মানুষের সেবায় মহেববুল
হোমিও চিকিৎসক মহেববুল ইসলামের কাছে প্রতিদিন কয়েকশ রোগী আসেন। প্রত্যেককে আন্তরিকতার সঙ্গে চিকিৎসা দেন। সম্প্রতি তোলা সমকাল
আলতাফ হোসেন দুলাল, রংপুর
প্রকাশ: ০১ মে ২০২৬ | ০৯:০২ | আপডেট: ০১ মে ২০২৬ | ১০:০৪
| প্রিন্ট সংস্করণ
মানসিংহপুর মণ্ডলপাড়া গ্রামে সকাল হতেই মানুষের আনাগোনা বাড়তে থাকে। তাদের বেশির ভাগ মানুষের গন্তব্য মহেববুল ইসলামের বাড়ি। সেখানে আছে ‘মোহসিন হোমিও চেম্বার’। ৩০ শতক জায়গাজুড়ে থাকা এই চিকিৎসাকেন্দ্রের কারণে গ্রামটি ‘ডাক্তারপাড়া’ নামে পরিচিতি পেয়েছে। এখানে চিকিৎসা নিতে প্রতিদিন কয়েকশ মানুষ আসেন। শুধু চিকিৎসাসেবা নয়, বিভিন্নভাবে প্রায় ৬৫ বছর ধরে মানুষের পাশে দাঁড়াচ্ছেন মহেববুল ইসলাম।
রংপুরের বদরগঞ্জ উপজেলা সদর থেকে ৯ কিলোমিটার উত্তর-পশ্চিমে মানসিংহপুর মণ্ডলপাড়া গ্রাম। গত বুধবার সকালে ওই গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, মহেববুল ইসলামের বাড়ির পাশে চিকিৎসাকেন্দ্রের বাইরে মানুষের জটলা। চিকিৎসালয় ঘিরে গড়ে উঠেছে তিনটি ভাতের হোটেল ও কয়েকটি চা-বিস্কুটের দোকান। চেম্বারের ভেতরে দেখে মনে হলো, ছোট হাসপাতাল। কয়েকশ রোগী সেখানে বসে আছেন। কোনো বিশৃঙ্খলা কিংবা চিৎকার-চেঁচামেচি নেই। একের পর এক রোগী এসে সারিবদ্ধ আসনে বসছেন। দায়িত্বে থাকা লোকজন সারিতে গিয়ে রোগীর নাম লিখে স্লিপ করছেন।
সারির এক প্রান্তে ছোট্ট এক টেবিলে স্লিপগুলো পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে। টেবিলের পাশে কাঠের চেয়ারে বসা সফেদ পাঞ্জাবি পরিহিত মহেববুল ইসলাম। তিনি স্লিপে থাকা রোগীর নাম ধরে ডাকছেন। পাশে বসিয়ে রোগের বিবরণ শুনে আন্তরিকতার সঙ্গে চিকিৎসা দিচ্ছেন। পাশাপাশি খোঁজ নিচ্ছেন পরিবারের। ৮০ বছর বয়সী মহেববুলকে দেখে মনে হলো, বয়স তাঁকে দমাতে পারেনি।
মানুষের জন্য কিছু করার পণ
মহেববুল ইসলামের বাবা প্রয়াত মোহসেন আলী ছিলেন রাধানগর হাই স্কুলের প্রধান শিক্ষক। শিক্ষকতার পাশাপাশি তিনি এলাকার মানুষকে হোমিও চিকিৎসা দিতেন। সাধ্য অনুযায়ী অনেককে বিনামূল্যে ওষুধও দিয়েছেন। ছোটবেলা থেকেই বাবার এই কর্মকাণ্ড মহেববুলের হৃদয়ে নাড়া দিত। ৯ বছর বয়সে একটি ঘটনা তাঁর জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়।
একদিন বাড়ির কাজের পারিশ্রমিক হিসেবে এক দিনমজুরকে এক টাকা দিতে বলেন মোহসেন আলী। অপুষ্টিতে ভোগা ওই দিনমজুরের হাতে সেই টাকা তুলে দেওয়ার সময় মহেববুলের মনে প্রশ্ন জাগে– এক টাকায় তিনি নিজে খাবেন, নাকি পরিবারকে খাওয়াবেন? নিজের চিকিৎসাইবা করাবেন কীভাবে! সেই প্রশ্নই তাঁকে নাড়া দেয় ভেতর থেকে। তখনই মনে মনে শপথ নেন, তিনি জীবন কাটাবেন মানুষের সেবায়। ১৯৭১ সালে দেশ স্বাধীনের পর রংপুর সরকারি হোমিওপ্যাথিক মেডিকেল কলেজ থেকে ডিপ্লোমা ইন হোমিওপ্যাথিক মেডিসিন অ্যান্ড সার্জারি (ডিএইচএমএস) কোর্স সম্পন্ন করেন মহেববুল।
১৫ বছর বয়সে শুরু মানবসেবা
১৫ বছর বয়স থেকেই মানুষের পাশে দাঁড়ানো শুরু করেন মহেববুল ইসলাম। টিফিনের টাকা বাঁচিয়ে অসচ্ছল সহপাঠীদের খাতা-কলম কিনে দিতেন। গ্রামের অসুস্থ মানুষের পাশে দাঁড়াতেন। ১৯৭৮ সালে বাবার মৃত্যুর পর গ্রামে বাড়ির পাশে তাঁর নামে ‘মোহসেন হোমিও চেম্বার’ প্রতিষ্ঠা করেন মহেববুল; শুরু করেন বিনামূল্যে চিকিৎসাসেবা কার্যক্রম।
চেম্বারের দায়িত্বপ্রাপ্তরা জানান, শুরুতে টানা চার বছর ওই চেম্বারে সম্পূর্ণ বিনামূল্যে চিকিৎসা ও ওষুধপত্র দেন মহেববুল। পরে খরচ সামলাতে না পেরে চেম্বারের বাইরে একটি বাক্স স্থাপন করেন। বিনা টাকায়
চিকিৎসাসেবা ও ওষুধ নিয়ে চেম্বার ত্যাগ করার সময়ে সচ্ছল রোগীরা স্বেচ্ছায় বাক্সে টাকা ফেলতেন। এই টাকায় কিছুটা মেটানো হতো চিকিৎসার খরচ। কিন্তু বর্তমানে চেম্বারে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে চিকিৎসা নিতে আসেন প্রতিদিন গড়ে ৭০০ থেকে ৮০০ রোগী। ওষুধের দাম বৃদ্ধি এবং চেম্বারে কর্মচারীর সংখ্যা ও খরচ বেড়ে যাওয়ায় সচ্ছল রোগীদের কাছ থেকে ওষুধ বাবদ নেওয়া হচ্ছে সর্বোচ্চ ৩০ টাকা। এই টাকায় ওষুধ কেনাসহ চেম্বারের যাবতীয় ব্যয় বহন করা হচ্ছে।
কথা বলার ফুরসত নেই মহেববুলের
চিকিৎসাকেন্দ্রে প্রতিনিয়ত রোগীর ভিড়। এই পরিস্থিতির মধ্যে এক ফাঁকে মহেববুল ইসলাম সমকালকে বলেন, চেম্বারে প্রতিদিন গড়ে হাজারের মতো রোগী আসেন। এসব রোগী দেখার কাজে সহযোগিতা করেন ভাতিজা আদিবুল ইসলাম, ছেলে মোহতাদিউল ইসলাম এবং পুত্রবধূ সুমাইয়া জেসমিন। তিনজনই বাংলাদেশ সরকারি হোমিওপ্যাথিক কলেজ, রংপুর থেকে ডিএইচএমএস ডিগ্রিধারী।
তিনি আরও বলেন, বাবার রেখে যাওয়া জমিজমা চাষাবাদ করার টাকায় গ্রামে আমার স্বাচ্ছন্দ্যে সংসার চলে। গ্রামের মানুষের জন্য কিছু করতে পেরে আনন্দ পাই। বাবার স্বপ্ন ও আমার পণ ছিল– গ্রামে বসে মানবসেবামূলক কাজ করব। নিঃস্বার্থভাবে সেই কাজ করে জীবনের শেষ প্রান্তে এসে দাঁড়িয়েছি। কতটা করতে পেরেছি, তা মানুষই ভালো বলতে পারবে।
সেবাগ্রহীতারা যা বলছেন
মহেববুল ইসলামের কাছে চিকিৎসা নিতে আসা ব্যক্তিদের দাবি, তাঁর কাছে সাধারণ রোগ থেকে শুরু করে বিভিন্ন জটিল রোগের চিকিৎসা মেলে। চিকিৎসা প্রদানের পাশাপাশি মহেববুল রোগীর পরিবার-পরিজনের খোঁজ নেন। কারও সন্তান অধ্যয়নরত থাকলে লেখাপড়া করানোর উৎসাহ দেন। প্রয়োজনে দেন সহায়তার আশ্বাস। বয়স না হওয়া পর্যন্ত সন্তানদের বিয়ে না দেওয়া, বন্ধুসুলভ আচরণ এবং খেলাধুলায় অংশগ্রহণের সুযোগ করে দেওয়ার আহ্বান জানান।
ঠাকুরগাঁও থেকে চিকিৎসা নিতে আসা মিনারা বেগম বলেন, ‘তিন মাস থেকে এখানে হোমিও চিকিৎসা নিয়ে এখন অনেকটা সুস্থ আছি।’ দূর থেকেও তাঁর কাছে চিকিৎসা নিতে আসেন মানুষ।
এলাকাবাসীর চোখে মহেববুল
এলাকার দরিদ্র মেধাবী শিক্ষার্থীদের স্কুল-কলেজে ভর্তিসহ বই, খাতা-কলম কিনে দিয়ে সব সময়ে সহযোগিতা করেন মহেববুল ইসলাম। সময় পেলেই তিনি স্থানীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে গিয়ে পড়াশোনাসহ শিক্ষার্থীদের খোঁজ নেন; দেন প্রয়োজনীয় পরামর্শ। সাধ্যমতো আর্থিক সহযোগিতাও করেন।
আফতাবগঞ্জ দাখিল মাদ্রাসার শিক্ষক আব্দুল মাজেদ বলেন, ‘মহেববুল চাচার মতো পরোপকারী সাদা মনের মানুষ সমাজে বিরল। তিনি সর্বজন শ্রদ্ধেয়ও ব্যক্তি। সময় পেলে এলাকার বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে গিয়ে পড়াশোনার খোঁজ নেন। প্রয়োজনে আর্থিক সহায়তাও করেন।’
মানসিংহপুর ডাক্তারপাড়া গ্রামের ইয়াছিন আলী বলেন, ‘তিনি শীতার্তদের শীতবস্ত্র, তরুণ ও যুবকদের মাঝে খেলনা সরঞ্জাম, ঈদে খাদ্যসামগ্রী বিতরণ করেন। অসহায় নারীদের স্বাবলম্বী করতে সেলাই মেশিনও কিনে দেন।’
স্থানীয় মেম্বার মোশফিকুর রহমান বলেন, ‘নিরহঙ্কার ও মানবিক চিকিৎসক মহেববুল ইসলাম। তাঁর কাছে কেউ সহযোগিতা চাইলে খালি হাতে ফেরান না।’ রাধানগর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আবু বক্কর সিদ্দিক বলেন, ‘মহেববুল ইসলাম এলাকার গর্ব। তাঁকে দেখে অনেক কিছু শেখার আছে।’
- বিষয় :
- সেবামুলক উদ্যোগ
- চিকিৎসা
- হোমিও চিকিৎসক
