ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

স্কুল ঘেঁষে অবৈধ ৭৫ করাতকল

স্কুল ঘেঁষে অবৈধ ৭৫ করাতকল
×

গোবিন্দগঞ্জ উপজেলার রাজাবিরাট এলাকায় অবৈধ করাতকলে স্তূপ করে রাখা গাছ সমকাল

 গোবিন্দগঞ্জ (গাইবান্ধা) প্রতিনিধি

প্রকাশ: ০৮ এপ্রিল ২০২৬ | ০৮:০৪

| প্রিন্ট সংস্করণ

সড়ক ঘেঁষেই দাঁড়িয়ে আছে শহরগছি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও শহরগছি আদর্শ ডিগ্রি কলেজ। হাজারো শিক্ষার্থীর কলকাকলিতে মুখরিত হওয়ার কথা থাকলেও এই বিদ্যাপীঠ দুটির স্বাভাবিক পরিবেশ কেড়ে নিয়েছে ‘ভাই ভাই’ নামে একটি করাতকল (স মিল)। প্রতিষ্ঠানের গা-ঘেঁষে দিনরাত চলা এই মিলের বিকট শব্দে ক্লাসরুমে শিক্ষকের কথা শোনা দায় হয়ে পড়েছে। কেবল শহরগছি নয়, পুরো গোবিন্দগঞ্জ উপজেলায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পাশে গড়ে ওঠা অবৈধ করাতকলের দাপটে বিপন্ন হচ্ছে শিক্ষা ও পরিবেশ।

সরেজমিন দেখা যায়, পান্থাপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, বিদ্যাকোষ, সোনার বাংলা স্কুল অ্যান্ড কলেজ, সেন্ট্রাল পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজ, ভাইবোন স্কুল ও মহিমাগঞ্জ বালিকা বিদ্যালয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের সীমানা ঘেঁষেই চলছে এসব করাতকল। শহরগছি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী নূর ইসলাম জানায়, ‘মিলের শোঁ শোঁ শব্দে আমাদের পড়াশোনায় খুব অসুবিধা হয়। বাতাসে বালুকণা উড়ে এসে চোখে-মুখে পড়ে। আমাদের সবার সব সময় সর্দি-কাশি লেগেই থাকে।’

মহিমাগঞ্জ বালিকা বিদ্যালয়ের অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থী ইয়াসমিন খাতুন ক্ষোভ প্রকাশ করে বলে, ‘স্কুলের পাশে মিলের কারণে প্রচুর শব্দ হয়। অনেক সময় স্যারদের কথা কানে ঠিকঠাক পৌঁছায় না। তার ওপর রাস্তার ওপর বড় বড় গাছের গুঁড়ি ও ট্রাক রেখে মালপত্র ওঠানামা করায় আমাদের যাতায়াতেও সমস্যা হয়।’
শহরগছি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক মো. জুয়েল বলেন, ‘কয়েক বছর ধরে প্রতিষ্ঠানের পাশে এই মিল চলছে। শব্দ ও ধূলিকণায় পাঠদান ব্যাহত হলেও আমরা ভয়ে বাধা দিতে পারি না। কারণ, মিল মালিকরা প্রভাবশালী ও স্থানীয় লোক। প্রশাসনকে বিষয়টি জানানো হলেও দৃশ্যত কোনো পরিবর্তন নেই।’ শিক্ষার্থীদের সুস্বাস্থ্যের কথা চিন্তা করে এবং শিক্ষার সুষ্ঠু পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে এসব ‘শব্দদানব’ দ্রুত সরিয়ে নেওয়া এখন সময়ের দাবি বলছে এই শিক্ষক।
পরিবেশ ও শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ বিবেচনায় জনবসতি ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ২০০ গজের মধ্যে করাতকল স্থাপন নিষিদ্ধ থাকলেও গোবিন্দগঞ্জে তার কোনো বালাই নেই। লোকালয় ঘিরে একের পর এক গড়ে উঠেছে অবৈধ করাতকল।

বন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, গোবিন্দগঞ্জে ছোট-বড় মিলিয়ে প্রায় ১০০টি করাতকল রয়েছে; যার মধ্যে মাত্র ২৫টির অনুমোদন থাকলেও সেগুলোর কোনোটিই নবায়ন করা হয়নি। বাকি ৭৫টি মিল কোনো প্রকার আইনি বৈধতা ছাড়াই বছরের পর বছর চলছে। সরকারি নিয়ম অনুযায়ী, একটি করাতকলের অনুমতির জন্য পরিবেশ অধিদপ্তর, বন বিভাগ ও সহকারী কমিশনার (ভূমি) অফিসের ছাড়পত্র প্রয়োজন হয়। এই নিয়ম এখানে কেবল কাগজেই সীমাবদ্ধ।
রাজাবিরাট এলাকার ভাই ভাই ফারাই মিলের স্বত্বাধিকারী বাবু মিয়া অবাক হয়ে জানান, ‘অনুমতি নিয়ে মিল চালাতে হয় তা আমার জানাই ছিল না। গত আট বছর ধরে এভাবেই চালাচ্ছি। সবাই অনুমতি নিলে আমিও নেব।’ অন্যদিকে, বটতলী এলাকার ‘দুই ভাই ফারাই মিল’-এর স্বত্বাধিকারী ছাইফুর রহমান বলেন, ‘অনেক আগে গাইবান্ধা থেকে বন বিভাগের কর্মকর্তারা এসে লাইসেন্স করার কথা বলে গিয়েছিলেন। এসবের অনুমতি নিতে গেলে অনেক ঝক্কি-ঝামেলা পোহাতে হয়, যা সাধারণ ব্যবসায়ীদের জন্য কঠিন। বর্তমানে আমি বৈধভাবে মিল চালানোর জন্য অনুমতির আবেদন প্রক্রিয়া শুরু করেছি।’ এ বিষয়ে মহিমাগঞ্জ এলাকার মিল মালিক লিটন প্রধানের ভাষ্য, ‘আমার করাতকলের সব কাগজপত্র একসময় ঠিকই ছিল। তবে কয়েক বছর ধরে সেগুলো নবায়ন করা হয়নি। নিয়ম অনুযায়ী কাগজপত্র পুনরায় সচল করার জন্য সংশ্লিষ্ট দপ্তরে আবেদন জমা দিয়েছি।’

স্থানীয়দের অভিযোগ, বন বিভাগের ফরেস্টার মিজানুর রহমানের সঙ্গে মিল মালিকদের গভীর সখ্য রয়েছে। অবৈধভাবে গাছ কাটা কিংবা করাতকল স্থাপন–সবকিছুতেই তাঁর পরোক্ষ সহযোগিতা থাকে। ফলে সরকার যেমন বিপুল পরিমাণ রাজস্ব হারাচ্ছে, তেমনি উজাড় হচ্ছে সংরক্ষিত বন ও সড়কের ধারের গাছ। যদিও ফরেস্টার মিজানুর রহমান অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তাঁর দাবি, ‘আমরা লাইসেন্স নবায়নের জন্য মালিকদের তাগাদা দিচ্ছি।’
 জানতে চাইলে উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো. তামশিদ ইরাম খান বলেন, ‘শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পাশে মিলের বিষয়টি আমার জানা নেই। বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে খতিয়ে দেখে ব্যবস্থা নেব।’ অন্যদিকে, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সৈয়দা ইয়াসমিন সুলতানা জানান, এটি মূলত বন বিভাগের কাজ। তবে বন বিভাগ সহযোগিতা চাইলে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে এসব অবৈধ মিল উচ্ছেদে সব ধরনের সহায়তা দেওয়া হবে।
 

আরও পড়ুন

×