কুষ্টিয়ার কুমারখালী
গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে অবৈধ রেলক্রসিং, পারাপারে ঝুঁকি
কুমারখালী রেলস্টেশনের পূর্বপ্রান্তে ফুলতলা মোড়ে ট্রেনের পাশেই মোটরসাইকেল। রোববার দুপুরে তোলা। ছবি: সমকাল
কুমারখালী (কুষ্টিয়া) প্রতিনিধি
প্রকাশ: ২৯ মার্চ ২০২৬ | ২০:৩৭
কুষ্টিয়ার কুমারখালীতে ট্রেনের ধাক্কায় প্রাণ গেছে শফিকুল ইসলাম (৫২) নামের এক ব্যক্তির। আজ রোববার দুপুরে কুষ্টিয়া-রাজবাড়ী রেলপথের ফুলতলায় অনুমোদনহীন রেলগেটে দুর্ঘটনার শিকার হন তিনি। বিকেলে কুষ্টিয়া জেনারেল হাসপাতালে তিনি মারা যান।
এলাকাবাসীর ভাষ্য, ফুলতলা মোড়টি উপজেলা সদরের গুরুত্বপূর্ণ এলাকা হলেও এখানে গেট স্থাপনে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষের অনুমোদন নেই। যে কারণে রেলগেট বা সাইনবোর্ডও বসানো হয়নি। গেটম্যানও নিয়োগ দেওয়া হয়নি। এ কারণে প্রায়ই এখানে দুর্ঘটনা ঘটছে।
কুষ্টিয়ার-রাজবাড়ী রেলপথের কুমারখালী রেলস্টেশনের পূর্বপ্রান্তে অবস্থিত ফুলতলা মোড়। এর পাশেই কুমারখালী সরকারি কলেজ। যে কারণে এটি কলেজ মোড় নামেও পরিচিত স্থানটি। এটি কুমারখালী শহর, উপজেলা পরিষদ চত্বর, থানা, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ও সপ্তাহিক হাটে যাতায়াতের বিকল্প সড়কের মোড়। ফলে এখান দিয়ে প্রতিদিনই হাজার হাজার মানুষ চলাচল করেন।
প্রত্যক্ষদর্শী সূত্র জানায়, দুপুর ১২টার দিকে সুন্দরবন এক্সপ্রেস ট্রেনটি হর্ণ বাজিয়ে দ্রুতগতিতে রাজবাড়ী থেকে কুষ্টিয়ার দিকে যাচ্ছিল। তখন এলজিইডি অফিসের নিরাপত্তাকর্মী শফিকুল ইসলাম মোটরসাইকেলে ঝুঁকি নিয়ে ফুলতলা মোড় পার হওয়ার চেষ্টা করেন। মুহূর্তেই ট্রেনের ধাক্কায় তিনি ছিটকে পড়ে গুরুতর আহত হন।
কুষ্টিয়া জেনারেল হাসপাতালের আবাসিক স্বাস্থ্য কর্মকর্তা (আরএমও) হোচেন ইমাম বলেন, গুরুতর অবস্থায় শফিফুলকে হাসপাতালে নিয়ে আসা হয়েছিল। মাথা-পাসহ বিভিন্ন স্থানে আঘাত পেয়েছেন তিনি। প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে তাঁর মৃত্যু হয়েছে। শফিকুল কুমারখালীর সদকী ইউনিয়নের ঘাঁসখাল গ্রামের সেকেন্দার আলীর ছেলে।
কুমারখালী বাসস্ট্যান্ড এলাকার মিষ্টি ব্যবসায়ী কাজল হোসেন (৩১) বলেন, ফুলতলায় রেলগেট নেই। নিরাপত্তা কর্মীও নেই। প্রায়ই এখানে দুর্ঘটনা ঘটছে। আজ (রোববার) একজন মারা গেছেন। আগেও অনেকেই আহত হয়েছেন।
গত বছরের ২১ ডিসেম্বর দুপুরে সুন্দরবন এক্সপ্রেসের ধাক্কায় আহত হয়েছিলেন জগন্নাথপুর ইউনিয়ন যুবদলের সাবেক সভাপতি শহিদুল ইসলাম (৪০)। দুর্ঘটনায় তাঁর মোটরসাইকেলসহ দুটি মোটরসাইকেল দুমড়েমুচড়ে যায়। চিকিৎসা নিয়ে বর্তমানে সুস্থ শহিদুল ইসলাম। তিনি বলেন, ‘ব্যাংক থেকে বাড়ির দিকে ফিরছিলাম। পথিমধ্যে রেললাইনের মাঝামাঝি পৌঁছালে ট্রেনটি খুব কাছাকাছি চলে আসে। তখন মোটরসাইকেলটি পিছানোর চেষ্টা করি। কিন্তু পিছনে আরেকটি মোটরসাইকেল থাকায় সম্ভব হয়নি। তখন দিকবিদিক হারিয়ে লাফ মারি, আর ট্রেন এসে গাড়িটিকে ধাক্কা দেয়। এতে আমার হাত কেটে গেছে, পায়ে আঘাত লেগেছিলল।’ তাঁর ভাষ্য, গেট বসানো থাকলে এই ঝু্ঁকি নিতেন না। দ্রুত এখানে গেট স্থাপনের দাবি জানান তিনি।
ফুলতলা মোড়ে প্রায় ৯ বছর ধরে কলম, খাতা ও ফটোকপির ব্যবসা করছেন আব্দুল মালেক। তিনি বলেন, গেট না থাকায় ট্রেন আসছে জেনেও ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করে মানুষ। ঝুঁকি নিয়ে চলতে গিয়ে প্রায়ই তারা বিপদে পড়েন। অনেকই পার হতে না পেরে গাড়ি ফেলে কোনোমতো প্রাণে বাঁচে ফেরেন।
ভ্যানচালক মেজবর রহমান বলেন, ‘খুবই গুরুত্বপূর্ণ মোড় এটি। স্কুল কলেজের ছাত্র, ছাত্রী, স্যার, ব্যাপারীসহ প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ চলাচল করে। কিন্তু এখানে জীবনের নিরাপত্তা নেই। প্রায়ই দুর্ঘটনা ঘটে। রেলগেট না থাকায় এদিক-সেদিক খেলাল করে চলাচল করি। এখানে একটি গেট হলে সবারই ভালো হয়।’
এখানে মাঝেমাঝে দুর্ঘটনার কথা স্বীকার করেন কুমারখালী রেলস্টেশনের মাস্টার মো. শফিকুল ইসলাম। তিনি বলেন, সুন্দরবন এক্সপ্রেসের সঙ্গে একটি দুর্ঘটনায় একজন নিহত হয়েছেন। ফুলতলায় রেলক্রসিংয়ের অনুমোদন নেই। এ জন্য গেট স্থাপন হয়নি। স্থানীয় লোকজনের কাছ থেকে লিখিত আবেদন পেলে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠাবেন।
এলজিইডির উপজেলা প্রকৌশলী নাজমুল হক বলেন, ‘অফিসের কাজে গিয়ে ফেরার পথে ট্রেনের ধাক্কায় আমার এক সহকর্মী মারা গেছেন। ওই জায়গায় গেট বা নিরাপত্তা না থাকাটা দুঃখজনক।’
সরকারি কর্মচারী নিহতের ঘটনায় শোক প্রকাশ করেছেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ফারজানা আখতার। তিনি ফুলতলা এলাকায় রেলগেট স্থাপনে ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দেন।
