সরেজমিন চমেক হাসপাতাল
হাম কর্নারে শয্যার চেয়ে তিন গুণ রোগী, সংক্রমণ বাড়ার ঝুঁকি
একটি ছোট শয্যায় গাদাগাদি করে চিকিৎসা নিতে হচ্ছে তিনজনকে। এমন চমেক হাসপাতালে নিত্যদিনের। ছবি: সমকাল
শৈবাল আচার্য্য, চট্টগ্রাম
প্রকাশ: ১৩ এপ্রিল ২০২৬ | ০৯:৩১ | আপডেট: ১৩ এপ্রিল ২০২৬ | ০৯:৩৩
আবদুল্লাহ, সাহিবা ও তাসবির। তিনজনেরই বয়স চার থেকে ৯ মাসের মধ্যে। জীবনের প্রথম বসন্তেই এই শিশুদের ঠাঁই হয়েছে হাসপাতালের চার দেয়ালের মাঝে। হামের ভয়াবহ থাবায় আক্রান্ত এই শিশুদের জন্য আলাদা শয্যা তো দূরে থাক, একটি ছোট শয্যায় গাদাগাদি করে চিকিৎসা নিতে হচ্ছে তিনজনকে। শুধু এই তিনজন নয়, ১৬ শয্যার বিপরীতে অর্ধশতজনের বেশি রোগী ভর্তি থাকায় প্রতি শয্যায়ই তিন-চার শিশুকে চিকিৎসা নিতে হচ্ছে।
সরেজমিন চমেক হাসপাতালের হাম কর্নার ঘুরে দেখা যায় এক মানবেতর দৃশ্য। কোনো শিশুর মুখে অক্সিজেনের নল, কারও হাতে স্যালাইনের লাইন, আবার কারও শরীরজুড়ে লাল ফুসকুড়ি। শিশুদের তীব্র যন্ত্রণা আর কান্নায় ভারী হয়ে আছে ওয়ার্ডের বাতাস। গাদাগাদি করে থাকার ফলে ভাইরাসের সংক্রমণ আরও ছড়িয়ে পড়ার চরম ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।
চরম ভোগান্তিতে অভিভাবকরা
হাসপাতালের তথ্যমতে, ১৬ শয্যার এই বিশেষায়িত ইউনিটে প্রতিদিন গড়ে ভর্তি থাকছে ৫০ জনেরও বেশি শিশু। গতকাল রোববার এই সংখ্যা ছিল ৬৪ জন, যার মধ্যে আটজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক হওয়ায় তাদের পিআইসিইউতে (শিশু নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র) স্থানান্তর করা হয়েছে। প্রতিদিন গড়ে ১৫ থেকে ২০ জন নতুন রোগী ভর্তি হচ্ছে।
সাড়ে পাঁচ মাস বয়সী শিশু আবদুল্লাহর বাবা মো. সোহরাব বলেন, ‘জ্বর আসার তিন দিনের মাথায় শরীর বেশি খারাপ হয়ে যায়। এখানে এক বেডে তিন-চারজনকে থাকতে হচ্ছে। রোগের যন্ত্রণার সঙ্গে এই গাদাগাদি অবস্থা আমাদের কষ্ট আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।’
সাহিবার মা নাহিদা সুলতানা বলেন, ‘পাঁচ দিনের মাথায় হঠাৎ শরীরজুড়ে দেখা যায় লাল ফুসকুড়ি। মুখে কিছুই খেতে পারছে না।
হামের লক্ষণ থাকায় একাধিক পরীক্ষা করান চিকিৎসকরা। এতে হাম শনাক্ত হয়। ছোট্ট একটি কক্ষে অনেক শিশুকে চিকিৎসা নিতে হওয়ায় চরম কষ্ট পেতে হচ্ছে।’
১১ মাসের মরিয়মের মা আকলিমা খানম বলেন, ‘ছোট্ট শিশুকে মা যে একটু ব্রেস্ট ফিডিং করাবে বা ওষুধ খাওয়াবে, সেই জায়গাটুকুও এখানে নেই।’
চিকিৎসকদের মতে, হাম একটি অত্যন্ত ছোঁয়াচে ভাইরাসজনিত রোগ। আক্রান্ত ব্যক্তির হাঁচি-কাশি থেকে এই ভাইরাস বাতাসে প্রায় দুই ঘণ্টা পর্যন্ত বেঁচে থাকতে পারে। চট্টগ্রাম ইন্টারন্যাশনাল মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষ ও শিশু বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. মুসলিম উদ্দিন সবুজ বলেন, ‘হাম বাতাসের মাধ্যমে দ্রুত ছড়ায়। ভাইরাসটি শিশুর শ্বাসনালি দিয়ে শরীরে প্রবেশ করে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা নষ্ট করে দেয়। এ অবস্থায় গাদাগাদি করে চিকিৎসা দেওয়া অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ।’
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক চমেক হাসপাতালের একজন জ্যেষ্ঠ বিশেষজ্ঞ বলেন, ‘একই বিছানায় তিন-চার শিশুকে রাখা আমাদের জন্যও বিব্রতকর। এতে করে সুস্থ শিশুদেরও নতুন করে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বাড়ছে।’
শিশু ওয়ার্ডের বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ মুসা বলেন, হাম কর্নারে প্রতিনিয়ত শিশুর সংখ্যা বাড়ছে। এ কারণে একই শয্যায় একসঙ্গে তিনজনকে চিকিৎসা দিতে হচ্ছে। বাড়তি রোগীর চাপ সামাল দিতে আমাদেরও হিমশিম খেতে হচ্ছে। সামান্য উন্নতি হলেই শিশুদের অন্য ওয়ার্ডে সরিয়ে নিচ্ছি, যাতে নতুন মুমূর্ষু শিশুদের জায়গা দেওয়া যায়।
চট্টগ্রামের সিভিল সার্জন কার্যালয়ের তথ্যমতে, ইতোমধ্যে হামের লক্ষণ নিয়ে দুই শতাধিক শিশু হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। এ নিয়ে ৩২৮ শিশুর নমুনা পরীক্ষার জন্য ঢাকায় পাঠানো হয়েছে, যার মধ্যে ৩৫ জনের শরীরে হাম শনাক্ত হয়েছে।
সিভিল সার্জন ডা. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ‘অনেক শিশু পাওয়া যাচ্ছে, যারা টিকা নেওয়ার আগেই আক্রান্ত হচ্ছে। প্রতিটি শিশুর জন্য টিকা নিশ্চিত করতে মাঠ পর্যায়ে আমাদের টিম কাজ শুরু করেছে।’ তবে সংক্রমণ যে হারে বাড়ছে, তাতে হাসপাতালের সীমিত সম্পদ নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি সংকটের আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
- বিষয় :
- চমেক হাসপাতাল
