নিভৃতচারীর অন্যরকম বাড়ি
২০ বছর ধরে দামুড়হুদার ডুগডুগি গ্রামে আব্দুর রহিম একাই তৈরি করেন বাড়িটি। চুয়াডাঙ্গার ডুগডুগি গ্রাম থেকে তোলা সমকাল
বকুল আহমেদ, চুয়াডাঙ্গা থেকে ফিরে
প্রকাশ: ২৮ মার্চ ২০২৬ | ০৭:৪৭
| প্রিন্ট সংস্করণ
ঈদের দিন। চুয়াডাঙ্গা শহর থেকে মোটরসাইকেলে চেপে গন্তব্য দর্শনা। রাস্তার দুপাশে কোথাও ঘরবাড়ি, কোথাও বিস্তীর্ণ ধান, ভুট্টা আর গমক্ষেত। জয়রামপুরের কাঁঠালতলা পার হয়ে ডুগডুগি গ্রামের পশুহাটের কাছাকাছি মহাসড়কসংলগ্ন ছোট্ট জোড়াতালি দেওয়া দ্বিতল বাড়ির সামনে চোখে পড়ল তরুণ-তরুণীর ভিড়। মোবাইল ফোনে ছবি তুলতে ব্যস্ত তারা। কেউ বাড়িটির এবড়োখেবড়ো সিঁড়িতে উঠে ক্লিক করছে, কেউ রান্নার চুলার পাশে দাঁড়িয়ে।
মোটরসাইকেল থামিয়ে এক তরুণকে সেখানে ছবি তোলার কারণ জানতে চাইলে তিনি বললেন, ‘ভাই, এটা সেই ভাইরাল বাড়ি। বাড়িটি দেখতে পরিকল্পিত ভবনের মতো না হলেও এটি আলোচিত বাড়ি। নিভৃতচারী এক ব্যক্তি নিজ হাতে প্রায় ২০ বছর ধরে বাড়িটি তৈরি করে এখানে বাস করেন।’
দোতলা বাড়ি বলতে সাধারণত যেটা বোঝায়, তেমনটা না হলেও চুয়াডাঙ্গার দামুড়হুদার ডুগডুগি গ্রামের আব্দুর রহিম ওরফে রমে (৭০) নিজের মতো করে বানিয়েছেন বাড়িটি। কোনো রাজমিস্ত্রি বা জোগালির সহায়তা নেননি তিনি।
স্থানীয় লোকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ডুগডুগির বাসিন্দা রহিম মানসিক প্রতিবন্ধী। তারা পাঁচ ভাই ও এক বোন। তিনি মা বাবার তৃতীয় সন্তান। তাঁর মানসিক সমস্যার কারণে বহু বছর আগে স্ত্রী মরিয়ম খাতুন ও একমাত্র ছেলে আবু তাহের চলে যায়। নব্বই দশকের শুরুতে রহিম ডুগডুগি পশুহাটের মহাসড়কসংলগ্ন সরকারি জায়গায় খুপরি ঘরে একাই থাকতেন। ওই খুপরি ঘরের জায়গায়ই তিনি দোতলা বসতঘরটি তৈরি করেছেন।
এই বাড়ির পেছনেই টিনের চালায় বাস করে রহিমের প্রয়াত বড় ভাইয়ের স্ত্রী, ভাতিজার পরিবার। বড় ভাইয়ের পুত্রবধূ আদুরি খাতুন জানান, ১৯৯৮ সালে যখন তিনি এই বাড়িতে পুত্রবধূ হয়ে আসেন, তখন থেকেই চাচা শ্বশুরকে খুপরি ঘরের মধ্যে সিমেন্ট-বালু দিয়ে দেয়াল তৈরি করতে দেখেন। তিনি জানান, গ্রামবাংলার মাটির ঘরের মতো করে গড়ে তোলা হয়েছে দেয়াল। গামলায় বালু-সিমেন্ট মিশ্রণ ঘটিয়ে তা দলা আকৃতির করে এই দেয়াল তৈরি। ইট খুবই কম। খড়, তারের নেট, পুরোনো রড, কিছু খোয়া বিছিয়ে তার ওপর সিমেন্ট-বালুর মিশ্রণ ঢেলে ছাদ তৈরি করা হয়েছে। একইভাবে আস্তে আস্তে দোতলা করা হয়। বছর তিনেক আগে দোতলার ছাদের চারপাশেও দেয়াল তৈরির কাজ শুরু করেছিলেন রহিম। তবে স্বজনরা সেটি ভেঙে দেন। এলাকাবাসী জানান, নানা মানুষের কাছে চেয়ে চেয়ে যে টাকা-পয়সা রহিম পেতেন তার কিছু অংশ দিয়ে দু-চারটা করে ইট ও দুই-তিন কেজি করে সিমেন্ট কিনে আনতেন। সড়কের পাশ থেকেও ইট কুড়িয়ে এনে জড়ো করতেন।
সরেজমিন দেখা যায়, দোতলায় ওঠার জন্য এবড়োখেবড়ো সিঁড়ি করা হয়েছে। নিচতলায় চুলা ও একটি বসার টুলের মতো তৈরি করা হয়েছে। দোতলার গ্রিলের দরজার ফাঁকা দিয়ে ভেতরের কক্ষে রহিমকে শুয়ে থাকতে দেখা যায়। দুটি ছোট্ট কক্ষ। দরজা দিয়ে ঢুকে একটি, আরেকটি ভেতরে। ডাকাডাকি করলে রহিম তেড়ে আসেন। এক পর্যায়ে তিনি বলেন, আমার পাকা দালানে থাকার শখ ছিল। তাই স্বপ্নের বাড়িটি তৈরি করেছি।
- বিষয় :
- গ্রাম
