ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

ময়মনসিংহের নান্দাইল

ধান মাড়াইয়ে বাড়তি খরচের বোঝা লোকসানের শঙ্কা কৃষকের

ধান মাড়াইয়ে বাড়তি খরচের বোঝা লোকসানের শঙ্কা কৃষকের
×

নান্দাইল উপজেলার ঝালুয়া এলাকায় যন্ত্র দিয়ে ধান মাড়াই করছেন কৃষক। ছবি: সমকাল

নান্দাইল (ময়মনসিংহ) প্রতিনিধি

প্রকাশ: ২৭ এপ্রিল ২০২৬ | ১১:১৩ | আপডেট: ২৭ এপ্রিল ২০২৬ | ১২:২৯

পাম্প ও ডিলারদের কাছ থেকে চাহিদামতো জ্বালানি তেল পাচ্ছেন না হারভেস্টার মেশিন ও মাড়াইকলের মালিকরা। ডিজেল না পাওয়ার অজুহাত দেখিয়ে কৃষকের ধান কাটা বা মাড়াইয়ে রাজি হচ্ছেন না তারা। মাঝে মধ্যে অল্প কিছু তেল পেলেও গত বছরের চেয়ে বেশি মজুরি নিচ্ছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। নান্দাইল উপজেলার বিভিন্ন গ্রাম ঘুরে এমন অভিযোগ পাওয়া গেছে। তবে স্থানীয় প্রশাসনের দাবি, পর্যাপ্ত তেল সরবরাহের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

নান্দাইল উপজেলা কৃষি অফিসে যোগাযোগ করা হলে উপসহকারী উদ্ভিদ সংরক্ষণ কর্মকর্তা কামাল হোসেন জানান, এ বছর উপজেলার ১৩টি ইউনিয়নে ২২ হাজার ২৮০ হেক্টর জমিতে বোরো চাষ করা হয়েছে। নিচু এবং কোনো কোনো জায়গায় কিছু উঁচু জমির ধান কাটা শুরু হয়েছে।

নান্দাইল চৌরাস্তার পদ্মা অয়েল কোম্পানির ডিলার আব্দুল হাই অ্যান্ড সন্সে গিয়ে দেখা গেছে, সেখানে হারভেস্টার ও মাড়াইকলের চালকরা এসে চাহিদামতো ডিজেল নিতে না পেরে ফিরে যাচ্ছেন। এ সময় ডাংরী গ্রামের বাবুল মিয়া এবং জাহাঙ্গীরপুর গ্রামের আব্দুল জব্বার জানান, তাদের একটি করে মাড়াইকল (স্থানীয়ভাবে বোমা নামে পরিচিত) আছে। সেটি চালাতে দৈনিক ৩০ থেকে ৪০ লিটার ডিজেল প্রয়োজন। কিন্তু সারাদিন বিভিন্ন জায়গায় ঘুরেও ৫ লিটার ডিজেল জোগাড় করতে পারছেন না। এ কারণে কৃষকের ধান মাড়াই করে কাঠাপ্রতি গত বছরের ১২০ টাকার জায়গায় এবার ১৪০ থেকে ১৫০ টাকা করে নিচ্ছেন। 

পেচুন্দইর গ্রামের কৃষক আবু সাদেক বলেন, গত বছর এক কাঠা ধান মাড়াই করে মাড়াইকলের চালকরা মুখ সমান করে এক খাদি (পাইয়া) ধান নিতেন। এবার যতটুকু ধরছে ততটুকু নিচ্ছেন। 

বালিয়াপাড়া গ্রামের হারভেস্টার চালক আজিজুল জানান, তেলের জন্য কত জায়গায় যাচ্ছেন, কিন্তু পাচ্ছেন না। এখানে-সেখানে ঘুরে সামান্য যা পান, তা দিয়ে টুকটাক জমির ধান কাটছেন। কিন্তু গতবারের চেয়ে ৫০-১০০ টাকা বেশি মজুরি নিচ্ছেন। 

শিয়ালধরা গ্রামের হাকিমের ভাষ্য, তাঁর তিনটি হারভেস্টার আছে। প্রতিটির জন্য দৈনিক ৫০ থেকে ৬০ লিটার তেল দরকার। কিন্তু কয়েকদিন ধরে দৌড়াদৌড়ি করে গত শুক্রবার মাত্র ৬০ লিটার ডিজেল পেয়েছেন, যা দিয়ে একটিমাত্র হারভেস্টারে দুদিন ধান কাটতে পেরেছেন। আবার কবে তেল পাবেন তাও জানেন না। পুরোদমে ধানকাটা শুরু হলে হারভেস্টার নিয়ে তাঁকে বিপদে পড়তে হবে বলে আশঙ্কা করছেন। তেল না পাওয়ার কারণে ধান কাটার মজুরি বেড়েছে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, গতবছর প্রতি কাঠায় ৬০০ টাকা মজুরি নিয়েছেন, এবার ৬৫০ থেকে ৭০০ টাকা নিচ্ছেন।

তসরা গ্রামের আজিজুল ইসলামের ভাষ্য, তাঁর একটি ইঞ্জিনচালিত প্যাডেল থ্রেসার (মাড়াই কল) আছে। কম ক্ষমতার যন্ত্রটি সারাদিন ধান মাড়াই করতে ১৫ থেকে ২০ লিটার ডিজেল প্রয়োজন। কিন্তু ডিজেল আনতে গেলে মাত্র দুই লিটার দেয়। মাড়াইকলটি চালাতে সহায়ক হিসেবে চারজন শ্রমিক প্রয়োজন। চারজনের হাজিরা চার হাজার টাকার কাছাকাছি। দুই লিটার জ্বালানি তেল দিয়ে মাড়াইকলটি তিনি কতক্ষণ চালাতে পারবেন, তাদেরইবা পোষাবে কি করে আর এই তেল দিয়ে কৃষকদেরই বা কতখানি উপকার করতে পারবেন। তাই বাধ্য কৃষকদের কাছ থেকে কাঠাপ্রতি ধান মাড়াই বাবদ মুখ সমান করে এক খাদি (পাইয়া) ধানের জায়গায় এ বছর দুই কেজি ধান বেশি নিচ্ছেন।

বনাটি আব্দুল্লাহপুরের নাজমুল হক জানান, বর্তমানে প্রতি মণ ধানের মূল্য ৭০০ থেকে ৮০০ টাকা হলেও ১ হাজার ২০০ টাকা দিনমজুর নিয়ে ধানকাটা শুরু হয়েছে। পরে আবার ১৬ কাঠা (১৬০ শতক) জমির ধান মাড়াই করতে চালককে দিতে হচ্ছে ৫ মণ ধান। আছে সেচ, সার, শ্রমিক ও কীটনাশকের খরচ। মাড়াই খরচ বেড়ে যাওয়ায় ধানচাষে লোকসান আরও বেড়ে যাবে।

একই এলাকার সাইদুর রহমান জানান, গতবছর হারভেস্টার দিয়ে প্রতি কাঠা জমির ধান কাটতে ৭০০ করে নিলেও এবার তেলের কারণে ৭৫০ থেকে ৮০০ টাকা নিচ্ছেন। 

নান্দাইল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ফাতেমা জান্নাত জানান, নান্দাইলে ধান কাটা এবং মাড়াইয়ের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সব ধরনের যন্ত্রে পর্যাপ্ত তেল সরবরাহের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। মালিক বা চালকরা ডিজেল না পেলেই তাঁকে জানাবেন। এই অজুহাতে বেশি পারিশ্রমিক বা মজুরি নেওয়ার কোনো সুযোগ নেই।

আরও পড়ুন

×