শতবর্ষী শুঁটকি মেলা
ক্রেতা-বিক্রেতা সবাই নারী, টাকা ছাড়াই কেনাবেচা
নাসিরনগর উপজেলা সদরের মহাকালপাড়ার লঙ্গন নদীর তীর ঘেঁষে জেগে ওঠা বালুর চরের শতবর্ষী শুঁটকি মেলায় ক্রেতা-বিক্রেতার ভিড় সমকাল
মুরাদ মৃধা, নাসিরনগর (ব্রাহ্মণবাড়িয়া)
প্রকাশ: ১৭ এপ্রিল ২০২৬ | ০৯:১২ | আপডেট: ১৭ এপ্রিল ২০২৬ | ১১:৫৯
| প্রিন্ট সংস্করণ
পুব আকাশে তখনও সূর্যের দেখা মেলেনি। অন্ধকার ভেদ করে নদীতে পুণ্যস্নান শেষে বালুর চরে উপস্থিত হতে শুরু করেন নারী শুঁটকি ব্যবসায়ীরা। নারী ক্রেতাদের উপস্থিতি বাড়তে থাকলে শুরু হয় শত বছরের পুরোনো ঐত্যিবাহী বিনিময় প্রথার আদলে স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত শস্য দিয়ে শুঁটকির বিনিময়। এরপরই মেলায় বেচাকেনা শুরু হয়। বিক্রি শেষে মেলায় দই-চিড়া খেয়ে বাড়ি ফেরেন ক্রেতা-বিক্রেতারা।
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগর উপজেলা সদরের মহাকালপাড়ার লঙ্গন নদীর তীর ঘেঁষে জেগে ওঠা বালুর চরের বৃহস্পতিবারের ভোরের চিত্র এটি। বিনিময় প্রথার ঐতিহ্য ধরে রাখতে শত বছর ধরে এই মেলা অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে। ভোর ৫টা থেকে সকাল ৮টা পর্যন্ত চলে মেলা। মেলার প্রধান আকর্ষণ তিনটি। বিক্রেতা নারী, ক্রেতাও নারী এবং বিনিময় প্রথার ঐতিহ্য। বাংলা নববর্ষের দ্বিতীয় দিন এই মেলা শুরু হয়। চলে দুই দিন।
স্থানীয়রা জানান, উপজেলায় শত বছরেরও বেশি সময় ধরে বিনিময় প্রথার এই ঐতিহ্যবাহী মেলা অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে। পণ্যের বিনিময়ে শুঁটকির আদান-প্রদান হয়। মহাকালপাড়ায় ভোরে নারীরা বসতঘর থেকে তাদের উৎপাদিত পণ্য নিয়ে মেলায় হাজির হন। তারা এসব পণ্য দিয়ে শুঁটকি বিনিময় করেন। ভোর ৫টা থেকে সকাল ৮টা পর্যন্ত চলে বিনিময় প্রথার শুঁটকির বেচাকেনা। এরপরই সেখানে শুরু হয় গ্রামীণ ও লোকজ সংস্কৃতির মেলা। গ্রামীণ এই মেলায় উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নসহ অন্যান্য জেলার মানুষ ও ভোজনরসিকেরা আসেন। দিনভর থাকে আনন্দ আর ফুর্তির আমেজ।
বুধবার ভোরে সরেজমিনে উপজেলা সদরের মহাকালপাড়ার লঙ্গন নদীর তীরসংলগ্ন বালুর চরে শুঁটকি মেলায় নারী ক্রেতা-বিক্রেতার উপস্থিতি চোখে পড়ে। তখনও আকাশে পুব আকাশে সূর্য উঁকি না দিলেও নারীর উপস্থিতিতে মেলা সরব। বিভিন্ন গ্রামের শত শত নারী লঙ্গন নদীতে পুণ্যস্নান শেষে নিজের হাতে তৈরি করা শুঁটকির পসরা সাজিয়ে বসেন। ক্রেতাদের আনা মুড়ি, ডাল, ধান, তেল, পেঁয়াজ, মরিচ, লেবু, হলুদ, ধনে, সরিষা, কচুশাক, লালশাক, সিমের বিচি, টমেটো, লাউ, কুমড়া, থানকুনি পাতা, ডাঁটা শাকসহ বিভিন্ন সবজি দিয়ে শুঁটকি বিনিময় করেন বিক্রেতারা। বছরের ৩৬৫ দিনের ভিড়ে, কেবল একদিন কয়েক ঘণ্টার জন্য বিনিময় প্রথায় চলে লেনদেন। এই কয়েক ঘণ্টায় তারা ফিরে যায় কয়েকশ বছর আগের আমলে; যেখানে টাকার কোনো সম্পর্ক নেই।
বাংলা নববর্ষের দ্বিতীয় দিনের মহাখালপাড়ার ভোর শুধু শুঁটকির বাজার নয়, হয়ে ওঠে ইতিহাসের উৎসব। শত বছর আগে লঙ্গন নদীর তীরে জেগে ওঠা চরে বসা শুঁটকি মেলায় মিশে আছে মোগল আমলের পণ্যের বিনিময় সংস্কৃতি আর পূর্ববঙ্গের মাটির গন্ধ।
স্থানীয় বাসিন্দা আরতি দাস বলেন, এই মেলায় যারা আসেন তাদের কোনো একটি পণ্যের অভাব থাকে। আমাদের জমিজমা নেই। তাই ফসল ফলাতে পারি না। আমরা মাছ ধরি, শুঁটকি তৈরি করি। মেলায় আমরা শুঁটকির বিনিময়ে শাকসবজিসহ তেল-ডাল নিই। যাদের জমি আছে কিন্তু মাছ ধরে না; তারা আসে তাদের ফলানো পণ্যের বিনিময়ে শুঁটকি নিতে।
৭৬ বছর বয়সী নরেন্দ্র চক্রবর্তী মেলায় এসছেন বিনিময় মূল্যে শুঁটকি নিতে। তাঁর ভাষ্য, এই মেলা একটি অনুভবের ব্যাপার। একটি পুনর্জন্ম– যেখানে বাজার নয়, সম্পর্ক আর স্মৃতি কেনা যায়। যেখানে এক কেজি ধানে শুধু মাছ নয়, অতীত বিনিময় হয়। তারা চার পুরুষ ধরে মহাকালপাড়ার এই চরের মেলায় আসছেন বিনিময় মূল্যে শুঁটকি কিনতে। তিনিও সকালে স্নান করে মেলায় এসেছেন। শুঁটকি কিনে এরপর চিড়া-দই খেয়ে বাড়িতে যাবেন। মেলায় যারা কেনাবেচা করছে– সবাই মেলায় চিড়া-দই খেয়ে বাড়িতে ফিরবে বলে জানালেন তিনি।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) শাহীনা নাছরিন বলেন, নাসিরনগরে শত বছরের পুরোনো ঐতিহ্যবাহী বিনিময় প্রথার শুঁটকি মেলা প্রতি বছর অনুষ্ঠিত হয়। এটি উপজেলার জন্য একটি উৎসব; যেখানে সবাই যান ও শুঁটকি কেনেন। অনেক সময় তারা স্বজনদের উপহার হিসেবে শুঁটকি পাঠান। শুনেছি, মেলা উপলক্ষে অনেকেই নাসিরনগরে বাবার বাড়িতে স্বামীসহ বেড়াতে আসেন এবং যাবার সময় শুঁটকি নিয়ে যান।
- বিষয় :
- কেনাবেচা
