ঠিকমতো মেলে না সেবা কিনতে হয় ওষুধও
বাজিতপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের প্যাথলজি ল্যাবরেটরিতে ঝুলছে তালা। সোমবার সকাল ৮টা ২২ মিনিটে সমকাল
খন্দকার মাহবুবুর রহমান, বাজিতপুর (কিশোরগঞ্জ)
প্রকাশ: ৩১ মার্চ ২০২৬ | ০৭:৫৮
| প্রিন্ট সংস্করণ
৮০ বছরের রমিজ উদ্দিনের শ্বাসকষ্টের সমস্যা। দুই দিন ধরে ভর্তি আছেন কিশোরগঞ্জের বাজিতপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে। তাঁকে হাসপাতাল থেকে কিছু ওষুধ দেওয়া হলেও বেশির ভাগই কিনতে হচ্ছে বাইরে থেকে। একটিমাত্র নেবুলাইজার মেশিন থাকায় অন্য রোগীর সঙ্গে ভাগাভাগি করতে গিয়ে দুর্ভোগে পড়তে হচ্ছে উপজেলার তাতালচরের এই বাসিন্দাকে।
গতকাল সোমবার হাসপাতালে সরেজমিনে গিয়ে রোগীর ভোগান্তির ভয়াবহ চিত্র চোখে পড়ে। সংশ্লিষ্টদের দেওয়া তথ্যমতে, ৫০ শয্যার এই হাসপাতালে চিকিৎসক, কর্মচারী ও গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রপাতির সংকট চলছে দীর্ঘদিন ধরে। ফলে রোগীরা ঠিকমতো চিকিৎসাসেবা পাচ্ছেন না।
জানা গেছে, অতীতে বাজিতপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সটি ৩১ শয্যার ছিল। ২০১৮ সালের ১ জুলাই হাসপাতালের শয্যা ৫০টিতে উন্নীত করা হয়। ২০২৬ সালে এসেও এখানে প্রয়োজনীয়
চিকিৎসক-কর্মচারী নিয়োগ দেওয়া হয়নি। বছরের আট মাসই এখানে মাত্র তিন-চারজন চিকিৎসক পাওয়া যায়। তাদেরই বিপুলসংখ্যক রোগীর চাপ সামলাতে হয়।
গতকাল সকাল ৭টা ৫০ মিনিটে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে দেখা যায়, জরুরি বিভাগ খোলা থাকলেও অন্য সব কক্ষ বন্ধ। ৮টা ৬ মিনিটে একজন পরিচ্ছন্নকর্মী এসে হাসপাতালের মেঝে ঝাড়ু দেওয়া শুরু করেন। ৮টা ১৩ মিনিটে খোলা হয় চিকিৎসকদের কক্ষের তালা। প্যাথলজি ল্যাব খোলা হয় ৮টা ২৩ মিনিটে। হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা (আরএমও) ডা. রাবেয়া খাতুনসহ চার চিকিৎসক নিজ নিজ কক্ষে আসেন ৮টা ৪৭ মিনিটে।
এই হাসপাতালের বহির্বিভাগে প্রতিদিন গড়ে রোগী আসেন চারশ থেকে পাঁচশজন। তবে প্রয়োজনীয় চিকিৎসক, ওষুধ না পেয়ে অনেকেই ফিরে যান খালি হাতে। সোমবার সকাল পৌনে ১০টা পর্যন্ত ভর্তি রোগী ছিলেন ৬৪ জন। তাদের একজন উপজেলার পুরানগাঁ এলাকার সায়েদ মিয়া (৭০)। তিনি কাশি ও শ্বাসকষ্ট নিয়ে চিকিৎসাধীন। সাত দিনেও তাঁকে ছাড়পত্র দেওয়া হয়নি। সায়েদ মিয়া জানান, হাসপাতাল থেকে কিছু ওষুধ দেওয়া হয়। তবে বেশির ভাগই তাঁর স্বজনদের বাইরে থেকে কিনতে হচ্ছে।
হাসপাতাল থেকে পাওয়া তথ্যমতে, এখানে চিকিৎসকের ২২টি পদ আছে। বর্তমানে নিয়োগ আছে ১২ জনের। তাদের মধ্যে তিনজন চিকিৎসক প্রশিক্ষণে আছেন। দুইজন প্যাথলজিস্টের জায়গায় আছেন একজন। পরিসংখ্যানবিদ, অফিস সহায়কসহ ১২টি পদ দীর্ঘদিন ধরে শূন্য। হাসপাতালে কার্ডিওলজিস্ট বিশেষজ্ঞ, অর্থোপেডিক, শিশু বিশেষজ্ঞ, সার্জারি, গাইনি; নাক, কান ও গলা; চর্ম ও যৌন রোগ বিশেষজ্ঞসহ চিকিৎসকের ১০টি পদ জন্মলগ্ন থেকেই খালি। অপারেশন থিয়েটার বছরের পর বছর বন্ধ থাকে। মাঝেমধ্যে
সিজারিয়ান অপারেশন হয়। সংশ্লিষ্ট চিকিৎসক না থাকায় কিছু মূল্যবান যন্ত্রপাতি বছরের পর বছর স্টোর রুমে পড়ে আছে।
এখানে ইকোকার্ডিওগ্রামের মেশিন নেই। একমাত্র আলট্রাসনোগ্রাম মেশিন থাকলেও নেই সনোলজিস্ট। যে কারণে নিয়মিত আলট্রাসনোগ্রাম হয় না। শুধু মঙ্গলবার অন্তঃসত্ত্বা নারীদের আলট্রাসনোগ্রাম করাতে হয় বাইরের সনোলজিস্ট দিয়ে। যে কারণে জরুরি রোগীদের বাইরে থেকে আলট্রাসনোগ্রাম করতে গিয়ে ১১০০ থেকে ১২০০ টাকা গুনতে হয়।
এই হাসপাতালের অধীনে সরারচর, হালিমপুর, হিলচিয়া ও হুমায়ুনপুর ইউনিয়নে চারটি উপস্বাস্থ্যকেন্দ্র আছে। এগুলোর কোনোটিতেই মেডিকেল অফিসার নেই। মাঝেমধ্যে উপসহকারী কমিউনিটি মেডিকেল অফিসার (স্যাকমো) গিয়ে রোগী দেখেন। ফলে এসব ইউনিয়নের রোগীরা চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।
এ জন্য জনবল সংকটকেই দায়ী করেন উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. নাজমুস সালেহীন। তিনি সমকালকে বলেন, স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে দীর্ঘদিন ধরে চিকিৎসক ও কর্মচারীর সংকট। বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। হাসপাতাল কর্মীদেরও সঠিক সময়ে উপস্থিত থাকার নির্দেশনা দেওয়া আছে।
স্বাস্থ্য কর্মকর্তা আরও বলেন, তিনি নিজে ও মেডিকেল অফিসার কামরুন্নাহার দিলু আলট্রাসনোগ্রামের ওপর প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত। তারাই প্রতি মঙ্গলবার অন্তঃসত্ত্বা নারীদের আলট্রাসনোগ্রাম করেন। আগে বাইরে থেকে গাইনি চিকিৎসক এনে সিজারিয়ান অপারেশন করা হতো। ডা. কামরুন্নাহার দিলু গাইনিতে এফসিপিএস করেছেন। তাই তিনিই এখন সিজার করছেন।
- বিষয় :
- সেবামুলক উদ্যোগ
