জমি কেটে বালু সংগ্রহ, নদীতে ভাঙন
দোয়ারবাজার উপজেলার নরসিংহপুর ইউনিয়নের সোনালি চেলা নদী থেকে চলছে বালু উত্তোলন সমকাল
ছাতক (সুনামগঞ্জ) প্রতিনিধি
প্রকাশ: ০৮ এপ্রিল ২০২৬ | ০৭:৫৯
| প্রিন্ট সংস্করণ
সম্প্রতি নদীভাঙনে বিপর্যয়ের মুখে পড়েছেন দোয়ারাবাজার উপজেলার সোনালি চেলে নদী-তীরবর্তী মানুষ। এমন পরিস্থিতিতে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠায় দিন কাটছে সেখানকার বাসিন্দাদের।
স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রভাবশালীদের ছত্রছায়ায় নদী থেকে অবৈধভাবে বালু উত্তোলনে সক্রিয় রয়েছে একাধিক চক্র। তারা আইন-শাসন সবকিছু উপেক্ষা করে বেপরোয়াভাবে উত্তোলন করছে সোনালি চেলা নদীর বালু। প্রায় এক বছর ধরে অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের কাজ করে যাচ্ছে স্থানীয় একটি চক্র। তাদের বিরুদ্ধে কথা বলার কেউ নেই। প্রকাশ্যে আইনের অবমাননার পরেও তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয় না প্রশাসন। বেআইনিভাবে নদীর তীর কেটে বালু উত্তোলন করা হলেও নেই শাস্তির প্রয়োগ।
সরেজমিনে সেখানকার বিভিন্ন এলাকায় দেখা যায়, বালুখেকোদের তাণ্ডবে ধীরে ধীরে মুছে যাচ্ছে দোয়ারাবাজার উপজেলার নরসিংপুর ইউনিয়নের একাধিক গ্রামের বসতভিটা ও ফসলি জমি।
স্থানীয় প্রশাসন মাঝে মাঝে অভিযান চালিয়ে বালু, নৌকা আর পরিবহন শ্রমিকদের আটক করলেও এই চক্রের ওপর মহলের কারিগরদের নাগাল পান না; যার কারণে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন অভিযান চালিয়েও দমানো যাচ্ছে না।
এদিকে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন বন্ধ ও জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের দাবিতে গত সপ্তাহে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বরাবর লিখিত অভিযোগ করেছেন স্থানীয় রহিমের পাড়া গ্রামের বাসিন্দা আব্দুর রউফ।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, টাকার লোভে এক শ্রেণির জমির মালিক সোনালি চেলা নদী-তীরবর্তী জমির মাটি বিক্রি করে দিচ্ছেন প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের কাছে। ওই প্রভাবশালী চক্র আইন-কানুনের তোয়াক্কা না করে প্রতিদিন সোনালি চেলা নদীর তীরবর্তী জমির মাটি কেটে বালু লুটপাট করছে। যে কারণে শুষ্ক মৌসুমেও নদীতে বিলীন হচ্ছে শত শত একর বসতভিটা ও ফসলি জমি।
ভুক্তভোগী এলাকাবাসীর অভিযোগ, জেলা প্রশাসন প্রতিবছর মোটা অঙ্কের রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যে পরিবেশগত সমীক্ষা ছাড়াই সোনালি চেলা নদীটিকে বালুমহাল হিসেবে ইজারা দিচ্ছে। নদীতে পর্যাপ্ত বালু না থাকায় ইজারাদারের লোকজন স্থানীয় সিন্ডিকেটের সঙ্গে যোগসাজশে নিয়মিতই তীর কেটে বালু সংগ্রহ করছে।
গত দুই বছরে তীর কেটে নেওয়ার ফলে সারপিনপাড়া গ্রামের শতাধিক পাকা ও কাঁচা ঘরবাড়ি নদীতে বিলীন হয়ে গেছে। তীব্র ভাঙনের কবলে পড়েছে সোনালি চেলা নদী-তীরবর্তী সারপিনপাড়া, পূর্বচাইরগাঁও, সোনাপুর, রহিমেরপাড়া, নাছিমপুরসহ আশপাশের ছয়টি গ্রাম; যার প্রতিটিই এখন অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সোনাপুর গ্রামের একাধিক বাসিন্দা জানান, নদীর তীরসংলগ্ন রেকর্ডীয় জমির মালিকরা নগদ টাকার বিনিময়ে বালু ব্যবসায়ীদের কাছে নদীর তীর বিক্রি করে দিচ্ছেন, যা পুরো এলাকার জন্য কাল হয়ে দাঁড়িয়েছে। ব্যক্তি মালিকানাধীন জমির নাম দিয়ে ব্যবসায়ীরা তীর কেটে গভীর থেকে বালু তোলায় নদীর গতিপথ পরিবর্তিত হয়ে তীব্র ভাঙন দেখা দিয়েছে।
স্থানীয়রা বলছেন, বর্তমানে সোনাপুর গ্রামের রোয়াব আলী, রুহেল মিয়া, বাবুল মিয়া, কালা মিয়াসহ নদীতীরের জমির অন্তত ২০ জন জমির মালিক বালুখেকোদের কাছে তাদের জমির উপরিভাগ বিক্রি করে দিচ্ছেন। স্থানীয়ভাবে তারা কিছুটা প্রভাবশালী হওয়ায় দাঙ্গা-হাঙ্গামার ভয়ে তাদের বিরুদ্ধে কেউ কিছু বলতেও পারছেন না।
এসব বিষয়ে জানতে চাইলে অভিযোগ অস্বীকার করেছেন সোনাপুর গ্রামের জমির মালিক রোয়াব আলী। তিনি বলেন, তিনি তীর বিক্রির সঙ্গে জড়িত নন। প্রতি রাতে তাঁর জমি কেটে নিয়ে যাচ্ছে বালুখেকোরা। ওসি এবং ইউএনওকে এ ব্যাপারে জানানো হয়েছে সরেজমিনে তদন্ত করার জন্য।
একই গ্রামের রুহেল মিয়া বলেন, কেবল তাঁর জমি এখনও অক্ষত আছে। আশপাশের প্রায় সবার নদীসংলগ্ন জমির তীর কেটে নিয়ে গেছে। তিনি জমির মাটি বিক্রি না করায় তাঁর জমিও কেটে নিয়ে যাচ্ছে। দিনে রাতে পাহারা দিয়ে তীর কাটা বন্ধ করতে পারছেন না।
রহিমের পাড়া গ্রামের বাসিন্দা আব্দুর রউফ জানান, নদীসংলগ্ন জমি ব্যক্তিগত সম্পত্তি হলেও তার তীর কাটা দণ্ডনীয় অপরাধ। প্রভাবশালী মহলের চাপে এটি নিয়ন্ত্রণ করা দুঃসাধ্য হয়ে পড়েছে। অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের দায়ে বালুখেকো ফজর আলীকে সম্প্রতি কারাদণ্ড ও আর্থিক জরিমানা করেন ভ্রাম্যমাণ আদালত। অভিযোগের বিষয়ে ফজর আলীর সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগ করা হলেও কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি।
এ বিষয়ে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. তরিকুল ইসলাম তালুকদার জানান, অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে পুলিশ ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছে। নদীর তীর কেটে বালু উত্তোলনের অভিযোগে ইতোমধ্যে ২০ থেকে ২২ জনের বিরুদ্ধে একটি মামলা রেকর্ড করা হয়েছে। ওদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
দোয়ারাবাজার ইউএনও অরূপ রতন সিং বলেন, ‘টাকার বিনিময়ে পাড় বিক্রি ও বালু উত্তোলনের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে। ওই এলাকায় বেশ কয়েকটি অভিযান চালানো হয়েছে। অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে থানায় নিয়মিত মামলা দায়ের রয়েছে।’
- বিষয় :
- বালুদস্যু
