ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

বনের চিঠি আমলে নিচ্ছে না বিদ্যুৎ

বনের চিঠি আমলে নিচ্ছে না বিদ্যুৎ
×

হবিগঞ্জ জেলার নবীগঞ্জ উপজেলার বড়চর এলাকায় একটি অবৈধ করাত কলে স্তূপ করে রাখা গাছের গুঁড়ি। বুধবার তোলা সমকাল

 এম, এ আহমদ আজাদ, নবীগঞ্জ (হবিগঞ্জ)

প্রকাশ: ১১ এপ্রিল ২০২৬ | ০৭:৫৭

| প্রিন্ট সংস্করণ

লাইসেন্স ও প্রয়োজনীয় অনুমোদন ছাড়াই হবিগঞ্জের বনাঞ্চলঘেরা এলাকাগুলোতে গড়ে উঠেছে অবৈধ করাত কল। এসব করাত কলের বিদ্যুৎসংযোগ বিচ্ছিন্ন করতে পল্লী বিদ্যুৎকে চিঠি দেওয়া হলেও আমলে নিচ্ছে না তারা।
অবৈধ করাত কলগুলো বন্ধের লক্ষ্যে বিদ্যুৎসংযোগ বিচ্ছিন্ন করার বিষয়টি আমলে নেয় বন বিভাগ। দুই মাস আগে সে লক্ষ্যে পল্লী বিদ্যুৎকে চিঠি দেওয়া হয় বন বিভাগের পক্ষ থেকে। চিঠি পেয়েও কোনো পদক্ষেপ নেয়নি পল্লী বিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষ। এনিয়ে বন বিভাগ ও পল্লী বিদ্যুতের মধ্যে দ্বন্দ্ব চলছে।

সূত্র জানায়, বন বিভাগ, পরিবেশ অধিদপ্তর ও ফায়ার সার্ভিসের অনুমতি বাধ্যতামূলক হলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রে করাত কলগুলো তা মানছে না। ফলে একদিকে উজাড় হচ্ছে বনাঞ্চল, অন্যদিকে বাড়ছে পরিবেশ ও জলবায়ুদূষণ। এদিকে করাত কলগুলোর মধ্যে অবৈধ বিদ্যুৎসংযোগ নেওয়া হয়েছে। এসব করাত কলের কোনো লাইসেন্স নেই।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, জেলার বাহুবলে প্রায় ৬৬টি করাত কল রয়েছে। এগুলোর মধ্যে ৬৩টির লাইসেন্স না থাকলেও বিদ্যুৎসংযোগ রয়েছে। জেলা বন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, নবীগঞ্জ ও বাহুবল উপজেলায় মোট ৬০টি করাত কলের মধ্যে বৈধ ৩টি। নবীগঞ্জে মোট ৩৫টির মধ্যে বৈধ ১টি। বাহুবল উপজেলার ৩১টির মধ্যে বৈধ ২টি করাত কল। এসব করাত কল বন বিভাগের ১০ কিলোমিটারের ভেতরে হওয়ায় তাদের আইন অনুযায়ী সেগুলোকে লাইসেন্স দেওয়া সম্ভব নয়। কিন্তু কলগুলো সচল রয়েছে।
বন বিভাগ সূত্র জানায়, গত এক বছরে ৪টি করাত কলের বিদ্যুৎসংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়েছে। এছাড়া দুটি অবৈধ করাত কল উচ্ছেদ করা হয়েছে। পাশাপাশি বিভিন্ন সময়ে তিনটি ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা হয়।
গত ২ ফেব্রুয়ারি শায়েস্তাগঞ্জ বন বিভাগ অফিসের রেঞ্জার তোফায়েল আহমদ চৌধুরী একটি চিঠি পাঠান হবিগঞ্জ পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি শায়েস্তাগঞ্জ, হবিগঞ্জ-এর জেনারেল ম্যানেজারকে। বিষয় ছিল, অবৈধভাবে স্থাপিত/পরিচালিত করাত কলে বিদ্যুৎসংযোগ বিচ্ছিন্ন করা।

ওই চিঠিতে বলা হয় বিশেষ করে বাহুবল, নবীগঞ্জ, শায়েস্তাগঞ্জ ও বানিয়াচং উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় সরকারি আইন অমান্য করে বন বিভাগের বৈধ লাইসেন্স ছাড়া কিছু করাতকল অবৈধভাবে স্থাপিত ও পরিচালিত হচ্ছে। করাত কল (লাইসেন্স) বিধিমালা ২০১২ অনুযায়ী, লাইসেন্সবিহীন ‘স’ মিল স্থাপন ও পরিচালনা আইনত দণ্ডনীয়। সরকারি সম্পদ রক্ষায় এবং অবৈধ কর্মকাণ্ড বন্ধে এ ধরনের করাত কলের বিদ্যুৎসংযোগ বিচ্ছিন্ন করা একান্ত প্রয়োজন। এমতাবস্থায় জনস্বার্থে এবং জাতীয় বনজসম্পদ রক্ষার লক্ষ্যে উল্লিখিত লাইসেন্সবিহীন অবৈধ করাত কলগুলোর বিদ্যুৎসংযোগ বিচ্ছিন্ন করার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে পল্লী বিদ্যুৎকে অনুরোধ করা হয়। তবে এই চিঠি পাঠানোর পর দুই মাস পেরিয়ে গেলেও কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করেনি বিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষ।
জানা গেছে, জেলার সংরক্ষিত বনাঞ্চলের আশপাশে গড়ে ওঠা করাত কলগুলোতে নিয়মিত কাঠ চেরাই করা হচ্ছে। এতে দ্রুত কমছে বনভূমি। পাশাপাশি আবাসিক এলাকাতেও করাত কল স্থাপন করা হয়েছে। শ্যালো মেশিন ও জেনারেটর মেশিনের তীব্র শব্দে ভোগান্তিতে পড়েছে জনজীবন। করাত কলের বর্জ্য ও ধুলাবালিতে পরিবেশ দূষিত হচ্ছে।
স্থানীয়দের দাবি, দুটি উপজেলার ৬৬টি করাত কলের মধ্যে অধিকাংশের বৈধ কাগজপত্র নেই। প্রশাসন ও বন বিভাগের অনুমতি না থাকা সত্ত্বেও পল্লী বিদ্যুতের কিছু অসাধু কর্মকর্তা ‘মাসোহারা’ নিয়ে এসব করাত কল চালাতে বিদ্যুৎ সরবরাহে সহায়তা করছেন।

বাহুবলের পুটিজুরী বিট এলাকার আবুল খায়ের জানান, ‘কাগজপত্র না থাকায় আগে বিদ্যুৎসংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়েছিল। বন বিভাগের সীমান্তবর্তী ১০ কিলোমিটারের মধ্যে করাত কলের লাইসেন্স দেওয়া হয় না। তাই কাগজপত্র ছাড়া করাত কল চালাতে হচ্ছে। তিনি বলেন, ‘বন বিভাগের চেয়ে বড় দুষ্কৃতকারী হলো পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি। তারা এসব অবৈধ করাত কলে বিদ্যুৎসংযোগ দিয়ে প্রতি মাসে অবৈধ পথে লক্ষাধিক টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে।’
বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা রেঞ্জার তোফায়েল আহমদ চৌধুরী জানান, করাত কলসংক্রান্ত কয়েকটি রিট মামলা চলমান রয়েছে। এসব মামলায় সংশ্লিষ্টরা আদালত থেকে স্থগিতাদেশ (স্টে অর্ডার) নিয়ে প্রতিষ্ঠান চালাচ্ছেন। ইতোমধ্যে অবৈধ করাত কলের বিদ্যুৎসংযোগ বিচ্ছিন্ন করার জন্য একাধিকবার পল্লী বিদ্যুৎ সমিতিকে চিঠি দেওয়া হয়েছে কিন্তু তারা এতে কর্ণপাত করছে না। প্রত্যেক উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে (ইউএনও) চিঠি দেওয়া হয়েছে অভিযান পরিচালনা করার জন্য। এসবের বিরুদ্ধে শিগগিরই যৌথ অভিযান চালানো হবে বলেও জানান তিনি।
হবিগঞ্জ পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির জেনারেল ম্যানেজার জিল্লুর রহমান বলেন, ‘বন বিভাগের লাইসেন্স দেখে সংযোগ দেব কেন, আমরা আমাদের আইনে সংযোগ দিয়েছি। করাত কল অবৈধ কিনা সেটা দেখার বিষয় নয়।’ 

আরও পড়ুন

×