ভোটের পরে চরমোনাইর প্রথম মাহফিলে নতুন মেরুকরণ
সুমন চৌধুরী, বরিশাল
প্রকাশ: ০১ এপ্রিল ২০২৬ | ০৭:৫৬
| প্রিন্ট সংস্করণ
বরিশালে চরমোনাই পীরের দরবারে বার্ষিক তিন দিনব্যাপী ওয়াজ মাহফিল আজ বুধবার শুরু হচ্ছে। গত ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের পর এটি চরমোনাইর প্রথম মাহফিল। নির্বাচনপরবর্তী রাজনৈতিক পরিবর্তনের সঙ্গে মাহফিলে অতিথি গ্রহণেও পরিবর্তন এসেছে।
জোহরের নামাজের পর পীর সৈয়দ মুহাম্মদ রেজাউল করীম উদ্বোধনী বয়ানের মধ্য দিয়ে তিন দিনের মাহফিল শুরু করবেন। শনিবার সকালে আখেরি মোনাজাতের মাধ্যমে মাহফিল শেষ হবে। রীতি অনুযায়ী মাহফিলে দ্বিতীয় দিন বৃহস্পতিবার ওলামা-মাশায়েখ ও তৃতীয় দিন ছাত্র মহসমাবেশ হবে। প্রতিবছর ফেব্রুয়ারি ও নভেম্বর মাসের শেষ সপ্তাহে চরমোনাইতে দুটি মাহফিল হয়। এবার ফেব্রুয়ারিতে জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও পর পরই রমজান মাস শুরু হওয়ায় এপ্রিলের প্রথম দিন মাহফিল শুরুর দিন নির্ধারিত হয়।
মাহফিল সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীলদের সূত্রে জানা গেছে, এবারের মাহফিলে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) কেন্দ্রীয় নেতাদের বড় বহর অংশ নিচ্ছেন। নির্বাচনের আগের কয়েকটি মাহফিলে সরবে অংশ নেওয়া জামায়াত নেতারা এবারের মাহফিলে থাকছেন না। বিএনপির সর্বোচ্চ পর্যায়ের নেতারা মাহফিলে অংশ নিতে চাইলেও পীর পরিবার থেকে আগ্রহ দেখানো হয়নি।
সূত্রগুলো জানিয়েছে, মাহফিলের প্রথম দিন বুধবার (আজ) রাতে চরমোনাইতে পৌঁছবেন এনসিপির মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া, মুখ্য সংগঠক সারজিস আলম ও সরোয়ার তুষারসহ দলটির উল্লেখযোগ্য সংখ্যক নেতা। তারা চরমোনাইতে রাতযাপন এবং বৃহস্পতিবার দুপুরে ওলামা-মাশায়েখ সমাবেশে বক্তব্য দেবেন। বৃহস্পতিবার রাতে তারা চরমোনাই ত্যাগ করবেন এবং দলের আরেকটি বহর শুক্রবার চরমোনাইতে পৌঁছাবেন। এই অংশটি শনিবার আখেরি মোনাজাত পর্যন্ত সেখানে অবস্থান করবেন।
সংশ্লিষ্ট সূত্রটি নিশ্চিত করেছে, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানও মাহফিলে যেতে আগ্রহী ছিলেন। কিন্তু পীর পরিবার থেকে সাড়া দেওয়া হয়নি। এ ক্ষেত্রে তাদের যুক্তি, প্রধানমন্ত্রীর নিরাপত্তার জন্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কার্যক্রমে সাধারণ মুসল্লিরা হয়রানি হবেন। এমনকি, রাষ্ট্রীয় দায়িত্বপ্রাপ্ত কারও মাহফিলে অংশগ্রহণের ব্যাপারে মাহফিল কর্তৃপক্ষ আগ্রহী নয়। নিয়মমাফিক রাজনৈতিক গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের মাহফিলে অংশ নিতে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। এ ক্ষেত্রে জামায়াতে ইসলামীকে এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে।
ইসলামী আন্দোলনের বরিশাল মহানগর সহকারী সম্পাদক ও মিডিয়া সেলের আহ্বায়ক নাইস সমকালকে বলেন, রাজনৈতিক মতাদর্শের কারণে জামায়াতকে চরমোনাইর মাহফিলে আমন্ত্রণ করা হয়নি।
এনসিপি নেতাদের মাহফিলের আসার বিষয়টি নিশ্চিত করে ইসলামী আন্দোলনের কেন্দ্রীয় মিডিয়া সেলের সদস্য কে এম শরীয়ত উল্লাহ সমকালকে বলেন, ইসলামী আন্দোলনের রীতি অনুযায়ী শীর্ষ রাজনৈতিক নেতাদের মাহফিলে আমন্ত্রণ করা হয়েছে। এর বেশি কিছু বলতে তিনি অস্বীকৃতি জানান।
বিএনপির কেন্দ্রীয় নির্বাহী সদস্য আবু নাসের রহমত উল্লাহর বাড়ি চরমোনাই ইউনিয়নে। তিনি বলেন, আগে তিনটি মাহফিলে বিএনপির প্রতিনিধি দল অংশগ্রহণ করেছে। এতে তিনিও ছিলেন। এবার প্রতিনিধি দল যাবেন কিনা– এ বিষয়ে তাঁকে জানানো হয়নি।
মাহফিল ধর্মীয় সমাবেশ হলেও চরমোনাই দরবারের মাহফিল রাজনৈতিক গুরুত্ব বহন করে। পীর পরিবার নিয়ন্ত্রিত দল ইসলামী আন্দোলন বাংলদেশ দেশে দ্বিতীয় বৃহৎ ধর্মভিত্তিক দল। অতীতে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতা ও রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিরা মাহফিলে অংশ নিয়েছেন। তবে রাজনৈতিক ও ধর্মীয় মতাদর্শে ভিন্নমত থাকায় জামায়াত নেতারা চরমোনাইতে যেতেন না।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট গণঅভ্যুত্থানের পর জামায়াত ও ইসলামী আন্দোলনের দূরত্বের সাময়িক অবসান হয়। বিভেদ ভুলে জামায়াত আমির ডা. শফিকুর রহমান গতবছর ২১ জানুয়ারি চরমোনাইতে গিয়েছিলেন। এর পরের প্রতিটি মাহফিলে জামায়াতের কেন্দ্রীয় প্রতিনিধি অংশগ্রহণ করেন। সর্বশেষ গত নভেম্বরের মাহফিলে জামায়াতের জেষ্ঠ নায়েবে আমির মো. মুজিবর রহমান অংশ নেন। ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে আসন ভাগাভাগি প্রশ্নে এ দুটি দলের মধ্যে ফের প্রকাশ্যে বিরোধ দেখা দেয়। নির্বাচনে জামায়াতের জোটসঙ্গী এনসিপি আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামসহ শীর্ষ নেতারা এর আগে ১৪ জুলাই চরমোনাই দরবারে গিযে রাতের ভোজ করেন।
অন্যদিকে, বিএনপির প্রতিনিধি দল সর্বশেষ চরমোনাই মাহফিলে অংশ নিয়েছিল ২০২৩ সালে ১৭ ফেব্রুয়ারি। কেন্দ্রীয় উপদেষ্টা ও বর্তমান তথ্যমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন এবং ভাইস চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট জয়নুল আবেদীনের নেতৃত্বে ১০ সদস্যর প্রতিনিধি দল চরমোনাইতে গিয়েছিলেন।
- বিষয় :
- চরমোনাই
