ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

‘সেদিনের ভয়াবহতা মনে পড়লে গা শিউরে ওঠে’

‘সেদিনের ভয়াবহতা মনে পড়লে গা শিউরে ওঠে’
×

১৯৮৯ সালের ২৬ এপ্রিল প্রলয়ঙ্করী টর্নেডোর আঘাতে লন্ডভন্ড সাটুরিয়া ফাইল ফটো

 জাহাঙ্গীর আলম, সাটুরিয়া (মানিকগঞ্জ)

প্রকাশ: ২৬ এপ্রিল ২০২৬ | ০৮:২৩

| প্রিন্ট সংস্করণ

তখন পবিত্র রমজান মাস। সন্ধ্যার আগমুহূর্তে ইফতারের প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন ধর্মপ্রাণ মুসল্লিরা। হঠাৎ পশ্চিম আকাশে মেঘ জমতে থাকে। নিমেষেই প্রলয়ঙ্করী টর্নেডোর আঘাতে লন্ডভন্ড হয়ে যায় সাটুরিয়া। আজ সেই ভয়াল ২৬ এপ্রিল। ১৯৮৯ সালে এই দিনে সাটুরিয়ার ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া ভয়াবহ টর্নেডোর ৩৭ বছর পূর্ণ হলো আজ।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, ঘরের চালের টিনগুলো কাগজের মতো আকাশে উড়তে দেখা গেছে। নলকূপ পর্যন্ত উঠিয়ে অন্যত্র ফেলে দিয়েছে। গম বোঝাই ট্রাক উড়ে গিয়ে হাসপাতালের কার্নিশে ঝুলতে দেখা গেছে। খাদ্যগুদামের ছাদ উড়িয়ে নদীতে ফেলে দেয়। সাটুরিয়া বাজারের বটগাছগুলো নদীর এপার থেকের ওপার নিয়ে ফেলে দেয়। ৩৭ বছর পরও গাছের মধ্যে টিনের টুকরো আটকে আছে। এক মিনিটের টর্নেডোতে সাটুরিয়ার সব সড়কে গাছ পড়ে থাকায় হতাহতদের হাসপাতালে নিতে বেগ পেতে হয়।

এক মিনিটেই ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয় সাটুরিয়া সদর, হাজিপুর, ভাটারা, হরগজ, তিল্লিসহ প্রায় ১২টি গ্রাম। সরকারি-বেসরকারি হিসাবমতে, সেই এক মিনিটের টর্নেডোর আঘাতেই প্রাণ হারান এক হাজার ৩০০ মানুষ। আহত হন ১২ হাজারের বেশি। লক্ষাধিক মানুষ গৃহহীন হয়ে পড়েন। আহত ও গৃহহীন মানুষের আর্তনাতে সেদিন ভারী হয়ে ওঠে সাটুরিয়ার বাতাস।
সেই বিভীষিকা আজও তাড়া করে বেড়ায় বেঁচে যাওয়া মানুষকে। হরগজ পূর্বনগরের আবুল হোসেন, মধ্যকান্দি গ্রামের ইব্রাহীম মাস্টার ও ডা. আব্বাস উদ্দিন জানান, আজও আকাশে মেঘ জমতে দেখলে ভয়ে বুক কাঁপে। মানুষকে উড়িয়ে নিয়ে অন্যত্র ফেলার দৃশ্য আজও চোখে ভাসে। উড়ন্ত টিনের আঘাতে হাত-পা হারিছেন অনেকে। তাদেরই একজন সাটুরিয়া বাজারের ব্যবসায়ী খসরু, একটি হাত হারান তিনি।

খাদ্যগুদামে আটকে পড়া শ্রমিকরা গম ও চাল খেয়ে ভেতরেই ছিলেন পাঁচ দিন। পাঁচ দিন পর উদ্ধার করে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। তাদের মধ্যে একজন নারী শ্রমিক ছলিমন বেওয়া। তিনি বলেন, ‘আমরা কয়েকজন আটকা পড়ি। ঝড় শুরু হলে তাকিয়ে দেখি গুদামের ছাদ উড়িয়ে নিয়ে গেছে। আমরা চিৎকার করলেও কেউ শোনেনি। তারপর কী হলো বলতে পারব না। তবে এতটুকু জানি, গুদামের গম-চাল খেয়ে বেঁচে ছিলাম।’

৮০ বছর বয়সী আয়শা বেগম জানান, নিরাপদ আশ্রয়ে যাওয়ার সময় হঠাৎ ঘরের চালের বাটাম উড়ে এসে ছেলের বউ মনোয়ারার পেটে ঢুকে পড়ে। বাটাম নিয়েই সারারাত যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছিল। পরের দিন কে বা কারা সেই বাটাম খুলে দেয়। পরে অতিরিক্ত রক্ষণে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে। তার মতো হাজারো মানুষের স্বজন হারানোর আর্তনাদ আজও আকাশ-বাতাসে প্রতিধ্বন্নিত হয়।
সাটুরিয়া উপজেলা পরিষদের তৎকালীন চেয়ারম্যান আ খ ম নূরল হক বলেন, ‘সেদিনের ভয়াবহতা মনে পড়লে আজও গা শিউরে ওঠে। ওদিন আমি আমার ছোট ভাইকে হারিয়েছি। সেই ভয়ংকর স্মৃতি ভোলা সম্ভব নয়।’ তিনি জানান, এই দুর্যোগ কাটিয়ে ওঠার জন্য হরগজ ঈদগাহ মাঠে তৎকালীন সরকারের মন্ত্রিপরিষদের একটি সভা হয়। সেই টর্নেডোর ভয়াবহতা বিশ্ব মিডিয়ায় জায়গা করে নিয়েছিল।
প্রতিবছরের মতো এবার ২৬ এপ্রিলকে ‘টর্নেডো দিবস’ হিসেবে পালন করছে স্থানীয় সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলো। দিনটি উপলক্ষে সাটুরিয়ার বিভিন্ন ধর্মীয় উপাসনালয়ে নিহতদের স্মরণে দোয়া মাহফিল আয়োজন করা হয়েছে।

আরও পড়ুন

×