ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

গুলির শব্দে শুরু ঈদ জামাত, বিশ্বে এক অনন্য রেওয়াজ

গুলির শব্দে শুরু ঈদ জামাত, বিশ্বে এক অনন্য রেওয়াজ
×

শোলাকিয়া ঈদগাহ ময়দানে মুসল্লিরা জামাতে দাঁড়ান বন্দুকের গুলির আওয়াজে। ছবি-সমকাল

মোস্তফা কামাল, কিশোরগঞ্জ

প্রকাশ: ২০ মার্চ ২০২৬ | ১১:১৩ | আপডেট: ২০ মার্চ ২০২৬ | ১১:১৫

বিশ্বের বুকে এ যেন এক অভূতপূর্ব এবং অনন্য রেওয়াজ বা বিরল ঐতিহ্য। সব জায়গায় সকল ধরনের নামাজেই মুসল্লিরা জামাতে দাঁড়ান ইমামের একামতের মাধ্যমে। কিন্তু কিশোরগঞ্জের ঐতিহাসিক শোলাকিয়া ঈদগাহ ময়দানে দুই ঈদের জামাতেই মুসল্লিরা জামাতে দাঁড়ান বন্দুকের গুলির আওয়াজে। গুলির আওয়াজে জামাত শুরুর এই রেওয়াজ চলে আসছে সুদীর্ঘকাল ধরে। জামাত শুরুর ১০ মিনিটি আগে ৫টি, ৫ মিনিট আগে ৩টি এবং ১ মিনিট আগে দু’টি শর্টগানের গুলি ফুটিয়ে জামাত শুরুর সঙ্কেত দেওয়া হয়। প্রথম গুলিটি ছোঁড়েন দায়িত্বরত পুলিশ সুপার। ঈদগার পশ্চিম পাশে একটি টেবিলে সারিবদ্ধভাবে সাজিয়ে রাখা হয় বেশ কয়েকটি গুলি ভর্তি শর্টগান।

শোলাকিয়ায় এবার অনুষ্ঠিত হবে ১৯৯তম ঈদুল ফিতরের জামাত। এতে ইমামতি করবেন শহরের বড়বাজার জামে মসজিদের খতিব বিশিষ্ট মুফতি আবুল খায়ের মোহাম্মদ ছাইফুল্লাহ। যদিও ঈদগাহটি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে ১৭৫০ সালে। সেই হিসেবে ঈদগাহর বর্তমান বয়স ২৭৬ বছর। তখন থেকে প্রতি বছরই এখানে ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আযহার জামাত অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে। কিন্তু কথিত আছে, ১৮২৮ সালে এখানে সোয়ালাখ মুসল্লির অংশগ্রহণে তখনকার সময়ে সর্ববৃহৎ ঈদুল ফিতরের জামাত অনুষ্ঠিত হয়েছিল। সেই সময় থেকে জামাতের সংখ্যা গণনায় এবারের জামাতকে ধরা হচ্ছে ১৯৯তম। আর ‘সোয়ালাখ’ সংখ্যাটি থেকেই শব্দগত বিবর্তনের মধ্যে দিয়ে পরবর্তীতে এলাকাটির নামকরণ হয়েছে শোয়ালাখিয়া থেকে শোলাকিয়া।

জেলা প্রশাসক ও ঈদগাহ কমিটির সভাপতি মোহাম্মদ আসলাম মোল্লা বলেন, ঈদ জামাতে পর্যাপ্ত নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। পুরো ঈদগাহ এলাকা পর্যবেক্ষণে ৬৪টি সিসি ক্যামেরা স্থাপন করা হয়েছে। ১১শ’ পুলিশ সদস্যের পাশাপাশি চার প্লাটুন সেনা সদস্য, পাঁচ প্লাটুন বিজিবি, র‌্যাবের ছয়টি দল ও পাঁচ প্লাটুন আনসার সদস্য এবং এপিবিএন মোতায়েন থাকবে। আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর পাশাপাশি ১৩ জন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট দায়িত্ব পালন করবেন। শহরের গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় চেকপোস্ট স্থাপন করা হয়েছে। জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল বিভাগ পর্যাপ্ত সুপেয় পানির ব্যবস্থা রাখবে। থাকবে টিউবওয়েল। প্রয়োজনীয় সংখ্যক ওয়াশরুমও স্থাপন করা হয়েছে। মোতায়েন থাকবে ফায়ার সার্ভিসের ইউনিট ও মেডিক্যাল টিম।

জামাতে দূরবর্তী মুসল্লিদের যাতায়াতের সুবিধার্থে ময়মনসিংহ ও ভৈরব থেকে সকালে দু’টি ঈদ স্পেশাল ট্রেন যাতায়াত করবে। ভৈরব থেকে ট্রেন রওনা দেবে সকাল ৬টায়, কিশোরগঞ্জ পৌঁছবে সকাল ৮টায়। আর ময়মনসিংহ থেকে ট্রেন রওনা দেবে সকাল ৫টা ৪৫ মিনিটে, কিশোরগঞ্জ পৌঁছবে সকাল ৮টা ৩০ মিনিটে। জামাত শেষে ট্রেন দু’টি আবার মুসল্লিদের নিয়ে ফিরে যাবে।

পুলিশ সুপার ড. এসএম ফরহাদ হোসেন বলেন, ঈদগাহ ময়দানে চারটি ওয়াচ টাওয়ার থাকবে পুলিশের, দু’টি ওয়াচ টাওয়ার থাকবে র‌্যাবের। চার স্তরের নিরাপত্তা ব্যবস্থার অংশ হিসেবে থাকবে আর্চওয়ে, মেটাল ডিটেক্টর, এন্টি টেরোরিজম ইউনিটের বোমা নিষ্ক্রীয়করণ দল। থাকবে ক্যামেরাবাহী ড্রোন ও বাইনোকুলার ও স্নাইপার।

এখানে ঈদুল ফিতরের জামাতে কিশোরগঞ্জ ছাড়াও দেশের বিভিন্ন জেলার লাখ লাখ মুসল্লি অংশগ্রহণ করেন। স্থানীয় প্রশাসনের ধারণা, গতবছর ঈদুল ফিতরের জামাতে প্রায় ৬ লাখ মুসল্লি এখানে নামাজ আদায় করেছেন। ঈদগাহ কমিটির সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন জেলা প্রশাসক। সদস্য সচিব থাকেন সদর উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা। ২০১৬ সালে এখানে ভয়াবহ জঙ্গি হামলা হয়েছিল। এর পর থেকেই শোলাকিয় ঈদ জামাতকে কেন্দ্র করে নেওয়া হয় বাড়তি নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থা।

জেলা শহরের পূর্বপ্রান্তে নরসুন্দা নদীর তীরে প্রতিষ্ঠিত ঈদগাহ পরিপূর্ণ হয়ে বিপুল সংখ্যক মুসল্লিকে আশপাশের রাস্তা, পুকুরপাড়, পার্শ্ববর্তী বাসাবাড়ির আঙিনা, বাড়ির ছাদ, পতিত জমি, নদীর সুপ্রশস্ত সেতুসহ সকল খালি জায়গায় জামাতে কাতার বাঁধতে হয়। যে কারণে বিভিন্ন মহলের পক্ষ থেকে বহু বছর ধরেই ঈদগাহটি সম্প্রসারণের জোরালো দাবিও আছে। এছাড়া মূল ঈদগাহের পাশেই পর্দা ঘেরা স্থানে মহিলাদেরও নামাজের ব্যবস্থা করা হয়। ঈদের আগের দিন থেকেই অন্যান্য জেলা থেকে প্রচুর মুসল্লি চলে আসেন। তাঁদের জন্য আশপাশের স্কুল ও মসজিদে থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা করা হয়। সিসি ক্যামেরা স্থাপন ও বাইরের মুসল্লিদের খাওয়াদাওয়ার ব্যবস্থাসহ বিভিন্ন কাজে জেলা পরিষদ, পৌরসভা ও জেলা চেম্বার অব কমার্স সহযোগিতা করে থাকে। 

ঈদুল ফিতর উপলক্ষে ইদগাহের প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছে। ঈদকে আনন্দময় করে তোলার জন্য শহরকে বেশ কিছু তোরণ ও উৎসব পতাকা দিয়ে সজ্জিত করা হয়েছে। ঈদের দিন ভোরবেলা থেকেই মুসল্লিদের স্রোত বইতে থাকে ঈদগাহ অভিমুখে। সকাল ১০টায় জামাত শুরু হলেও সকাল ৯টার আগেই লাখ লাখ মুসল্লির সমাগমে পুরো ঈদগাহ যেন হয়ে ওঠে এক বিশাল জনসমুদ্র।

আরও পড়ুন

×