আইনের বেড়াজালে শিশুর বৃত্তি পরীক্ষা অনিশ্চিত
বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় বিজয়ের ক্রেস্ট হাতে দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী ইউসরা মানহা সমকাল
যশোর অফিস
প্রকাশ: ০৮ এপ্রিল ২০২৬ | ০৮:১১
| প্রিন্ট সংস্করণ
দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী ইউসরা মানহা। অদম্য শিশুটি স্থানীয় ও জাতীয় পর্যায়ে আবৃত্তি, গান, কুইজসহ বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় প্রায় ১০০ পুরস্কার জয় করেছে। কিন্তু আসন্ন প্রাথমিক বৃত্তি পরীক্ষায় শ্রুতিলেখক পাওয়া নিয়ে দুটি আইনের বেড়াজালে পড়েছে এই মেধাবী শিক্ষার্থী। এতে অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে তার বৃত্তি পরীক্ষা। এক মাস সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোতে ধরনা দিয়েও বিষয়টির সুরাহা না হওয়ায় হতাশ মানহার বাবা-মা। প্রাথমিক বৃত্তি পরীক্ষার এক সপ্তাহ বাকি থাকায় শিক্ষামন্ত্রীর হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন তারা।
ইউসরা মানহা যশোর ইংলিশ স্কুল অ্যান্ড কলেজের ষষ্ঠ শ্রেণির ছাত্রী। সে যশোর শহরের নাজির শংকরপুর এলাকার আসকার সালমান ও সুমনা ফেরদৌসের সন্তান। দৃষ্টিপ্রতিবন্ধকতাকে জয় করে লেখাপড়ার পাশাপাশি সাংস্কৃতিক অঙ্গনেও প্রতিভার স্বাক্ষর রেখে চলেছে। স্থানীয় ও জাতীয় পর্যায়ে আবৃত্তি, গান, কুইজসহ বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় প্রায় ১০০ পুরস্কার অর্জন করেছে।
মানহার বাবা আসকার সালমান জানান, মানহা ২০২৫ সালের প্রাথমিক বৃত্তি পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করবে। ১৫ এপ্রিল এই পরীক্ষা শুরু হওয়ার কথা। যেহেতু মানহা দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী, তাই এক মাস আগে তার শ্রুতিলেখকের জন্য আবেদন করা হয়। এ জন্য মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের ‘পাবলিক ও শ্রেণি পরীক্ষায় শ্রুতিলেখকের সেবা গ্রহণ-সংক্রান্ত নীতিমালা-২০২৫’ রয়েছে। এই নীতিমালায় বলা আছে– প্রতিবন্ধী ব্যক্তির অধিকার ও সুরক্ষা আইন-২০১৩ এর ধারা ১৬-এর উপধারা ১-এর দফা (ঝ) ও (ড) অনুযায়ী সব পাবলিক পরীক্ষায় প্রতিবন্ধী ব্যক্তির জন্য সংগতিপূর্ণ বন্দোবস্ত প্রাপ্তি নিশ্চিত করা। তাছাড়া প্রাথমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীর জন্য শ্রুতিলেখকের সর্বোচ্চ যোগ্যতা একজন শিক্ষক নির্ধারণ করা হয়েছে। নীতিমালা অনুযায়ী শ্রুতিলেখকের জন্য আবেদন করা হলে তা গ্রহণ করেনি শিক্ষা অফিস। এর বিপরীতে তারা প্রাথমিক বৃত্তি পরীক্ষা নীতিমালা-২০২৬ দেখিয়ে দিয়েছে। এই নীতিমালা অনুযায়ী শ্রুতিলেখক হিসেবে চতুর্থ শ্রেণির একজন শিক্ষার্থীকে নেওয়া যাবে।
আসকার সালমান বলেন, তারা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তার কাছে জানতে চেয়েছেন ২০২৬ সালের এই পরীক্ষায় চতুর্থ শ্রেণির শিক্ষার্থী বলতে বোঝায় সদ্য তৃতীয় শ্রেণি উত্তীর্ণ শিশু। সে কিভাবে পঞ্চম শ্রেণির বৃত্তি পরীক্ষায় শ্রুতিলেখক হতে পারে। সে তো অনেক শব্দ, বানান, বাক্য বুঝবেই না। এই শিশু শ্রুতিলেখকের মানসিক পরিপক্বতাও তো বুঝতে হবে। এ জন্য প্রতিবন্ধী ব্যক্তির অধিকার ও সুরক্ষা আইন-২০১৩ এবং মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের নীতিমালাকে বিবেচনায় নেওয়ার আবেদন করেছিলেন। কিন্তু শিক্ষা কর্মকর্তা সেটি ‘শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের, প্রাথমিকের নয়’ বলে উল্লেখ করে কোনো কথাই শুনতে চাননি। অথচ ওই নীতিমালায় কিন্তু প্রাথমিকের বিষয়টিও উল্লেখ করা হয়েছে।
মানহার মা সুমনা ফেরদৌস বলেন, এই সংকট তো শুধু একটি শিশুর নয়; আরও অনেক শিশুকেই এই সমস্যার পড়তে হচ্ছে। তাই বিষয়টির সুরাহার জন্য শিক্ষামন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করেন তিনি।
জেলার ভারপ্রাপ্ত প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা জিএম আলমগীর কবিরের ভাষ্য, প্রাথমিক বৃত্তি পরীক্ষার জন্য ‘প্রাথমিক বৃত্তি পরীক্ষা নীতিমালা-২০২৬’ রয়েছে। এই নীতিমালার বাইরে গিয়ে তাদের কিছু করার নেই।
জেলা প্রতিবন্ধীবিষয়ক কর্মকর্তা মুনা আফরিণ জানান, অদম্য মেধাবী মানহা অসংখ্য পুরস্কার জিতে তার প্রতিভার স্বাক্ষর রেখেছে। তার শ্রুতিলেখক নিয়ে এই ঠেলাঠেলির ঘটনায় মর্মাহত তিনি। অন্য আইনে যা-ই থাকুক না কেন, প্রতিবন্ধী ব্যক্তির জন্য ‘প্রতিবন্ধী ব্যক্তির অধিকার ও সুরক্ষা আইন-২০১৩’ কার্যকর হবে। এই আইন মেনে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগ নীতিমালা করেছে। অথচ আন্তঃমন্ত্রণালয় জটিলতার কারণে প্রাথমিক বিভাগ ওই নীতিমালা মানছে না। এটি একজন প্রতিবন্ধী শিশুর অধিকারের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। জেলা প্রতিবন্ধীবিষয়ক কর্মকর্তা হিসেবে তিনি মানহার জন্য ন্যায় চাই।
- বিষয় :
- বৃত্তি
