প্রথম সন্তানের মুখ দেখে আনন্দে অশ্রুসজল বাবার চোখ
নীলফামারির সৈয়দপুরে নবজাতককে কোলে নিয়ে মা রুমি সরকার
আমিরুল হক, নীলফামারী
প্রকাশ: ১৬ এপ্রিল ২০২৬ | ১৪:৩২ | আপডেট: ১৬ এপ্রিল ২০২৬ | ১৯:১৩
সকালের সোনালি রোদ তখন আভা ছড়াচ্ছে চারদিকে। চারদিকে চলছে বর্ষবরণের প্রস্তুতি । ঠিক সেই সময় ডায়াগনস্টিক সেন্টারের বারান্দায় সন্তানের মুখ দেখার আশায় অধীর অপেক্ষায় পায়চারি করছেন আকিব সরকার বিজয়। সঙ্গে আছেন তার মা মায়া সরকার। স্ত্রী রুমি সরকারকে সেই কখন নিয়ে যাওয়া হয়েছে অস্ত্রোপচার কক্ষে। সন্তানের মুখ দেখার যেন আর তর সইছে না বিজয়ের। প্রায় আড়াই ঘন্টার পর অস্ত্রোপচার রুম থেকে একজন নার্স যখন বের হয়ে বিজয়কে মেয়ে হওয়ার ও মা-মেয়ের সুস্থতার খবর জানালেন বুক থেকে যেন পাহাড় নামলো বিজয়ের।
এর কিছুক্ষণ পর ওই নার্স নবজাতককে প্রথমে তার দাদীর কোলে তুলে দেন। সেখান থেকে কাঁপা কাঁপা হাতে মেয়েকে কোলে তুলে নেন বিজয়। প্রথমবার বাবা হওয়ার আনন্দে তার চোখ হেয়ে উঠে অশ্রুসজল। মেয়ের মুখ দেখে খুশিতে তার চোখ থেকে গড়িয়ে পড়ে জল।
মঙ্গলবার পহেলা বৈশাখের প্রথম প্রহরে নীলফামারির সৈয়দপুরে মা হসপিটাল ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারে নবজাতকটির জন্ম হয়।
নবজাতকের বাবা আকিব সরকার বিজয় ও মা রুমি সরকা । তারা নীলফামারীর সৈয়দপুর উপজেলার কয়া মিস্ত্রীপাড়া এলাকার বাসিন্দা।বিজয় পেশায় একজন ইলেকট্রিশিয়ান। কাজ করেন একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে। আর রুমি সরকার গৃহিনী।
নবজাতকের বাবা আকিব সরকার বিজয় বলেন,‘বিয়ের চার বছর পর কন্যা সন্তানের মুখ দেখার সুযোগ হয়েছে। এমন সুন্দর মুহূর্ত প্রথিবীতে আর আছে কী না আমার জানা নেই। কারণ এই মুহূর্ত থেকে আমি একজন বাবা। আমার জীবন পূর্ণ’। তার আশা , এই সন্তানের মধ্য দিয়ে তাদের দুই পরিবাররের মধ্যে জমে থাকা সব রাগ, ক্ষোভ মুছে যাবে। তৈরী হবে ভালোবাসা ও ভ্রাতৃত্ববোধের সেতুবন্ধন।
রুমি সরকারের পরিবারের সদস্যরা জানায়, ডেলিভারি ডেট আরও সাতদিন পর হওয়ার কথা থাকলেও ১৩ এপ্রিল রাতে প্রসব বেদনা উঠে রুমির। তাকে নিয়ে শাশুড়ি ও স্বামী অটোরিকশায় করে নিয়ে যান বাড়ি থেকে তিনি কিলোমিটার দুরে দিনাজপুর সড়কে পৌরসভার কাছে ‘মা হসপিটাল ও ডায়াগনস্টিক’ সেন্টারে। রুমিকে নেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ভর্তি করে হাসপাতাল কর্র্তৃপক্ষ। প্রথমে নরমাল ডেলিভারি চেষ্টা করেন চিকিৎসক। কিন্তু বাচ্চার অবস্থা একটু ‘জটিল’হওয়ায় অস্ত্রোপচারের সিদ্ধান্ত নেন তারা। পরে অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে সুস্থ বাচ্চা প্রসব করেন রুমি।
মেয়ের নামকরণ নিয়ে বিজয় বলেন, ‘বাড়ির মুরুব্বিরা আমার সন্তানের নাম যেটি রাখবেন, সেটিই হবে। তাকে ইসলামী শিক্ষায় শিক্ষিত করতে চাই। ওর মায়ের ইচ্ছা আছে মেয়েকে হাফেজ বানানোর। এখন আমারও একই ইচ্ছা’।
নবজাতকের মা রুমি সরকার বলেন, এবার পহেলা বৈশাখ আমাদের জন্য খুবই স্পেশাল। কারণ ডেলিভারি ডেট অনুযায়ী আর এক সপ্তাহের পর ডেলিভারি হওয়া কথা ছিল। তারপরও মনে মনে ভাবতাম সন্তানের সঙ্গে যদি পহেলা বৈশাখ উদযাপন করতে পারতাম, তাহলে খুব ভালো হতো। শেষ পর্যন্ত তাই-ই হলো। এখন থেকে প্রত্যেক বছর আমরা এ দিনটি দ্বিগুণ আনন্দে উদযাপন করতে পারবো।
বিজয় জানান, ভালোবেসে ২০২২ সালের ৭ ডিসেম্বর রুমির সঙ্গে ঘর বাঁধেন। রুমির বাড়ি পাশ্ববর্তী কিশোরগঞ্জ উপজেলার চাঁদখানা ইউনিয়নের বুড়ির হাট গ্রামে। রুমি তখন দ্বাদশ শ্রেণিতে পড়তো। আর বিজয় কেবল এইচএসসি পাশ করেছেন। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে তাদের পরিচয় হয়। এর ঠিক দেড় মাস পর তাদের প্রথম দেখা। প্রথম দেখাতেই তারা ঠিক করেন, একে অপরকে জীবনসঙ্গী করবেন। এর প্রায় একবছর পর তারা পরিবারের অসম্মতিতে বিয়ে করেন। পরবর্তীতে বিজয়ের পরিবার তাদের বিয়েটা মেনে নিলেও রুমির পরিবার এখনও মেনে নেয়নি। তবে এ দম্পতির আশা রুমির ফুটফুটে কন্যা সন্তানকে দেখে নিশ্চয়ই তার পরিবার আর রাগ করে থাকতে পারবে না।
নাতনীকে পেয়ে আবেগে আপ্লুত মায়া সরকার বলেন, আমার দুই ছেলে-মেয়ের মধ্যে বিজয় বড়। যখনই শুনেছি বউমা অন্তঃসত্ত্বা তখন তাকে নিজের কাছে নিয়ে এসেছি। সব ভুলে তাকে নিজের মেয়ের মতো করেই সেবা যত্ন করেছি। সৃষ্টিকর্তার দয়ায় আমরা পৃথিবীর সেরা উপহার পেয়েছি। নাতনীর জন্য সবার দোয়াও প্রার্থনা করেন তিনি।
ডা. মো. তানভীর হাসান বলেন, ‘রুমি সরকার নিয়মিত চেকআপে ছিলেন। চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী চলেছেন। এ কারণে তাদের তেমন কোনো জটিলতার মুখোমুখি হতে হয়নি। যদিও অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে সন্তান প্রসব হয়েছে, তবে মা-সন্তান দু’জনেই সুস্থ আছে। আগামীকালকেই তাদের রিলিজ দেওয়া হতে পারে।’
মা হসপিটাল ও ডায়াগসস্টিক সেন্টারের পরিচালক মো. আব্দুল খালেক সাবু বলেন, ‘আমরা নবজাতক শিশু ও তার মা-বাবাকে নববর্ষের শুভেচ্ছা জানিয়েছি। মিষ্টি মুখও করিয়েছি। বিকেলে আনুষ্ঠানিকভাবে তাদের ফুল দিয়ে শুভেচ্ছা জানাবো। কারণ আমাদের হাসপাতালে নববর্ষের প্রথম প্রহরে এ শিশুটি জন্ম নিয়েছে।
- বিষয় :
- প্রজন্মবরন ১৪৩৩
