আব্দুল্লাহনগর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়
দুই বছর ধরে পরীক্ষার খাতা না দেখেই ফল ঘোষণা
ফাইল ছবি
বেলাব (নরসিংদী) প্রতিনিধি
প্রকাশ: ০৯ এপ্রিল ২০২৬ | ০৭:৪২ | আপডেট: ০৯ এপ্রিল ২০২৬ | ০৮:৩০
| প্রিন্ট সংস্করণ
বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আতাউর রহমানের মৃত্যুর পর ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব দেওয়া হয় দুই নারীকে। বিষয়টি নিয়ে দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়েন দুই ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক। তাদের দায়িত্বে অবহেলা, প্রশাসনিক অস্থিরতা, শিক্ষক সংকটসহ নানা কারণে বিদ্যালয়টির শিক্ষার পরিবেশ ভেঙে পড়েছে। দুই বছর ধরে বার্ষিক পরীক্ষার খাতা না দেখেই দেওয়া হয়েছে ফল। এই অবস্থায় ভারপ্রাপ্ত শিক্ষক শরিফা আক্তার ও সুমাইয়া বেগমকে প্রেষণে অন্য বিদ্যালয়ে পাঠিয়েছেন উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা।
ঘটনাটি বেলাব উপজেলার আমলাব ইউনিয়নের আব্দুল্লাহনগর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের। এই বিদ্যালয়ে দুই বছর ধরে পরীক্ষার খাতা না দেখেই ফল দেওয়ার ঘটনা অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে শিক্ষকদের দায়িত্বে অবহেলাসহ আরও কিছু অনিয়ম।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, ২০২৪ সালের নভেম্বর মাসে বিদ্যালয়ে অনুষ্ঠিত তৃতীয় প্রান্তিক পরীক্ষা এবং ২০২৫ সালের প্রথম প্রান্তিক ও তৃতীয় প্রান্তিক পরীক্ষায় একাধিক বিষয়ের খাতা মূল্যায়ন করা হয়নি। অভিযোগ রয়েছে, চতুর্থ শ্রেণির ইংরেজি, পঞ্চম শ্রেণির বাংলা ও ইসলাম শিক্ষা এবং ২০২৫ সালের পরীক্ষায় পঞ্চম শ্রেণির বাংলা ও বিজ্ঞান, চতুর্থ শ্রেণির গণিত ও তৃতীয় শ্রেণির বিজ্ঞান খাতা না দেখেই ফল প্রকাশ করা হয়েছে। এমনকি নৈর্ব্যক্তিক প্রশ্নও মূল্যায়ন করা হয়নি বলে জানা গেছে। অনেক ক্ষেত্রে খাতা না দেখেই ফলাফল শিটে ইচ্ছামতো নম্বর বসানো হয়েছে। ২০২৪ সালে প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণির খাতা মূল্যায়ন ছাড়াই মৌখিকভাবে ফল জানিয়ে দেওয়া হয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। এসব অনিয়মের তথ্য সমকালের হাতে এসেছে।
অভিযোগ উঠেছে, কিছু শিক্ষক নিজেরা খাতা মূল্যায়ন না করে শিক্ষার্থী বা তাদের পরিবারের সদস্যদের দিয়ে খাতা দেখিয়ে নেন। আর কিছু শিক্ষক খাতা না দেখিয়ে শিক্ষার্থীদের ফল দিয়ে দেন। এভাবেই চলছে দুই বছর ধরে। এ ছাড়া পছন্দের শিক্ষার্থী ও প্রাইভেট পড়ুয়াদের বেশি নম্বর দেওয়ার প্রবণতাও শিক্ষকদের বিরুদ্ধে রয়েছে বলে জানিয়েছেন অভিভাবকরা। তাদের দাবি, এ ধরনের অনিয়ম দীর্ঘদিন ধরেই চলে আসছে।
পরিচয় গোপন রাখার শর্তে একাধিক অভিভাবক জানান, প্রায় প্রতিটি পরীক্ষায় কিছু শিক্ষক খাতা মূল্যায়ন ছাড়াই নম্বর দিয়ে থাকেন। উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তার কার্যালয়, প্রধান শিক্ষক ও সংশ্লিষ্ট শিক্ষা কর্মকর্তাদের নজরদারির অভাবেই এই ধরনের অনিয়ম বাড়ছে বলে ধারণা তাদের।
শুধু খাতা মূল্যায়ন নয়, পাঠদানেও রয়েছে অবহেলার অভিযোগ। জানা গেছে, অনেক শিক্ষক কোচিং ও প্রাইভেট পড়ানো নিয়ে ব্যস্ত থাকায় সিলেবাস শেষ না করেই পরীক্ষা নিয়ে ফেলেন। সম্প্রতি বিদ্যালয়ের এক নারী শিক্ষকের টেবিলের ওপর পা তুলে ঘুমানোর একটি ছবি সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে, যা সমালোচনার জন্ম দিয়েছে।
বিদ্যালয়টিতে প্রশাসনিক অস্থিরতাও প্রকট। প্রধান শিক্ষক আতাউর রহমানের মৃত্যুর পর প্রথমে সহকারী শিক্ষক শরিফা বেগমকে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক করা হয়। পরে তাঁকে সরিয়ে সুমাইয়া আক্তারকে দায়িত্ব দেওয়া হয় এবং পুনরায় শরিফাকে দায়িত্বে আনা হয়। এই পরিবর্তনকে কেন্দ্র করে এই দুই শিক্ষকের মধ্যে সৃষ্টি হয় দ্বন্দ্ব, শুরু হয় দায়িত্ব পালনে অবহেলা। শিক্ষকদের মধ্যেও গ্রুপিং তৈরি হয়, যার প্রভাব পড়েছে পাঠদানে।
এসব কারণে দুই ভারপ্রাপ্ত শিক্ষককে প্রেষণে অন্য বিদ্যালয়ে পাঠানো হয়। ফলে বিদ্যালয়টির শিক্ষক সংখ্যা দাঁড়ায় মাত্র তিনজন। এই তিনজন সহকারী শিক্ষক দিয়ে পরিচালিত হচ্ছে বিদ্যালয়ের সব কার্যক্রম। যেখানে শিক্ষার্থীর সংখ্যা ১৪১ জন। নিয়ম অনুযায়ী এখানে অন্তত ছয়জন শিক্ষক থাকার কথা। অথচ শিক্ষক আছেন তিনজন। শিক্ষক সংকটে পাঠদান ব্যাহত হচ্ছে।
জানা গেছে, কাগজে-কলমে বিদ্যালয়ে শিক্ষক রয়েছে পাঁচজন। তারা সবাই নারী। তাদের মধ্যে চারজনের বাড়িই আব্দুল্লাহনগর গ্রামে। শুধু একজনের বাড়ি পাশের চরউজিলাব। সব শিক্ষক একই এলাকার বাসিন্দা হওয়ায় অনেক সময় শ্রেণিকক্ষে পাঠদান না করে নিজেদের মধ্যে আলাপচারিতায় ব্যস্ত থাকেন বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।
অভিযোগের ব্যাপারে গণমাধ্যমে বক্তব্য দিতে রাজি হননি বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন শিক্ষক জানান, সাংবাদিকদের সঙ্গে তাদের কথা বলা নিষেধ আছে। এ কারণে তারা কথা বলতে পারছেন না।
প্রেষণে যাওয়ার আগে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের দায়িত্বে থাকা শরিফা আক্তার বলেন, ‘আমি দায়িত্ব পাওয়ার পর আমার সহকর্মীদের মধ্যে দুজন শিক্ষকের কাছ থেকে চরমভাবে অসহযোগিতা পেয়েছি। তারা আমাকে কোনোরকম সহযোগিতা করেননি।’ পরীক্ষার খাতা মূল্যায়ন না করে ফল দেওয়ার কথা স্বীকার করে তিনি বলেন, ‘আমি এসব বিষয় উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসে জানিয়েছি।’
উপজেলা সহকারী প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা এবং ওই স্কুলের ক্লাস্টারের দায়িত্বে থাকা কবির হোসেন জানান, দুই শিক্ষকের মধ্যে দ্বন্দ্ব এবং নানা কারণে তাদের প্রেষণে পাঠানো হয়েছে। এ বিষয়ে উপজেলা সহকারী প্রাথমিক কর্মকর্তা মোহাম্মদ ইউসুফকে প্রধান করে তদন্ত কমিটি করা হয়েছে।
তদন্ত কমিটির প্রধান মোহাম্মদ ইউসুফ জানান, সপ্তাহ খানেক আগে দুই ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষককে প্রেষণে অন্য বিদ্যালয়ে পাঠানো হয়েছে। উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা জুলেখা শারমিন বলেন, বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে। ইতোমধ্যে দুই শিক্ষককে প্রেষণে পাঠানো হয়েছে এবং একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। ৯ এপ্রিলের (আজ) মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার কথা রয়েছে। অভিযোগ প্রমাণিত হলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
- বিষয় :
- পরীক্ষার ফল
- নরসিংদী
- প্রধান শিক্ষক
