অস্বাভাবিক শিলাবৃষ্টিতে ফসল নিয়ে দুশ্চিন্তায় কৃষক
সিলেট ব্যুরো ও সুনামগঞ্জ প্রতিনিধি
প্রকাশ: ১৭ মার্চ ২০২৬ | ০৮:৩৮
| প্রিন্ট সংস্করণ
টানা তিন দিন ধরে ভারী বৃষ্টির পর গত শনিবার রাতে ও রোববার সকালে অস্বাভাবিক আকারের শিলাবৃষ্টিতে সিলেট ও সুনামগঞ্জের হাওর এলাকার ফসল নিয়ে চাষিদের মনে গভীর শঙ্কা দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে ধানের ছড়া ছাড়ার সময়ে ব্যাপক শিলাবৃষ্টিতে কৃষকের কপালে চিন্তার ভাঁজ দেখা দিয়েছে।
শনিবার রাত প্রায় ১টার দিকে সিলেট ও সুনামগঞ্জের বিভিন্ন উপজেলায় তীব্র শিলাবৃষ্টি হয়েছে। অস্বাভাবিক এই শিলাবৃষ্টিতে স্থানীয়দের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। শিলাবৃষ্টির আঘাতে ফসলি জমির পাশাপাশি উপজেলার বিভিন্ন গ্রামের বসতবাড়ির টিনের চাল ছিদ্র হয়ে ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।
এদিকে টানা ভারী বৃষ্টির কারণে হাওরের নিচু জমিগুলো পানিতে তলিয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে। অতিরিক্ত বৃষ্টিপাতের কারণে হাওরের ফসলরক্ষা বাঁধ নিয়েও নতুন করে শঙ্কা দেখা দিয়েছে।
কৃষি অফিসের তথ্যমতে, চলতি বোরো মৌসুমে সুনামগঞ্জের হাওরে প্রায় ২ লাখ ২৩ হাজার ৫১১ হেক্টর জমিতে ধান চাষাবাদ হয়েছে। স্বাভাবিক ফলন হলে ১৪ লাখ টন ধান উৎপাদনের সম্ভাবনা রয়েছে।
সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার দেখার হাওরপারের কৃষক ছইফউদ্দিন বলেন, তিনি এ বছর ১০ একর জমিতে বোরো ফসলের আবাদ করেছেন। ধানে এখন ছড়া আসার সময়। ৩-৪ দিনের বৃষ্টিতে জমি তলিয়ে যাওয়ায় মতো অবস্থা। রাতে দুই-তিনবার শিলাবৃষ্টি হচ্ছে। এতে ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। এই মুহূর্তে শিলাবৃষ্টি ফসলের জন্য ভালো লক্ষণ নয়। শিলাবৃষ্টি হলে ফসলের ক্ষতি অনিবার্য। এ কারণে ফসল নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়েছেন তিনি।
কৃষক সালাম মিয়া বলেন, হাওরজুড়ে ধানের ছড়া ছাড়ার সময় এখন। এখনই এত ঘন ঘন শিলাবৃষ্টির কারণে ফসল নিয়ে চিন্তায় পড়েছি। এতে ধানের সকল ছড়া ভেঙে যাবে। ভেঙে যাওয়া ধানের সকল ছড়া মরে যাবে। অনেক ক্ষতি হয়ে যাবে আমাদের। এভাবে যদি শিলাবৃষ্টি হয় তাহলে সবকিছু শেষ হয়ে যাবে। ধার দেনা করে ৭-৮ একর জমিতে চাষাবাদ করেছি ফসলের আশায়। আবহাওয়ার যে অবস্থা দেখা যাচ্ছে, এতে ভেতরে ভয় ঢুকে যাচ্ছে। ফসলের ক্ষতি হলে দিশেহারা হওয়া ছাড়া কোনো উপায় নাই। পাথরের কারণে ফসলের ক্ষতি হলে এটি আর পূরণ করা সম্ভব হবে না।
মধ্যনগরের কৃষক মনোয়ার হোসেন বলেন, শিলার আঘাতে হাওরের ধানের শীষ ভেঙে পড়েছে এবং অনেক জমির ধানগাছ নুয়ে পড়েছে। এছাড়া অনেকের ঘরের টিন ছিদ্র হয়ে গেছে। শিলাবৃষ্টি হাওর এলাকায় ব্যাপক ক্ষতির কারণ হয়েছে।
বলরামপুর গ্রামের বাসিন্দা মো. রতন মিয়া জানান, শনিবার রাতের শিলাবৃষ্টিতে তার ঘরের টিন ছিদ্র হয়ে ঘরটি বসবাসের অনুপযোগী হয়ে গেছে।
শাজদাপুর গ্রামের বাসিন্দা এমদাদুল হক বলেন, ‘আমাদের গ্রামে শতাধিক ঘর রয়েছে। দুই-তিনটি ঘর ছাড়া অন্যগুলোর টিন ছিদ্র হয়ে গেছে। এতে অনেক পরিবার বিপাকে পড়েছে।’
মধ্যনগর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা উজ্জ্বল রায় বলেন, গত শনিবার রাতের শিলাবৃষ্টিতে হাওর এলাকার ফসলি জমি ও ঘরবাড়ির ক্ষতি হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের খোঁজখবর নিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের উপ-পরিচালক মোহাম্মদ ওমর ফারুক জানান, ধর্মপাশা, মধ্যনগর, দিরাই, শান্তিগঞ্জ ও সুনামগঞ্জ সদর উপজেলাসহ জেলার বেশ কিছু এলাকায় বজ্রবৃষ্টি হয়েছে। এতে বোরো ধান-ভুট্টা, শাকসবজিসহ ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে।
এদিকে সিলেটে শিলাবৃষ্টির কারণে ফসল, গাছপালা ও কাঁচা ঘরের বেশ ক্ষতি হয়েছে। সিলেট আবহাওয়া অফিসের সহকারী আবহাওয়াবিদ রুদ্র তালুকদার জানিয়েছেন, শনিবার সকাল ৬টা থেকে রোববার সকাল ৬টা পর্যন্ত সিলেটে ৭১.৭ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। রোববার সকাল ৬টা থেকে ৯টা পর্যন্ত আরও ১২.২ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়।
সরকারি দপ্তরসহ স্থানীয় বাসিন্দারা জানিয়েছেন নগরী ছাড়াও সিলেট সদর উপজেলা, দক্ষিণ সুরমা, বিশ্বনাথ ও কানাইঘাটসহ বিভিন্ন এলাকায় বৃষ্টি ও শিলাবৃষ্টি হয়েছে।
বজ্রসহ বৃষ্টির কারণে সিলেটের বিভিন্ন স্থানে বিদ্যুৎ সরবরাহে বিঘ্ন ঘটে। নগরীর মিরের ময়দার এলাকায় ট্রান্সমিটারে সমস্যার কারণে দুপুর পর্যন্ত লাইনে সমস্যা দেখা দেয়। নগরীর বিভিন্ন এলাকায় গাছের ঢাল পড়ে থাকতে দেখা গেছে। গোয়াইনঘাট সীমান্ত এলাকায় একাধিক বাড়ির টিনের চাল বাতাসে উড়িয়ে নিয়ে গেছে।
- বিষয় :
- শিলাবৃষ্টি
