

তামাকুমন্ডি লেইন বণিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক বলেন, ‘বছরের ব্যবধানে ঈদ বাজারের আনুষঙ্গিক জিনিসের দাম বেড়েছে। এ কারণে কম টাকায় পরিবারের ঈদের কেনাকাটা করতে এক মার্কেট থেকে অন্য মার্কেটে ছুটছেন বেশির ভাগ ক্রেতা। অভিজাত মার্কেটের তুলনায় হকার্স মার্কেটে দাম তুলনামূলক কম হওয়ায় মধ্যবিত্তদের পছন্দের শীর্ষে রয়েছে জহুর হকার্স মার্কেট।’
কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) ভাইস প্রেসিডেন্ট এস এম নাজের হোসাইন বলেন, ‘ভোগ্যপণ্যের মতো ঈদ পোশাকের বাজারও চড়া। এতে পরিবারের জন্য ঈদের কেনাকাটা করতে হিমশিম খাচ্ছেন মধ্যবিত্তরা। পোশাক থেকে শুরু করে প্রায় সবকিছুর দাম বাড়তি থাকায় নির্দিষ্ট বাজেটে কয়েকটি মার্কেটে গিয়েও পছন্দের পোশাকটি কিনতে পারছেন না অনেকে। তাই হকার্স মার্কেট বেছে নিতে হচ্ছে।’

আরও পড়ুন

×