ঢাকা শুক্রবার, ০৫ জুন ২০২৬

নেতৃত্ব সংকটে চা বাগান বাড়ছে শ্রমিক অসন্তোষ

নেতৃত্ব সংকটে চা বাগান বাড়ছে শ্রমিক অসন্তোষ
×

 মো. আইয়ূব খান, মাধবপুর (হবিগঞ্জ)

প্রকাশ: ৩১ মার্চ ২০২৬ | ০৮:০৯

| প্রিন্ট সংস্করণ

হবিগঞ্জের মাধবপুর উপজেলার বিভিন্ন চা বাগানে দীর্ঘদিন ধরে শ্রমিক প্রতিনিধি ও বলিষ্ঠ নেতৃত্বের অভাবে বাগানের শ্রমিক সংগঠনগুলোর কর্মকাণ্ডে ভাটা পড়েছে। নির্বাচন না হওয়ায় সৃষ্টি হয়েছে নানা সংকট, কোন্দল ও অসন্তোষ। এ নিয়ে উদ্বিগ্ন শ্রমিকরা।
চা শ্রমিকরা জানান, নিয়ম অনুযায়ী প্রতি দুই বছর পরপর শ্রমিক প্রতিনিধি নির্বাচন হওয়ার কথা। তবে গত আট বছর ধরে কোনো নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়নি। ফলে বাগানগুলোতে শ্রমিক নেতৃত্বে শূন্যতা তৈরি হয়েছে। এ ছাড়া দ্বন্দ্ব, কোন্দলে দূরত্ব সৃষ্টি হওয়ায় প্রয়োজনের সময় শ্রমিক ঐক্য গড়ে তোলা যাচ্ছে না।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক শ্রমিক সংগঠনের সদস্য জানান, শ্রমিকদের মধ্যে বিভক্তি ও দলাদলি দিন দিন বাড়ছে। এতে উৎপাদন কার্যক্রম, শৃঙ্খলা ও শ্রমিকদের অধিকার আদায়ের কার্যক্রমে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, উপজেলার নোয়াপাড়া, বৈকুণ্ঠপুর, জগদীশপুর, সুরমা ও তেলিয়াপাড়া– এই পাঁচটি চা বাগানে দীর্ঘদিন ধরে নির্বাচন না হওয়ায় সার্বিক উন্নয়ন কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। শ্রমিকদের অভিযোগ, নির্বাচিত প্রতিনিধি না থাকায় তাদের সমস্যা যথাযথভাবে কর্তৃপক্ষের কাছে উপস্থাপন করা যাচ্ছে না। ফলে দৈনন্দিন নানা সমস্যা যেমন– মজুরি, বাসস্থান, স্বাস্থ্যসেবা ও শিক্ষা সুবিধা নিয়ে ক্ষোভ বাড়ছে। শ্রমিকদের মতে, নির্বাচনের মাধ্যমে যোগ্য ও দায়িত্বশীল নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হলে তাদের অধিকার আদায় সহজ হবে এবং বাগানের সার্বিক পরিবেশ উন্নত হবে। বর্তমানে নেতৃত্বের অভাবে অনেক ক্ষেত্রে ছোটখাটো বিষয়ও বড় আকার ধারণ করছে, যা বাগানের শান্তিপূর্ণ পরিবেশকে ব্যাহত করছে।

তেলিয়াপাড়া চা বাগানের সাবেক সভাপতি অরুণ ভুমিজ বলেন, প্রায় আট বছর আগে সর্বশেষ নির্বাচন হয়েছিল। এরপর বহুবার সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে নির্বাচন আয়োজনের দাবি জানানো হলেও কোনো কার্যকর উদ্যোগ দেখা যায়নি। নির্বাচনের মাধ্যমে শ্রমিকদের মতামত প্রতিফলিত হয় এবং নেতৃত্বের জবাবদিহি নিশ্চিত হয়।
সুরমা চা বাগানের শ্রমিক নেতা গোপেশ ভুমিজ জানান, নির্বাচন না হওয়ায় শ্রমিকদের কথা তুলে ধরার মতো কার্যকর কোনো প্ল্যাটফর্ম নেই। এতে অনেক সমস্যা অমীমাংসিত থেকে যাচ্ছে এবং শ্রমিকদের মধ্যে অসন্তোষ বাড়ছে। দ্রুত নির্বাচন আয়োজন না হলে পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে।

নোয়াপাড়া চা বাগানের সাবেক সদস্য শ্যামল ব্যানার্জি বলেন, নির্বাচন না হওয়ায় বাগানে শৃঙ্খলা নষ্ট হচ্ছে। শ্রমিকদের মধ্যে বিভাজন তৈরি হয়েছে, যা সামগ্রিক পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর। আগে নির্বাচিত প্রতিনিধির মাধ্যমে সমস্যা সমাধান সহজ ছিল, এখন তা সম্ভব হচ্ছে না।
বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়নের সাবেক সাধারণ সম্পাদক রামভজন কৈরি বলেন, গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় নিয়মিত নির্বাচন হওয়া অত্যন্ত জরুরি। এতে শ্রমিকদের অধিকার রক্ষা সহজ হয় এবং নেতৃত্বের মধ্যে জবাবদিহি তৈরি হয়। নির্বাচন না থাকলে স্বচ্ছতা ও সমন্বয় নষ্ট হয়, যা দীর্ঘ মেয়াদে শিল্পের জন্যও ক্ষতিকর। নির্বাচন না হওয়ায় শুধু শ্রমিকরাই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন না বরং চা শিল্পের সামগ্রিক উৎপাদন ও স্থিতিশীলতাও ঝুঁকির মুখে পড়ছে। তারা দ্রুত নির্বাচন আয়োজনের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।
এ বিষয়ে মাধবপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জাহিদ বিন কাশেম বলেন, গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় নিয়মিত নির্বাচন অনুষ্ঠিত হোক শ্রমিক সংগঠনগুলোতে। নির্বাচন হলে বাগানের সার্বিক পরিস্থিতির উন্নতি হবে এবং শ্রমিকদের ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করা সহজ হবে। এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করা হচ্ছে।
শ্রমিকদের জোর দাবি, দীর্ঘদিনের এই অচলাবস্থা নিরসনে দ্রুত সময়ের মধ্যে নির্বাচন আয়োজন করা হোক। অন্যথায় চা বাগানগুলোতে বিদ্যমান সংকট আরও গভীর হয়ে উঠতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
 

আরও পড়ুন

×