কলেজে গিয়ে শিক্ষিকাকে জুতাপেটা করলেন বিএনপি নেতারা, অধ্যক্ষসহ আহত ৫
ইসলামি জালসা ও মসজিদ উন্নয়নে চাঁদা দাবির অভিযোগ
ভিডিও থেকে নেওয়া ছবি
রাজশাহী ব্যুরো
প্রকাশ: ২৪ এপ্রিল ২০২৬ | ১৩:১৬ | আপডেট: ২৪ এপ্রিল ২০২৬ | ১৯:১০
রাজশাহীর দুর্গাপূরে ইসলামি জালসার দাওয়াত ও মসজিদ উন্নয়নের অনুদান চাইতে কলেজে গিয়ে বাগ্বিতণ্ডায় জড়িয়ে কলেজ শিক্ষিকার থাপ্পড় খেয়েছেন এক বিএনপি নেতা। এ ঘটনায় তিনি ওই শিক্ষিকাকে জুতাপেটা করেন। পরে বিএনপি নেতাকর্মীরা কলেজটিতে হামলা করে ওই শিক্ষিকা ও অধ্যক্ষসহ ৫ শিক্ষককে পিটিয়ে গুরুতর আহত করেছেন। এ সময় কলেজে তারা ভাঙচুর চালায়।
বিএনপি নেতার সঙ্গে শিক্ষিকার এই মারপিটের ভিডিও সমাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। এ ঘটনার পর বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবীর জয়নগর ইউনিয়ন বিএনপির সহসভাপতি আকবর আলীকে তার পদ থেকে বহিষ্কার করেছেন।
স্থানীয়রা জানান, বৃহস্পতিবার বেলা সাড়ে ১১টায় ইসলামী জালসার দাওয়াত কার্ড বিতরণ ও মসজিদের উন্নয়নে অনুদান চাইতে দাউকান্দি সরকারি ডিগ্রি কলেজের অধ্যক্ষ আব্দুর রাজ্জাকের কক্ষে যান বিএনপির জয়নগর ইউনিয়ন বিএনপির সহসভাপতি আকবর আলী, ১ নম্বর ওয়ার্ড সভাপতি মো. এজদার, ২ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপি সভাপতি আফাজ উদ্দিন, জয়নগর ইউনিয়ন কৃষক দল সভাপতি জয়নাল, বিএনপির নেতা মাছ ব্যবসায়ী শাহাদ আলীসহ দলীয় নেতাকর্মীরা। তারা স্থানীয় মসজিদের উন্নয়নে কিছু অনুদান দাবি করেন। একই সঙ্গে জালসায় কলেজের মাঠে গাড়ি রাখার অনুমতি চান।
ভিডিওতে দেখা যায়, এ সময় অধ্যক্ষের সঙ্গে কথা বলার দৃশ্য পাশে থেকে ভিডিও করতে থাকেন শিক্ষিকা আলিয়া খাতুন। ভিডিও করতে নিষেধ করলে আলিয়া খাতুনের সঙ্গে তাদের বাগ্বিতণ্ডা শুরু হয়। একপর্যায়ে আলিয়া খাতুন বিএনপি নেতা শাহাদ আলীকে নিজের বাড়ির কাজের লোক ছিল দাবি করে গালে থাপ্পড় মারেন। এ সময় বিএনপি নেতা শাহাদ আলী পায়ের স্যান্ডেল খুলে শিক্ষিকাকে জুতাপেটা করতে থাকেন। এক পর্যায়ে আলিয়ার চুল ধরে মাথা টেবিলের উপর রেখে পেটান। সেখানে উপস্থিত অন্য নেতাকর্মীরা শিক্ষিকাকে জুতা মারতে পাশ থেকে মার মার বলে চিৎকার করে সমর্থন দেন।
ভিডিওতে দেখা যায়, পরে আলিয়া কক্ষের বাইরে বিএনপি ১ নম্বর ওয়ার্ড সভাপতি মো. এজদার ও ২ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপি সভাপতি আফাজ উদ্দিন, কৃষক দল নেতা জয়নালকে তেড়ে গিয়ে মারপিট করতে থাকেন। এ সময় বিএনপি নেতারা শিক্ষিকাকে অশোভন মন্তব্য করে গালি দিতে থাকেন।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, প্রথম দফার এই মারামারির কিছুক্ষণ পর দুপুরে বিএনপি নেতা আকবর, জয়নাল, আফাজের নেতৃত্বে ৪০ থেকে ৫০ জন নেতাকর্মী আবারও কলেজে যান। তারা অধ্যক্ষ আব্দুর রাজ্জাক ও আলিয়াকে মারধর ও রক্তাক্ত জখম করে কলেজে ভাঙচুর চালায়। এতে অন্তত ৫ জন শিক্ষক আহত হন। গুরুতর আহত আব্দুর রাজ্জাক ও আলিয়াকে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হয়।
শিক্ষকরা জানান, হামলার সময় কলেজে ডিগ্রি পরীক্ষা চলছিল। ৪০ থেকে ৫০ জন বিএনপির নেতাকর্মী ১৪৪ ধারা ভেঙ্গে এই হামলা চালায়। এ সময় তারা কলেজে ভাঙচুরও করে। হামলার সময় পুলিশ উপস্থিত থাকলেও কোনো ব্যবস্থা নেয়নি।
এ বিষয়ে কলেজ অধ্যক্ষ আব্দুর রাজ্জাক বলেন, বেলা সাড়ে ১১টায় তখন কলেজে ডিগ্রি পরীক্ষা চলছিল। কলেজের সীমানায় তখন ১৪৪ ধারা চলছিল। বিএনপির ৪০ থেকে ৫০ জন ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে কলেজে ঢুকে যায়। তখন আলিয়াকে দিয়ে তাদের মধ্যে ৫ জনকে আসতে বলি। তারা কথা না শুনে সবাই ঢুকে পড়ে। তখন বাগ্বিতণ্ডায় শুরু হয়।

মারপিটের শিকার কলেজ শিক্ষিকা আলিয়া খাতুন বলেন, তারা প্রতিমাসে দল ধরে আসে চাঁদাবাজি করতে। প্রতিবাদ জানাতেই ভিডিও করছিলাম। এদের মধ্যে একজন আমার বাড়ির কাজের লোক ছিলেন। তিনি কেন এসেছেন জানতে চেয়ে তাকে বের হয়ে যেতে বলি। তখন তিনি আমার দিকে তেড়ে আসেন। তখন তাকে থাপ্পড় দিলে তিনি আমাকে জুতা দিয়ে মারতে থাকেন।
তিনি বলেন, এ ঘটনার পর দুপুরে শাহাদের ছেলে লিটনসহ একদল বিএনপি নেতাকর্মী কলেজে ঢুকে আবারও আমাদের মারপিট করে, কলেজে ভাঙচুর করে।
বিএনপি নেতা শাহাদ আলীর কাছে জুতা মারার কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমি ৩০ বছর আগে তাদের বাড়িতে কাজ করতাম- এটা সত্য। কিন্তু এখন আমার পজিশন বদলেছে- এটা উনি জানেন না। আমি ৯১ সাল থেকে বিএনপি করি। মাছের বড় ব্যবসা আমার। ওই শিক্ষিকা প্রিন্সিপালের রুমে আমাকে দেখেই চিৎকার করে বলে আমার বাড়ির কাজের লোক এখানে আসলো কীভাবে? তখন আমি বলতে যাব- ওই সময় হঠাৎ থাপ্পড় মারে। তখন আমিও রাগের মাথায় তাকে স্যান্ডেল দিয়ে কয়েকটা মেরে সেখান থেকে চলে আসি। পরে অন্যরা গিয়ে তাদের পিটিয়েছে। আমি ভয়ে আর যাইনি।
জয়নগর ইউনিয়নের ২ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপি সভাপতি আফাজ উদ্দীন বলেন, আমাকে মাঠের মধ্যে ধরে ধাক্কা মেরে ফেলে দিয়েছে। ওই মহিলা একাই আমাদের ৫ থেকে ৬ জনকে মেরেছে। পরে সবাই মিলে তাদের মারধর করেছে।
তিনি বলেন, কলেজের প্রিন্সিপালকে জালসায় দাওয়াত করতে এবং কলেজের মাঠে জালগার গাড়ি রাখার অনুমতি নিতে গিয়েছিলাম। মসজিদের উন্নয়নে অনুদান চেয়েছি, এটা তো চাঁদা নয়।
দুর্গাপুর থানার ওসি পঞ্চনন্দ সরকার বলেন, তারা জালসার দাওয়াত করতে গিয়েছিল। পরে বাগ্বিতণ্ডায় মারামারি হয়েছে। কোনো মামলা হয়নি। এখনও অভিযোগ আসেনি। তবে কলেজ অধ্যক্ষ মামলা করবেন বলে জানিয়েছেন। মামলা করলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
বহিষ্কার: এদিকে মারপিটের ঘটনায় জড়িত জয়নগর ইউনিয়ন বিএনপির সহসভাপতি আকবর আলীকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে। ভিডিও গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে শুক্রবার বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী এক বিজ্ঞপ্তিতে জানান, নারী শিক্ষিকার সাথে অশোভন আচরনের দায়ে আকবর আলীকে বিএনপি থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে।
- বিষয় :
- হামলা
- ভাঙচুর
- বাকবিতণ্ডা
