মাদ্রাসাছাত্রী হত্যার তদন্তে নেমে গোলকধাঁধায় পুলিশ
কুমিল্লা প্রতিনিধি
প্রকাশ: ২৯ এপ্রিল ২০২৬ | ০৭:৫৩
| প্রিন্ট সংস্করণ
কুমিল্লার লাকসামে ইকরা মহিলা মাদ্রাসার সপ্তম শ্রেণির ছাত্রী সামিয়া আক্তারের মৃত্যুর রহস্য তদন্তে গোলকধাঁধায় পড়েছে পুলিশ। ময়নাতদন্তে ধর্ষণের আলামত পাওয়ার কথা উল্লেখ করলেও ডিএনএ পরীক্ষায় মিলেছে ভিন্নতা। ডিএনএ পরীক্ষায় ধর্ষণের কোনো আলামত পাওয়া যায়নি বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। মাদ্রাসার ১২ শিক্ষক-কর্মচারীর ডিএনএ পরীক্ষায়ও কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। এসব কারণে চার্জশিট দিতে বিলম্ব হওয়ার কথা দাবি করেছে পুলিশ। গত সোমবার সমকালকে এসব তথ্য জানান মামলার তদন্ত কর্মকর্তা লাকসাম থানার এসআই সিরাজুল ইসলাম।
জানা গেছে, গত বছরের ১৫ মার্চ লাকসাম রেলগেট এলাকার ইকরা মহিলা মাদ্রাসায় আবাসিকে সামিরা আক্তারকে ভর্তি করা হয়। একই বছরের ১৭ এপ্রিল রাতে মাদ্রাসা ভবনের পঞ্চমতলা থেকে সামিয়া লাফিয়ে নিচে পড়ে আহত হয়েছে বলে পরিবারকে খবর দেওয়া হয়। গুরুতর আহত অবস্থায় তাকে উদ্ধার করে ভোর ৫টার দিকে ঢাকার পঙ্গু হাসপাতালে নেওয়া হয়। পরে ধানমন্ডির পপুলার হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। চিকিৎসাধীন অবস্থায় পরদিন দুপুরে তার মৃত্যু হয়। গত বছরের ২৭ এপ্রিল লাকসাম থানায় অজ্ঞাতনামা আসামি করে হত্যা মামলা করেন মেয়েটির মা শারমিন আক্তার। নিহত শিশুটি নাঙ্গলকোট উপজেলার নাওগোদা গ্রামের সৌদি প্রবাসী নিজাম উদ্দিনের মেয়ে।
ওই মাদ্রাসায় গিয়ে দেখা গেছে, পাঁচতলা ভবনটির অজুখানার পাশে একটি জানালা। ওই জানালার দুটি গ্রিলের মাঝখানে ৬ ইঞ্চি পরিমাণ ফাঁকা। সেখান দিয়ে একজন মানুষ বই-খাতা, কাপড়চোপড়ের ব্যাগ নিয়ে বের হওয়া কষ্টসাধ্য। নিচে আরসিসি ঢালাই সড়ক। পাশে বিদ্যুতের সচল লাইন। প্রায় ৫০ ফুট ওপর থেকে ১৩ বছরের শিশুর নিচে পড়ার বিষয়টি সন্দেহজনক। সামিয়ার পরিবারও একই দাবি করেছে।
মামলার বাদীর ভাষ্য, মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষ মিথ্যা ও ভিত্তিহীন কথা বলে আসল ঘটনা আড়াল করতে চাচ্ছে। তাঁর মেয়েকে যৌন নির্যাতন করা হয়। ঘটনা ফাঁস হওয়ার ভয়ে তাকে পরিকল্পনা করে নিচে ফেলে দিয়ে দুর্ঘটনা বলে চালিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছে। তাঁর প্রশ্ন, মাদ্রাসায় অনেক সিসি ক্যামেরা থাকলেও তাঁর মেয়ের ভবন থেকে নিচে পড়ার কোনো দৃশ্য নেই কেন?
অভিযোগ অস্বীকার করে মাদ্রাসার মুহতামিম (প্রধান) মাওলানা জামাল উদ্দিন বলেন, ঘটনার আগের দিন সামিরা বাড়িতে যেতে চেয়েছিল। তাই সে জানালার ফাঁক দিয়ে পালাতে গিয়ে হয়তো লাফিয়ে পড়ে মারা যায়। তাঁর ভাষ্য, যৌন নির্যাতনের আলামত থাকলেও তা হয়তো আগের মাদ্রাসায় করা হতে পারে। তাঁর মাদ্রাসায় সামিয়াকে কেউ যৌন নির্যাতন করেনি। তিনি বলেন, ‘আমিসহ মাদ্রাসার ১২ শিক্ষক-কর্মচারীর ডিএনএ পরীক্ষা করেছে, কিন্তু কারও আলামত ম্যাচ করেনি।’ তাঁর দাবি, ঘটনার সময় সিসি ক্যামেরাটি বিকল ছিল।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্থানীয় একাধিক ব্যক্তি জানান, এই মাদ্রাসা থেকে প্রায়ই ছাত্রীরা পালিয়ে যেত। সেখানে ছাত্রীদের শারীরিক ও যৌন নির্যাতন করা হতো। এর আগে ২০২১ সালে কুমিল্লার মনোহরগঞ্জের বানঘর গ্রামের নুসরাত নামে ওই মাদ্রাসার ১০ বছর বয়সী শিক্ষার্থী রান্না করা গরম ডালের পাতিলে পড়ে ঝলসে যায় বলে প্রচার করা হয়। পরে হাসপাতালে তার মৃত্যু হয়। এটিও মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষের সাজানো ঘটনা ছিল। পরে মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষ মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে ঘটনাটি ধামাচাপা দেয়।
লাকসাম থানার এসআই সিরাজুল ইসলাম বলেন, ‘সামিয়ার ময়নাতদন্তে ধর্ষণের আলামত পাওয়ার কথা উল্লেখ থাকলেও ডিএনএ প্রতিবেদনে তার কোনো প্রমাণ মেলেনি। তাই উভয় সংকটে পড়তে হয়েছে।’
- বিষয় :
- হত্যার রহস্য উদ্ঘাটন
