ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

জলাবদ্ধতা

মৌসুমের প্রথম বৃষ্টিতেই চট্টগ্রামে কোমরপানি

নগরবাসীর দিনভর ভোগান্তি

মৌসুমের প্রথম বৃষ্টিতেই  চট্টগ্রামে কোমরপানি
×

জলাবদ্ধতার কারণে পরীক্ষার হলে বসার বেঞ্চে পা তুলে লিখতে হয় এসএসসি পরীক্ষার্থীদের। গতকাল মঙ্গলবার কুমিল্লার ঈশ্বর পাঠশালা কেন্দ্র থেকে তোলা -সমকাল

 চট্টগ্রাম ব্যুরো, কুমিল্লা ও ফেনী প্রতিনিধি 

প্রকাশ: ২৯ এপ্রিল ২০২৬ | ০৮:২২ | আপডেট: ২৯ এপ্রিল ২০২৬ | ১২:৪৬

| প্রিন্ট সংস্করণ

সময় তখন দুপুর আড়াইটা। ষোলশহর রেলস্টেশন এলাকায় কোমরপানিতে অসহায় দাঁড়িয়ে এসএসসি পরীক্ষার্থী সাইফুল ইসলাম। নাসিরাবাদ উচ্চ বিদ্যালয় কেন্দ্রে পরীক্ষা শেষ করে দুপুর সোয়া ১টার দিকে মোহাম্মদপুরের বাসার উদ্দেশে রওনা হয়েছিল সে। বাস-রিকশা কিছু না পেয়ে হেঁটেই বাড়ির পথ ধরেছিল। কিন্তু ষোলশহর রেলস্টেশন এলাকার সড়কে পানির তীব্র স্রোত ও গভীরতা তাকে থামিয়ে দেয়। 

ষোলশহর থেকে দেড় কিলোমিটার দূরের প্রবর্তক মোড়ের চিত্র ছিল আরও ভয়াবহ। সেখানে নালা উপচে আসা নোংরা পানি আর ভাসমান আবর্জনা একাকার হয়ে পুরো এলাকায় দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছিল। এর মধ্যে বুকপানি মাড়িয়ে কাউকে কর্মস্থলে যেতে দেখা গেছে। কেউবা ফিরছিলেন বাসায়। শুধু প্রবর্তক মোড় বা ষোলশহর নয়; মৌসুমের প্রথম ভারী বৃষ্টিতেই গতকাল মঙ্গলবার বন্দরনগরী চট্টগ্রাম পরিণত হয়েছিল এক স্থবির ও দুর্ভোগের নগরীতে। 

পতেঙ্গা আবহাওয়া কার্যালয় জানিয়েছে, মঙ্গলবার দুপুর ১২টা থেকে বেলা ৩টা পর্যন্ত ৫১ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। তিন ঘণ্টার বৃষ্টিতেই প্রবর্তক মোড়, মুরাদপুর, বহদ্দারহাট, কাতালগঞ্জ, রহমতগঞ্জসহ নগরীর নিচু এলাকা কার্যত অচল হয়ে পড়ে। এতে চরম দুর্ভোগে পড়েন যাত্রী ও পথচারীরা। 

এসএসসি পরীক্ষার্থী সাইফুল বলে, সামনে যাওয়ার সাহস করতে পারছি না। এক ঘণ্টা দাঁড়িয়ে আছি। বাড়িতে ফোন করেছি; বড় ভাই নিতে আসছে। মা বলেছে একা না যেতে। কারণ বছর দুই আগে মুরাদপুরে নালায় পড়ে জলজ্যান্ত মানুষ মারা গেছে। 

সরেজমিন চিত্র 
প্রবর্তক মোড়ের পানি প্রবাহিত হয় হিজড়া খাল দিয়ে। খালের কাতালগঞ্জ অংশে বাঁধ দিয়ে কালভার্ট তৈরির কাজ চলছে। অন্যদিকে, ষোলশহর ২ নম্বর গেট থেকে বহদ্দারহাট পর্যন্ত চশমা খালের কয়েক স্থানে বাঁধ দিয়ে সংস্কারকাজ চলছে। সেসব বাঁধের নিচে পানি প্রবাহের জন্য একটি করে বড় পাইপ দেওয়া হয়েছে। ফলে বৃষ্টির পানি সহজে নামতে পারছে না। 
বর্তমানে প্রায় ১১ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে সিডিএর জলাবদ্ধতা নিরসন প্রকল্পের আওতায় নগরীর ৩৬টি খাল সংস্কার করা হচ্ছে।

 গত সপ্তাহ থেকে মাসব্যাপী নালা-খাল পরিষ্কার কার্যক্রম শুরু করেছে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন (সিসিসি)। গত সোমবার সকালে নগরীর বান্ডেল খাল, বদরখালী খাল ও বক্সিরহাট এলাকার নালা পরিষ্কার কার্যক্রমের উদ্বোধন করেন মেয়র শাহাদাত হোসেন। 

সিডিএর জলাবদ্ধতা প্রকল্প শুরু হওয়ার আগে নগরীর হালিশহর ও আগ্রাবাদ এলাকায়ও হতো কোমরপানি। তবে গতকাল হালিশহর ও আগ্রাবাদ বণিজ্যিক এলাকায় আগের মতো পানি জমতে দেখা যায়নি। 

অস্থায়ী বাঁধকে দায়ী করছেন মেয়র 
গতকাল দুপুরে প্রবর্তক মোড় ও চমেক এলাকা পরিদর্শন করেন সিটি মেয়র শাহাদাত হোসেন। এ সময় তিনি সাংবাদিকদের বলেন, কেন জলাবদ্ধতা হচ্ছে, কোথায় কী সমস্যা আছে; আমি সরেজমিন দেখতে এসেছি। বহদ্দারহাট, মুরাদপুর, গোসাইলডাঙা, সিডিএ, আগ্রাবাদ, চকবাজার, ফুলতলি ঘুরে এখানে এসেছি। 

প্রবর্তক মোড় ও আশপাশ এলাকায় হিজড়া খালের কাজ সেনাবাহিনীর ৩৪ কনস্ট্রাকশন ব্রিগেড করছে জানিয়ে মেয়র বলেন, সিডিএর জলাবদ্ধতা নিরসন প্রকল্পের অধীনে হিজড়া খাল, জামালখান খাল ও মুরাদপুরের চশমা খালের সংস্কারকাজ চলছে। বিভিন্ন জায়গায় খালে অস্থায়ী বাঁধ দেওয়ার কারণে চকবাজার, প্রবর্তক ও মেডিকেলের সামনে পানি উঠেছে। বাঁধ দিয়ে আসলে রিটেইনিং ওয়ালের কাজ করা হচ্ছে। গত বছর বর্ষায় আমরা জলাবদ্ধতা কমিয়ে দিতে পেরেছিলাম। হিজড়া খালের কাজ যদি আগামী মাসের ১৫ তারিখের মধ্যে শেষ করতে পারি, তাহলে জলাবদ্ধতা এবারও কমবে বলে আমি আশাবাদী। 

সিডিএর নির্বাহী প্রকৌশলী এবং জলাবদ্ধতা নিরসন প্রকল্পের পরিচালক আহমদ মঈনুদ্দীন সমকালকে বলেন, প্রকল্পের আওতায় ৩৬টি খালের মধ্যে ৩৪টির সংস্কারকাজ ইতোমধ্যে শেষ হয়েছে। কেবল প্রবর্তকের হিজড়া খাল ও জামালখান খালের কাজ শেষ হয়নি। প্রকল্পের ৯৪ শতাংশ কাজ শেষ হওয়ায় এর সুফলও নগরবাসী পাচ্ছেন। আমরা চলতি বছরেই প্রকল্পের কাজ শেষ করতে চেয়েছিলাম। তবে আমাদের চেয়ারম্যান কাজ বন্ধ রেখে দ্রুত বাঁধ অপসারণ করতে বলেছেন। এ জন্য আবার কাজ শুরু হবে আগামী অক্টোবরে। সে ক্ষেত্রে ২০২৭ সালের জুনে প্রকল্পের কাজ শেষ হবে। 

বৃষ্টির মৌসুম শুরুর আগে কেন বাঁধ সরানো হলো না– এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, অস্থায়ী বাঁধ ছাড়া তো খালে রিটেইনিং ওয়ালের কাজ করা সম্ভব নয়। 

বিশেষজ্ঞ মত 
এ ব্যাপারে নগর বিশেষজ্ঞ, প্রকৌশলী দেলোয়ার মজুমদার বলেন, খাল-নালায় অস্থায়ী বাঁধের কারণে জলাবদ্ধতা হয়েছে, এটা ঠিক। তবে আমরা প্রথম থেকেই বলছি, এটা একটা ত্রুটিপূর্ণ ও অসম্পূর্ণ প্রকল্প। দুই বছরের প্রকল্প ছয় বছর ধরে চলছে এবং এখনও কেন খালে মাটি থাকবে– এটাই প্রশ্ন। এ কারণে জলাবদ্ধতার সমস্যা বারবার হচ্ছে। 

মোমবাতির আলোয় পরীক্ষা দিল কুমিল্লা ও ফেনীর শিক্ষার্থীরা 
বৈশাখের প্রথম ভারী বর্ষণে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে কুমিল্লা ও ফেনীর নগরজীবন। গতকাল সকাল থেকে শুরু হওয়া ঝড় ও বৃষ্টিতে দুই জেলা শহরের অধিকাংশ সড়ক তলিয়ে গিয়ে কৃত্রিম বন্যার সৃষ্টি হয়। বৃষ্টির কারণে বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ায় চরম ভোগান্তিতে পড়ে এসএসসি ও দাখিল পরীক্ষার্থীরা। অনেক কেন্দ্রে শিক্ষার্থীদের মোমবাতি ও চার্জ লাইটের আলোতে পরীক্ষা দিতে হয়েছে। 

গতকালের বৃষ্টিতে কুমিল্লা নগরীর ঠাকুরপাড়া, রেসকোর্স, বিসিক, আদালতপাড়াসহ বিভিন্ন এলাকা পানির নিচে তলিয়ে যায়। সড়কে অনেক যানবাহন বিকল হয়ে পড়ে থাকতে দেখা গেছে। 

নবাব ফয়জুন্নেছা সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক রাশেদা আক্তার বলেন, ‘ভবনের নিচতলায় থাকা ২টি কক্ষে যতক্ষণ বিদ্যুৎ ছিল না, ততক্ষণ মোমবাতি ও চার্জ লাইট দিয়ে পরীক্ষা শেষ করা হয়।’ 

নগরীর ঈশ্বর পাঠশালা উচ্চ বিদ্যালয় পরীক্ষা কেন্দ্রের ভেতরে পানি ঢুকে পড়ে। বাধ্য হয়ে শিক্ষার্থীরা বেঞ্চের ওপর পা তুলে পরীক্ষায় অংশ নেয়। পরীক্ষার্থী আবু রায়হান ও সালেহ আকরাম জানায়, এমন অস্বস্তিকর পরিবেশে মনোযোগ ধরে রাখা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়েছিল। 

নগরীর জিলা স্কুল ও স্টেডিয়াম মার্কেট এলাকায় সড়ক উপচে পাশের ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে পানি ঢুকে পণ্য নষ্ট হয়েছে। স্টেডিয়াম মার্কেটের ইলেকট্রনিক্স ব্যবসায়ী আবদুল করিম বলেন, ‘সকাল থেকে বৃষ্টিতে দোকানের ভেতর পানি ঢুকে পড়েছে। এতে ১৫-২০ লাখ টাকার মাল নষ্ট হয়ে গেছে।’ 

কুমিল্লা সিটি করপোরেশনের প্রশাসক ইউসুফ মোল্লা টিপু জানান, পানি অপসারণে তিনি নিজে রাস্তায় নেমে কর্মীদের নিয়ে কাজ করছেন। 

ফেনীতে মৌসুমের সর্বোচ্চ বৃষ্টি  
ফেনী আবহাওয়া অফিস জানিয়েছে, গত ২৪ ঘণ্টায় জেলায় ১৫০ দশমিক ৬ মিলিমিটার বৃষ্টি রেকর্ড করা হয়েছে, যা এই মৌসুমের সর্বোচ্চ। ভারী বৃষ্টিতে শহরের শহীদ শহীদুল্লা কায়সার সড়ক, মিজান রোডসহ প্রধান সড়কগুলো তলিয়ে যায়। 

ফেনী সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় কেন্দ্রের পরীক্ষার্থী বিদীত জাহাঙ্গীর বলে, ‘তীব্র ঝড়-বৃষ্টির কারণে বিদ্যুৎ বন্ধ থাকায় বিকল্প ব্যবস্থা করে আলো জ্বালানো হয় কেন্দ্রে। সেই আলোতে আমাদের পরীক্ষা দিতে হয়েছে।’ 

এদিকে গত রোববার কালবৈশাখীতে বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইন ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় পরশুরাম উপজেলায় ৪৮ ঘণ্টা ধরে বিদ্যুৎ নেই। পরীক্ষার্থী শরিফুল ইসলাম বলে, ‘ঘরে বিদ্যুৎ নেই, পরীক্ষা কেন্দ্রে মোমবাতির আলোয় পরীক্ষা দিতে হয়েছে। ঝোড়ো বাতাসে বারবার মোমবাতি নিভে যাওয়ায় মনোযোগে ব্যাঘাত ঘটেছে।’ 

কসবায় সড়কে গাছ পড়ে দুই ঘণ্টা যান চলাচল বন্ধ
কসবা প্রতিনিধি জানিয়েছেন, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কসবা উপজেলায় গতকাল সকালে ৬০-৭০ মাইল বেগে বয়ে যাওয়া কালবৈশাখীতে ১১৩টি ঘরবাড়ি, দুটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং শতাধিক গাছপালা ভেঙে পড়ে। ঝড়ে বিনাউটি ইউনিয়নের তিনলাখপীর এলাকায় একটি মোবাইল টাওয়ার এবং মইনপুর বিজিবি ক্যাম্পের সামনে পল্লী বিদ্যুতের খুঁটি ও গাছ ভেঙে পড়ে। এতে প্রায় দুই ঘণ্টা কুমিল্লা-কসবা মহাসড়কে যান চলাচল বন্ধ থাকে। গাছ ও খুঁটি অপসারণ করা হলে বেলা ১১টার দিকে সড়কে পুনরায় যান চলাচল শুরু হয়। ঘরবাড়ির পাশাপাশি ফসলি জমিরও ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। 

 

আরও পড়ুন

×