নারায়ণগঞ্জে ৭ খুনের যুগপূর্তি
আপিল বিভাগে ৯ বছর ধরে নিষ্পত্তির অপেক্ষায় বিচার
শরীফ উদ্দিন সবুজ, নারায়ণগঞ্জ
প্রকাশ: ২৭ এপ্রিল ২০২৬ | ১০:৫৪ | আপডেট: ২৭ এপ্রিল ২০২৬ | ১১:৫৪
নারায়ণগঞ্জের আলোচিত সাত খুনের ঘটনার আজ যুগপূর্তি হচ্ছে। ২০১৪ সালের ২৭ এপ্রিল প্যানেল মেয়র নজরুল ইসলাম ও আইনজীবী চন্দন সরকারসহ সাতজনকে অপহরণের পর নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়েছিল। নিম্ন আদালত ও হাইকোর্টে দ্রুততম সময়ে বিচার শেষ হলেও গত ৯ বছর ধরে মামলাটি সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে নিষ্পত্তির অপেক্ষায় ঝুলে আছে।
আওয়ামী লীগ সরকারের শাসনামলে বিচার কার্যক্রম চলায় এই হত্যাকাণ্ডে তৎকালীন এমপি শামীম ওসমানের সম্পৃক্ততার অভিযোগ যাচাই করা হয়। উন্মোচন হয়নি ‘গৌরাঙ্গ দা’ রহস্য। এ জন্য এ বিষয়গুলো নতুন করে তদন্ত করে সম্পূরক অভিযোগপত্র দাখিলের দাবি উঠেছে।
ঘটনার বিবরণে জানা যায়, ২০১৪ সালের ২৭ এপ্রিল নারায়ণগঞ্জ আদালতে মামলায় হাজিরা দিয়ে সিদ্ধিরগঞ্জে নিজ বাড়িতে ফিরছিলেন নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের প্যানেল মেয়র নজরুল ইসলাম। পথে ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ লিঙ্ক রোডের লামাপাড়া এলাকায় চেকপোস্ট বসিয়ে তাঁকে ও তাঁর সহযোগীদের অপহরণ করে র্যাব-১১।
ঘটনা দেখে ফেলায় অপহরণ করা হয় পেছনের গাড়িতে থাকা আইনজীবী চন্দন সরকারকেও। অপহরণের তিন দিন পর শীতলক্ষ্যা নদীর বন্দরের শান্তিরচর থেকে প্যানেল মেয়র নজরুল ইসলাম, তাঁর বন্ধু মনিরুজ্জামান স্বপন, তাজুল ইসলাম, লিটন, গাড়িচালক জাহাঙ্গীর আলম, আইনজীবী চন্দন কুমার সরকার, তাঁর গাড়িচালক মো. ইব্রাহীমসহ সাতজনের মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। মরদেহ গুম করার জন্য প্রত্যেকের পায়ে ইট বাঁধা ও পেট কাটা ছিল। নজরুলের চেহারা পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল যাতে চেনা না যায়। এই ঘটনায় ফতুল্লা থানায় পৃথক দুটি মামলা করা হয়। পরবর্তী সময় ৩৩ মাস পর ২০১৭ সালের ১৬ জানুয়ারি জেলা ও দায়রা জজ আদালত মামলার রায় দেন।
রায়ে প্রধান আসামি নূর হোসেন, র্যাব-১১-এর চাকরিচ্যুত তিন কর্মকর্তা– লেফটেন্যান্ট কর্নেল তারেক সাঈদ মোহাম্মদ, মেজর আরিফ হোসেন ও লেফটেন্যান্ট কমান্ডার এম এম রানাসহ ২৬ জনকে মৃত্যুদণ্ড, সাতজনকে ১০ বছর করে এবং দুজনকে সাত বছর করে কারাদণ্ড দেওয়া হয়।
থমকে আছে বিচার ও রহস্যের জট
নিম্ন আদালত ও হাইকোর্টে বিচার দ্রুত শেষ হলেও ২০১৮ সাল থেকে আপিল বিভাগে মামলাটি স্থবির হয়ে আছে। অভিযোগ রয়েছে, রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে অনেক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য ও অভিযুক্তের নাম অভিযোগপত্রে অন্তর্ভুক্ত হয়নি। নারায়ণগঞ্জ সাংস্কৃতিক জোটের সাবেক সভাপতি জিয়াউল ইসলাম কাজল বলেন, ‘নূর হোসেনের সঙ্গে শামীম ওসমানের কথোপকথনের কল রেকর্ড পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। সেখানে নূর হোসেনকে বাঁচাতে শামীম ওসমান ‘গৌরাঙ্গ দা’র সঙ্গে দেখা করতে বলেছিলেন। কিন্তু কে এই গৌরাঙ্গ দা, কেন শামীম ওসমান তার সঙ্গে দেখা করতে বললেন– এ বিষয়টি উন্মোচিত হয়নি। আবার ডিবির জিজ্ঞাসাবাদে এনটিএমসির সাবেক মহাপরিচালক মেজর জেনারেল জিয়াউল আহসানও জানিয়েছিলেন, শামীম ওসমানকে সুবিধা দিতেই এই ঘটনা ঘটেছিল।
তদন্তে গাফিলতির অভিযোগ তুলে নারায়ণগঞ্জ গণতান্ত্রিক আইনজীবী সমিতির সাধারণ সম্পাদক আওলাদ হোসেন বলেন, ‘শামীম ওসমান ও গৌরাঙ্গ দা প্রসঙ্গ দুটি তদন্তের ক্ষেত্রে তদন্ত কর্মকর্তা চরম গাফিলতির পরিচয় দিয়েছেন। বর্তমানে এই বিষয়গুলো তদন্ত করে সম্পূরক চার্জশিট দেওয়া যেতে পারে।
স্বজনের দীর্ঘশ্বাস ও প্রধানমন্ত্রীর প্রতি আহ্বান
দীর্ঘ ১২ বছর ধরে বিচারের অপেক্ষায় থাকা পরিবারগুলোর মধ্যে এখন হতাশা ও অনিশ্চয়তা বিরাজ করছে। নিহত প্যানেল মেয়র নজরুলের স্ত্রী সেলিনা ইসলাম বিউটি আক্ষেপ করে বলেন, ‘সাত খুন মামলার আসামিরা রাজনৈতিক ও প্রশাসনিকভাবে প্রভাবশালী। তাই সরকার আসে সরকার যায়, কিন্তু বিচার আর হয় না। সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া আমাদের সান্ত্বনা দিয়ে বলেছিলেন, বিএনপি ক্ষমতায় এলে এই হত্যাকারীদের বিচার করবে। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান যেন এই হত্যাকাণ্ডের বিচার দ্রুত শেষ করার ব্যবস্থা করেন।’ নিহত তাজুলের ভাই রাজু আহমেদও প্রধানমন্ত্রীর কাছে তাঁর মায়ের দেওয়া সেই প্রতিশ্রুতি রক্ষার আবেদন জানিয়েছেন।
সাত খুন মামলার আইনজীবী ও নারায়ণগঞ্জ মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক অ্যাডভোকেট সাখাওয়াত হোসেন খান অভিযোগ করেন, দণ্ডপ্রাপ্তরা আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতাদের আত্মীয় হওয়ায় বিগত সরকার বিচারকাজ স্থবির করে রেখেছিল। এই মামলার দ্রুত আপিল নিষ্পত্তির জন্য শুনানি করতে চায় রাষ্ট্রপক্ষ। অ্যাটর্নি জেনারেল ব্যারিস্টার রুহুল কুদ্দুস কাজল সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, তারা এই মামলার শুনানি দ্রুত শেষ করার উদ্যোগ নিচ্ছেন। আলোচিত এই মামলার আপিল শুনানি দ্রুত করতে চাইলে গত বছর ২১ অক্টোবর আপিল বিভাগ এই শুনানি চার সপ্তাহের জন্য স্থগিত করেন। এর পর আর শুনানি হয়নি।
বাংলাদেশ মানবাধিকার কমিশনের অ্যাডভোকেট মাহবুবুর রহমান মাসুম বলেন, ‘হত্যাকারীদের দ্রুত ফাঁসি কার্যকর করার দাবি আপামর নারায়ণগঞ্জবাসীর।
- বিষয় :
- নারায়ণগঞ্জ
- আপিল বিভাগ
- মামলা নিস্পত্তি
