ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

ঘুরছে না পণ্যবাহী গাড়ির চাকা, খাদ্য সংকটের আশঙ্কা

ঘুরছে না পণ্যবাহী গাড়ির চাকা, খাদ্য সংকটের আশঙ্কা
×

জ্বালানি তেল না থাকায় নারায়ণগঞ্জ শহরের প্রান্তিক ফিলিং স্টেশনের সামনে ড্রাম ও বাঁশ ফেলে যানবাহন আগমনে বাধা। ছবি: সমকাল

শরীফ উদ্দিন সবুজ, নারায়ণগঞ্জ

প্রকাশ: ১৩ এপ্রিল ২০২৬ | ১২:৩৯ | আপডেট: ১৩ এপ্রিল ২০২৬ | ১৪:৪৫

তিন দিন ধরে জ্বালানি বরাদ্দ পাচ্ছে না নারায়ণগঞ্জ সদরের পেট্রোল পাম্পগুলো। ফলে এই জেলা থেকে দেশের বিভিন্ন জেলায় সার, লবণ, আটা-ময়দা, চাল, মাছসহ বিভিন্ন খাদ্যসামগ্রী পরিবহন সম্ভব হচ্ছে না। চলছে না পণ্য ওঠানামার ক্রেন। ব্যবসায়ীরা বলছেন, এই পরিস্থিতি চলতে থাকলে সরবরাহ ব্যবস্থা বন্ধ হয়ে খাদ্য সংকট তৈরি হতে পারে। বেড়ে যেতে পারে খাদ্য ও কৃষিপণ্যের দাম।

ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ পুরাতন সড়কের আলীগঞ্জের জননী ফিলিং স্টেশন। সেখানে কথা হয় ট্রাকচালক ফরিদের সঙ্গে। গত শনিবার রাত দেড়টায় সিরিয়াল দিয়ে তেলের আশায় অপেক্ষা করতে থাকেন তিনি। কিন্তু গতকাল রোববার বিকেল ৪টা পর্যন্ত তেল পাননি। তাঁর ট্রাকে সারভর্তি। তিনি জানান, সার নিয়ে তাঁর ময়মনসিংহের ভালুকায় যাওয়ার কথা। কিন্তু তেল না পাওয়ায় এখানেই বসে আছেন। আগে শুধু যাওয়ার জন্য যতটুকু তেল দরকার, তা নিয়েই রওনা হতেন। কিন্তু এখন অন্য এলাকায় গেলে সেখানকার পাম্প তেল দিতে চায় না। তাই নিজ এলাকা থেকে আসা-যাওয়ার তেল নিয়ে যেতে হয়। কিন্তু এখানে দুই দিন ধরে অপেক্ষা করেও তেল পাচ্ছেন না তিনি।

তার মতো অর্ধশতাধিক ট্রাক দাঁড়িয়ে আছে জননী ফিলিং স্টেশন থেকে তেল নেওয়ার আশায়। এই পাম্পের ম্যানেজার মোহাম্মদ আরমান মিয়া জানান, পাগলা একটি নদী বন্দর এলাকা।

নারায়ণগঞ্জের টানবাজার-নিতাইগঞ্জের মতোই নদী দিয়ে আসা বিভিন্ন পণ্য এখানে নামে। এখান থেকে দেশের বিভিন্ন জেলায় যায় সেসব পণ্য। প্রতিদিন তাদের তেলের চাহিদা ১০ হাজার লিটারের মতো। সেখানে তেলের বরাদ্দ মাত্র তিন হাজার লিটার। তা-ও গত তিন দিন ধরে পাওয়া যাচ্ছে না।

একই পরিস্থিতি পাগলা পেট্রোল পাম্প, নারায়ণগঞ্জ শহরের চাষাঢ়ার প্রান্তিক ও বলাকা পেট্রোল পাম্পেও। প্রান্তিক পাম্পের অপারেটর মোহাম্মদ মন্টু মিয়া বলেন, অকটেন পাচ্ছেন না পাঁচ দিন ধরে। ডিজেল পাচ্ছেন না তিন দিন ধরে। সর্বশেষ গত বৃহস্পতিবার সাড়ে চার হাজার লিটার ডিজেল দিয়েছে, যা কয়েক ঘণ্টা শেষ হয়ে গেছে। এরপর থেকে আর তেল দেয়নি।

রোববার পাগলার মাদ্রাসাঘাট, দাপাঘাট, পঞ্চবটিঘাটসহ বিভিন্ন ঘাটে গিয়ে দেখা যায়, তেলের অভাবে ক্রেন চলছে না। তাই পণ্য ওঠানামা বন্ধ। মাদ্রাসাঘাটের ক্রেনের মালিক আনিসুর রহমান জানান, ডিজেল না পাওয়ায় তাঁর ক্রেন চলছে না। তাই ক্রেনের মাধ্যমে ঘাটের পণ্য ওঠানামা বন্ধ। শ্রমিক দিয়ে কিছু পণ্য নামছে। ঘাটে ভুসি, ভুট্টা, গম, সার নিয়ে ২৪টি লাইটার জাহাজ আটকে আছে। ডিজেলের জন্য নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জ, মুন্সীগঞ্জের মোক্তারপুরসহ নানা জায়গায় লোক পাঠানো হয়েছে, কিন্তু ডিজেল পাওয়া যায়নি।

আলীগঞ্জ মাদ্রাসাঘাটে কথা হলো সার ব্যবসা প্রতিষ্ঠান শেখ ব্রাদার্সের মনিটরিং অফিসার আকিব হোসেনের সঙ্গে। তাঁর ভাষ্য, এই ঘাটে তাদের বিপুল পরিমাণ পণ্য আটকে আছে। নদীতেও লাইটার জাহাজে সার রয়েছে। এগুলো নামাচ্ছেন না, কারণ সার তো বিভিন্ন জেলায় পাঠাতে পারছেন না।

ট্রাক মালিক ফিরোজ মিয়া বলেন, ‘আগে যেখানে ট্রাকের ভাড়া টন প্রতি ১২০০ টাকা ছিল, এখন সেখানে ১৮০০ থেকে ১৯০০ টাকা। কিন্তু তেল না থাকায় ট্রিপ নিতে পারছি না। নারায়ণগঞ্জকে অন্য জেলার মতো গড়ে তেল দিলে হবে না। খাদ্য ও কৃষিপণ্যের ব্যবসা কেন্দ্র হিসেবে বিবেচনা করে এখানে তেলের বরাদ্দ বাড়াতে হবে।’ তাঁর চারটি ট্রাক রয়েছে। এর মধ্যে একটি চলাচল করছে।বাকিগুলো তেলের অভাবে অচল।

নারায়ণগঞ্জ সার ব্যবসায়ী মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ সেলিম বলেন, দেশের সারের মোকাম তিনটি। যশোরের নোয়াপাড়া, নারায়ণগঞ্জ ও চট্টগ্রাম। নারায়ণগঞ্জ থেকে ২৫টি জেলায় সার যায়। কিন্তু কয়েকদিন ধরে খুব কম গাড়ি পাঠাতে পারছেন তারা। ট্রাক ভাড়া বেড়ে গেছে। বেশি ভাড়া দিয়েও ট্রাক পাচ্ছেন না। আগে যদি দিনে ১০০ গাড়ি যেত, এখন যাচ্ছে ৩০ গাড়ি। তবে তিন দিন ধরে পাম্প সম্পূর্ণ বন্ধ থাকায় এই সংখ্যা আরও কমে গেছে। কৃষকের জন্য সারের সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা জরুরি বলে মন্তব্য করেন তিনি।

নারায়ণগঞ্জের নিতাইগঞ্জ থেকে ডাল, চাল, আটা, ময়দা, সুজি, লবণসহ বিভিন্ন খাদ্যসামগ্রী দেশের বিভিন্ন স্থানে যায়। নারায়ণগঞ্জ চাল আড়তদার মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক শফিকুল ইসলাম লিটনের ভাষ্য, ঢাকাসহ ১৫টি জেলায় সড়ক পথে নারায়ণগঞ্জ আড়ত থেকে চাল যায়, আবার কিছু কিছু চাল আসে। ট্রাক সংকটের কারণে চাল পাঠাতে পারছেন না তারা। নিতাইগঞ্জের ট্রাকস্ট্যান্ডের ট্রাকগুলো তেল নেয় চাষাঢ়ার প্রান্তিক ও বলাকা পেট্রোল পাম্প থেকে। কিন্তু এই দুটি পাম্প গত বৃহস্পতিবার দুপুর থেকে তেল দিচ্ছে না। বিষয়টি অতিরিক্ত জেলা প্রশাসককে জানানো হয়েছে। কিন্তু লাভ হয়নি। এভাবে চলতে থাকলে বিভিন্ন জেলায় খাদ্য সংকট তৈরি হতে পারে। নারায়ণগঞ্জ জেলার ব্যবসা বাণিজ্য সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যাবে।

নারায়ণগঞ্জের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ রায়হান কবির বলেন, ‘শহরের দুটি পাম্পের বিষয়ে আমার জানা ছিল। পাগলার পাম্প দুটির ব্যাপারে জানা ছিল না। আমি খোঁজ নিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিচ্ছি।’

আরও পড়ুন

×