ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

মজুরি বৈষম্যের অবসান চান নারী দিনমজুররা

মজুরি বৈষম্যের অবসান  চান নারী দিনমজুররা
×

ছাতকের সুরমা নদীর খেয়াঘাটসংলগ্ন স্টোন ক্রাশার মিলে কাজ করছেন কয়েকজন নারীশ্রমিক। গতকাল বৃহস্পতিবার তোলা সমকাল

ছাতক (সুনামগঞ্জ) প্রতিনিধি

প্রকাশ: ০১ মে ২০২৬ | ০৮:২২

| প্রিন্ট সংস্করণ

সুনামগঞ্জের শিল্প নগরী হিসেবে পরিচিত ছাতক উপজেলায় ভালো নেই নারী দিনমজুররা। অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে ঝুঁকি নিয়ে কাজ করা এসব নারী শ্রমিকরা প্রতিনিয়তই মজুরি বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন। প্রতিবছরই ঢাক-ঢোল পিটিয়ে আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস পালিত হলেও তাদের খবর কেউ রাখে না।

ছাতক নদী বন্দর এলাকায় প্রতিদিন দুই শতাধিক ইঞ্জিনচালিত নৌকা, বাল্কহেড কর্গো বালু-পাথর ও সিমেন্ট-ইট পরিবহন করে থাকে। ছাতক থেকে প্রতিদিন সুরমা নদী হয়ে বালু, পাথর ও সিমেন্ট রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে পাঠানো হয়। এসব পরিবহনে মালাপত্র লোড-আনলোডিংয়ে প্রতিদিন হাজারো দিনমজুর কাজ করেন। এর মধ্যে শতাধিক নারী দিনমজুর রয়েছে। এসব কাজে প্রত্যেক পুরুষকে দৈনিক ৭০০ থেকে ৮০০ টাকা মজুরি দেওয়া হলেও নারী শ্রমিকদের দেওয়া হয় ৫০০-৬০০ টাকা।
উপজেলার ইসলামপুর ইউনিয়নের রহমতপুর গ্রামের নারী শ্রমিক কুলসুম বেগম ও নোয়ারাই ইউনিয়নের জয়নগর গ্রামের জুলেখা বেগম বলেন, আমরা দিনমজুর আমাদের দুঃখ দেখার কেউ নাই। অসুস্থ হলে ঘরে পড়ে থাকতে হয়। দুর্ঘটনায় পড়লে চিকিৎসায় নিজের অনেক টাকাপয়সা খরচ হয়। আমরা সবসময়ই আমাদের কর্মস্থলে অবহেলা আর বঞ্চনার শিকার হই। পুরুষদের সঙ্গে তাল মিলিয়ে সারাদিন কাজ করলেও আমাদের মজুরি ২০০-৩০০ টাকা কম দেওয়া হচ্ছে। যা দুঃখজনক। প্রশাসনের কাছে তারা এ মজুরি বৈষম্যের অবসান দাবি করেন।
গতকাল বৃহস্পতিবার সরেজমিন সুরমার তীরে গিয়ে দেখা যায়, ৬৫ বছর বয়সী দিনমজুর রোকেয়া বেগম। তিনি পাথর ভাঙার একটি মিলে কাজ করেন। গত ১৫ বছর ধরে সুরমা নদীর তীরে বাল্কহেডে বালু-পাথর লোডিংয়ের কাজ করছেন। যখন যেখানে কাজ পান, তখনই সেখানে ছুটে যান। দৈনিক ৫০০ টাকা মজুরিতে সপ্তাহে চার-পাঁচ দিন কাজ করেন। তিনি বলেন, আমাদের কাজ থাকলে মজুরি আছে, না থাকলে ধারদেনা করে সংসার চালাতে হয়। তিন ছেলে ও তিন মেয়েকে নিয়ে তাঁর সংসার। অর্থের অভাবে ছেলেমেয়েদের খুব একটা পড়ালেখা করাতে পারেননি। মনে কষ্ট নিয়ে কথাগুলো বলছিলেন ছাতক পৌরসভার চরেরবন্দ এলাকার বাসিন্দা এই দিনমজুর। 

উপজেলার নোয়ারাই ইউনিয়নের জয়নগর গ্রামের বাসিন্দা ৫৫ বছর বয়সী বিধবা নারী রেজিয়া বেগম। তিনি জানান, ১০ বছর আগে তাঁর স্বামী মারা গেছেন। সপ্তাহে পাঁচ দিন মাত্র ৫০০ টাকা মজুরিতে বাল্কহেড ও ট্রলারে বালু লোডিংয়ের কাজ করেন। অথচ পুরুষ শ্রমিকরা দৈনিক ৭০০ থেকে ৮০০ টাকা মজুরি পান। তিনি বলেন, রোদ-বৃষ্টির মাঝেও কাজ করতে হয়। অসুখ-বিসুখ হলে ঘরে পড়ে থাকতে হয়। কিন্তু তাদের মজুরি বৈষম্যের বিষয়টি দেখার কেউ নেই।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, উপজেলার বিভিন্ন পাথর ও বালু লোডিংয়ের সাইটে রোকিয়া ও রেজিয়ার মতো শত শত নারী দিনমজুরের কাজ করলেও ন্যায্য মজুরি থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। দৈনিক ৮-৯ ঘণ্টা কাজ করে পুরুষরা শ্রমিকরা ৭০০-৮০০ টাকা পেলেও নারী শ্রমিকরা মজুরি পাচ্ছেন ৪০০-৫০০ টাকা। অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে কাজ করতে বাধ্য হন নারী শ্রমিকরা। তাদের জন্য প্রকল্প সাইটে টয়লেটের ব্যবস্থাও থাকে না। 
নোয়ারাই ইউনিয়নের জয়নগর গ্রামের লেবার সর্দার সফিক মিয়া বলেন, প্রতিদিনই পুরুষ শ্রমিকের পাশাপাশি নারী শ্রমিকরা বিভিন্ন সাইটে কাজ করেন। নারী শ্রমিকদের মজুরি বৈষম্যের বিষয়টি স্বীকার করে তিনি বলেন, নারী শ্রমিকরা পুরুষ শ্রমিকদের সমপরিমাণ কাজ করতে পারে না বিধায় তাদের মজুরি কিছুটা কম দেওয়া হয়। এ বিষয়ে বিভিন্ন কারখানা মালিক ও ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে আগামীতে নারীদের সমান মজুরি দেওয়ার চেষ্টা করব। 
জেলা মহিলাবিষয়ক কার্যালয়ের উপপরিচালক এ জে এম রেজাউল আলম বিন আনছার বলেন, কর্মক্ষেত্রে আসলে নারী-পুরুষের মজুরি বৈষম্য কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। এ ধরনের বৈষম্য করার কোনো আইনগত এখতিয়ার কারও নেই। বিষয়টি তিনি জেলা পর্যায়ের সভা এবং মহিলাবিষয়ক মন্ত্রণালয়কে অবহিত করবেন। 
এ বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ডিপ্লোমেসি চাকমা বলেন, নারী দিনমজুরদের মজুরি বৈষম্যের বিষয়ে কেউ তাঁর কাছে অভিযোগ জানায়নি। নারীদের সমান মজুরি নিশ্চিতে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে বিষয়টি আলোচনা করা হবে।

আরও পড়ুন

×