কষ্টের ফসল ঘরে তুলতে রাত জেগে পাহারা
বন্য হাতির আক্রমণ থেকে ফসল রক্ষা করতে ক্ষেতের পাশে পাহারা বসিয়েছেন কৃষক। নালিতাবাড়ী উপজেলার পানিহাটা এলাকা সমকাল
নালিতাবাড়ী (শেরপুর) প্রতিনিধি
প্রকাশ: ৩০ এপ্রিল ২০২৬ | ০৮:২৬
| প্রিন্ট সংস্করণ
ধারদেনা করে পাহাড়ের ঢালে সাড়ে তিন একর জমি বর্গা নিয়ে বোরো ধান চাষ করেছেন আব্দুল মালেক। ফলন ভালো হয়েছে। ধান পাকতে আরও সপ্তাহখানেক লাগবে। এরই মধ্যে কয়েক দিন আগে ২০-২৫টি বন্য হাতির একটি দল হানা দিয়ে তাঁর তিন-চার কাঠা জমির ধান খেয়ে ও মাড়িয়ে নষ্ট করেছে। বাকি ফসল বাঁচাতে ধানক্ষেত পাহারা দিতে হচ্ছে তাঁকে।
বছরের পর বছর বন্য হাতির সঙ্গে যুদ্ধ করেই গারো পাহাড়ের সীমান্তে কৃষকদের ধান চাষ করতে হয়। বর্তমানে হাতির উপদ্রব বেড়ে যাওয়ায় তাদের আতঙ্ক আরও বেড়েছে। তাই পাকা ধান ঘরে তুলতে রীতিমতো যুদ্ধ করতে হচ্ছে তাদের।
সরেজমিন জানা গেছে, গত কয়েক দিনে পাহাড় থেকে নেমে আসা একদল বন্য হাতি শেরপুরের নালিতাবাড়ী উপজেলার রামচন্দ্রকুড়া ইউনিয়নের পানিহাটা, ফেকামারী ও তালতলা এলাকায় কয়েকজন প্রান্তিক কৃষকের বোরো ক্ষেতে এই তাণ্ডব চালায়।
গত মঙ্গলবার দুপুরে ওই এলাকায় গেলে কৃষক আব্দুল মালেকের স্ত্রী নুর নাহার জানান, দিনমজুরি করে স্বামী ও সন্তানদের নিয়ে কোনোরকমে চলে অভাবের সংসার। তাদের
চার কাঠা জমির ধান হাতি খেয়ে ও পা দিয়ে মাড়িয়ে নষ্ট করেছে। বাকি ফসল রক্ষা করতে না পারলে সারাবছর সংসার চালাতে বড় বিপদে পড়তে হবে।
ভুক্তভোগী কৃষকরা জানান, নালিতাবাড়ীর গারো পাহাড় এলাকায় ২০-২৫টি বন্য হাতি দল বেঁধে দিনের বেলায় গভীর জঙ্গলে লুকিয়ে থাকে আর সন্ধ্যা ঘনিয়ে এলেই খাবারের সন্ধানে বোরো ক্ষেতে নেমে পড়ে। হাতির পালটি ক্ষেতের ফসল খেয়ে ও মাড়িয়ে সাবাড় করে দিচ্ছে।
তালতলা এলাকার কৃষক হাতেম আলী বলেন, ১১ কাঠা জমিতে বোরো ধান চাষ করেছেন। ফসল পাকতে ও কাটতে আরও এক সপ্তাহ সময় দরকার। কিন্তু হাতির ভয়ে আছেন তিনি। দুদিন আগেও হাতির পাল ধানক্ষেতে নেমেছিল। পরে গ্রামবাসী মিলে হইহুল্লোড় করে ক্ষেত থেকে হাতির পাল তাড়িয়ে দিয়েছে।
পানিহাটা এলাকার ক্ষতিগ্রস্ত চাষি হযরত আলীর ভাষ্য, ঋণ করে পৌনে ১০ কাঠা জমি চাষ করেছেন। এর মধ্যে দুই কাঠা জমির ধান হাতি খেয়ে শেষ করেছে। হাতির কবল থেকে ফসল রক্ষা করতে তিন সপ্তাহ ধরে নির্ঘুম রাত কাটাচ্ছেন তারা।
মায়াঘাসী এলাকার কিষানি পূরবী দিও জানান, এক একর জমিতে ধান চাষ করেছেন তিনি। ফলনও ভালো হয়েছে, কিন্তু প্রায় প্রতিরাতেই হাতি অত্যাচার করে। সবাই রাত জেগে পাহারা দিচ্ছেন। শরীরে আর কুলায় না, হাতির কাছে নিরুপায় হয়ে গেছেন তারা।
আন্ধারুপাড়া গ্রামের কৃষক মেজেস সাংমার ভাষ্য, মাঝেমধ্যেই বন্য হাতি তাদের বোরো ক্ষেতে হানা দেয়। তাই ফসল বাঁচাতে ক্ষেতের পাশে টংঘর বানিয়ে রাত-দিন পাহারা দিচ্ছেন। হাতি তাড়ানোর জন্য ডাক-চিৎকার, হইহুল্লোড় করে, টিন পিটিয়ে শব্দ করে, আবার কখনও মশাল জ্বালিয়ে থাকেন তারা। কিন্তু বর্তমানে ডিজেল সরবরাহ কম থাকায় ও দাম বেশি হওয়ায় হাতি তাড়াতে হিমশিম খেতে হচ্ছে।
ময়মনসিংহ বন বিভাগের মধুটিলা ফরেস্ট রেঞ্জ কর্মকর্তা দেওয়ান আলী বলেন, ‘আমরা বন বিভাগের পক্ষ থেকে বন্য হাতি দ্বারা ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের ক্ষতিপূরণ দিচ্ছি। একইসঙ্গে বন্য হাতি ও মানুষের মাঝে সহাবস্থানের জন্য আমরা এলাকার মানুষদের সচেতন করছি।’
- বিষয় :
- হাতি
