ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

রেলক্রসিংয়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে দুর্ঘটনার ভয়াবহ চিহ্ন 

রেলক্রসিংয়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে দুর্ঘটনার ভয়াবহ চিহ্ন 
×

এই রেলক্রসিংয়ে ঘটে দুর্ঘটনা। ঘটনাস্থলে পড়ে আছে বাসের ভাঙা চাকা

কুমিল্লা প্রতিনিধি   

প্রকাশ: ২২ মার্চ ২০২৬ | ১২:৩৭

কুমিল্লার পদুয়ার বাজার রেলক্রসিংয়ে মধ্যরাতে ভয়াবহ দুর্ঘটনার পর রোববার সকাল থেকে সেখানে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের উপস্থিতি বাড়তে থাকে। সকাল ৯টায় সেখানে গিয়ে দেখা যায়, রেলক্রসিংয়ের দুই পাশের প্রতিবন্ধক (বেরিয়ার) অক্ষত আছে। বাসের ভাঙা গ্লাস ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে আছে। ঘটনাস্থলের ১০ থেকে ১২ গজ দূরে রেললাইনে বাসের দুটি চাকা পড়ে থাকতে দেখা যায়। ঘটনাস্থলের পাশে রেলের কর্মীদের থাকার একটি কক্ষও (ই-৪৭) তালাবদ্ধ দেখা গেছে। 

শনিবার রাত পৌনে তিনটার দিকে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের কুমিল্লা সদর দক্ষিণ উপজেলার পদুয়ার বাজার রেলক্রসিংয়ে এ দুর্ঘটনায় অন্তত ১২ জন বাসযাত্রী নিহত হয়েছেন। এতে আরও ১০ থেকে ১৫ জন যাত্রী আহত হয়। দুর্ঘটনার পর রোববার সকাল ৮টার দিকে আখাউড়া থেকে উদ্ধারকারী ট্রেন ঘটনাস্থলে পৌঁছে উদ্ধার কাজ শুরু করে। সকাল সাড়ে ১০টার দিকে দুর্ঘটনাকবলিত ট্রেনটি কুমিল্লা রেলওয়ে স্টেশনে সরিয়ে নিতে দেখা যায়। ১১টার পর রেল যোগাযোগ স্বাভাবিক হয়।

পাশের চা দোকানি আবু তাহের বলেন, দিনে-রাতে এ রেলগেটে চারজন দায়িত্ব পালন করেন। ঘটনার রাতে দায়িত্বে কে ছিলেন তা তিনি জানেন না। 

ঘটনাস্থলে তদন্তে আসা পিবিআইয়ের একজন পরিদর্শক সমকালকে বলেন, ‘আহতদের বক্তব্য ও স্থানীয়ভাবে তদন্তে নিশ্চিত হওয়া গেছে ঘটনার সময় গেটম্যান গেট না ফেলায় বাস রাস্তা ফাঁকা পেয়ে রেল লাইনে উঠে যায়। এ সময় ট্রেনটি বাসটিকে অন্তত আধা কিলোমিটার দূরে নিয়ে যায়।’ 

এদিকে উদ্ধার অভিযানে আসা কুমিল্লা রেলওয়ে বিভাগের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন প্রকৌশলী সমকালকে বলেন, ২৪ ঘণ্টা ব্যস্ততম গেটে আমাদের লোকজন থাকে। গত রাতে গেটম্যান ভুলে হয়তো গেট ফেলেনি। তাকে সাসপেন্ড করার বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন। 

রেলওয়ের চট্টগ্রাম বিভাগের বিভাগীয় ব্যবস্থাপক মোস্তাফিজুর রহমান সাংবাদিকদের বলেন, এ দুর্ঘটনায় যাদের অবহেলা ছিল আমরা তদন্ত করে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেব। 

রেলওয়ের পক্ষ থেকে বিভাগীয় ও জোনাল দুটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটি কাজ শুরু করেছে। বেলা ১১টার দিকে রেল যোগাযোগ সচল হয়েছে বলেও তিনি জানান। আটকে পড়া মহানগর প্রভাতি ও কর্ণফুলী ঘটনাস্থল অতিক্রম করে গন্তব্যে গেছে। 

কুমিল্লা জেলা প্রশাসক মু. রেজা হাসান বলেন, আহতদের মধ্যে ১৮ জন প্রাথমিক চিকিৎসা শেষে চলে গেছেন। ৫ জন এখনো কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি আছেন। 

স্থানীয়রা জানান, চুয়াডাঙ্গা থেকে লহ্মীপুরগামী মামুন পরিবহন নামের একটি যাত্রীবাহী বাস রেললাইনে উঠে পড়ে। এ সময় চট্টগ্রাম থেকে ঢাকাগামী ওয়ান আপ ট্রেনের ধাক্কায় বাসটির ১২ জন নিহত এবং অন্তত ১৫ জন আহত হন। আহতদের উদ্ধার করে কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।

কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগের মেডিকেল অফিসার অজয় ভৌমিক বলেন, হতাহতদের হাসপাতালে আনা হয় রাত চারটার দিকে। ১২ জনের মরদেহ হাসপাতালে আছে। নিহতদের মধ্যে সাতজন পুরুষ, দু'জন নারী ও তিনজন শিশু রয়েছে। দুর্ঘটনায় আহত হয়েছেন আরও অন্তত ১০ জন।

কুমিল্লা ইপিজেড ফাঁড়ির ইনচার্জ মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম জানান, রাত তিনটার দিকে আমরা দুর্ঘটনা খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে হতাহতদের উদ্ধার করে হাসপাতালে পাঠিয়েছি। মৃতের সংখ্যা বাড়তে পারে।

রোববার সকালে ঘটনাস্থলে যান কুমিল্লা জেলা প্রশাসক মু. রেজা হাসান। তিনি সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমরা জেলা প্রশাসন থেকে নিহতদের জনপ্রতি ২৫ হাজার টাকা সহায়তা করবো।’ 

জেলা প্রশাসক বলেন, দুর্ঘটনা তদন্তে জেলা প্রশাসন ও রেলওয়ে পৃথক তিনটি তদন্ত কমিটি করেছে। অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মো. জাফর সাদিক চৌধুরীকে প্রধান করে পাঁচ সদস্যের কমিটি করেছে জেলা প্রশাসন। 

রেলওয়ের চট্টগ্রাম বিভাগের বিভাগীয় ব্যবস্থাপক মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘রেলওয়ের পক্ষ থেকে বিভাগীয় ও জোনাল আরও দুটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। উদ্ধার কাজ শেষ হলে চট্টগ্রামের সাথে রেলযোগাযোগ শুরু হবে। কার অবহেলায় এ দুর্ঘটনা তা তদন্তের পর বলা যাবে।’ 

দূর্ঘটনার বিষয়ে স্থানীয় বাসিন্দা শাহেনাজ আক্তার বলেন, ‘রাত পৌনে তিনটায় আওয়াজ শুনে রেললাইনে আসি। তখন রেলের লোকজনই উদ্ধার শুরু করে। আহতদের চিৎকারে এলাকার লোকজন ছুটে আসে। পরে আসে ফায়ার সার্ভিস ও পুলিশ।’ 

আহত যাত্রীরা জানান, ঢাকাগামী ওয়ান আপ ট্রেন কুমিল্লা নগরীর পদুয়ার বাজার রেল ক্রসিং এলাকায় পৌঁছালে চট্টগ্রাম অভিমুখী মামুন স্পেশাল পরিবহনের একটি বাসের সাথে সংঘর্ষ ঘটে। বাসটি চুয়াডাঙ্গা থেকে লক্ষীপুরের দিকে যাচ্ছিল বলে জানা গেছে। 

আহত যাত্রী তফাজ্জল হোসেন বলেন, প্রচন্ড আওয়াজে ঘুম ভেঙে যায়। পরে রক্তাক্ত অবস্থায় পুলিশ হাসপাতালে নিয়ে আসে।

ট্রেনের যাত্রী ও স্থানীয়রা অভিযোগ করেন, রেলগেটের সিগন্যাল ম্যানের অবহেলার কারণে এই দুর্ঘটনা ঘটেছে। দুর্ঘটনার পর জরুরি সেবা ৯৯৯ নম্বরে অনেকবার ফোন দিলেও কেউ কল রিসিভ করেনি।

পুলিশ জানায়, খবর পেয়ে পুলিশের পাশাপাশি ফায়ার সার্ভিস ও রেলওয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে উদ্ধার অভিযান শুরু করে। আহতদের কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে।

ফায়ার সার্ভিসের উপ-সহকারী পরিচালক মোহাম্মদ ইদ্রিস বলেন, বাস চালকের ভুলের কারণে এ ঘটনা ঘটেছে বলে আমরা প্রাথমিকভাবে ধারণা করছি। ফায়ার সার্ভিস কর্মীরা ঘটনাস্থল থেকে তিনজনের মৃতদেহ উদ্ধার করে কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠান। তার আগেই পুলিশ ও স্থানীয় লোকজন আরও কয়েকটি লাশ উদ্ধার করে হাসপাতালে পাঠায়। 

আরও পড়ুন

×