ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

বাগেরহাটে বৃষ্টিতে তলিয়ে যাচ্ছে কৃষকের স্বপ্ন

বাগেরহাটে বৃষ্টিতে তলিয়ে যাচ্ছে কৃষকের স্বপ্ন
×

বাগেরহাটের কচুয়ায় ভিজে যাওয়া ধান মাথায় করে ঘরে নিচ্ছেন কৃষক। ছবি: সমকাল

বাগেরহাট প্রতিনিধি

প্রকাশ: ০১ মে ২০২৬ | ১৮:১৮

বাগেরহাটে হঠাৎ টানা বৃষ্টি ও ঝোড়ো বাতাসে মাঠে কেটে রাখা ও আধাপাকা বোরো ধান পানিতে তলিয়ে গেছে। একদিকে শিলাবৃষ্টি ও টানা বর্ষণে ফলন বিপর্যয়, অন্যদিকে ধানের চরম দরপতন এবং আকাশচুম্বী শ্রমিকের মজুরিতে দিশাহারা হয়ে পড়েছেন প্রান্তিক কৃষকরা। 

কৃষকদের অভিযোগ, বর্তমান বাজারে দুই মণ ধান বিক্রির টাকা দিয়েও একজন শ্রমিকের একদিনের মজুরি মেটানো সম্ভব হচ্ছে না। 

বাগেরহাটের কচুয়া উপজেলার বারুইখালী গ্রামে বর্গা নিয়ে দুই বিঘা জমিতে ধান চাষ করেন ষাটোর্ধ্ব বিনয় সরকার। প্রতি বছর তার জমিতে ৮০ থেকে ১০০ মণ ধান উৎপাদন হলেও হঠাৎ বৃষ্টির কারণে মাঠে কেটে রাখা ধান পানিতে তলিয়ে গেছে। 

তিনি বলেন, টানা বৃষ্টিতে যে পরিমাণ পানি জমেছে কবে নামবে তার ঠিক নেই। ধান গজ উঠে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। যে অবস্থা দেখছি এ বছর, সর্বোচ্চ ৩৫ থেকে ৪০ মণ ধান পেতে পারি। তাতে খরচের টাকাও উঠবে না বলে দাবিও করেন তিনি।

পার্শ্ববর্তী ধলনগর গ্রামের কৃষক ইয়াসিন আলী বলেন, ধানে একটু চাল চাল ভাব আসলেই প্রথমে শিলাবৃষ্টিতে এক দফা ক্ষতি হয়। তখনই অনেক ধান ঝরে গেছে। এবার গেল পাকা ধান পানির নিচে। এবার ধানের দাম অন্য বছরের চেয়েও কম; মণ ৮০০ টাকা এবং এর চেয়েও কমে বিক্রি হচ্ছে। 

একই এলাকার ৫৫ বছর বয়সী দিনমজুর মুজিবর শেখে দিনমজুরির কাজের পাশাপাশি সমিতি থেকে ৩০ হাজার টাকা ঋণ নিয়ে এক বিঘা জমিতে ধান চাষ করেছিলেন তিনি। ৫ সদস্যের সংসারে কিছুটা স্বচ্ছলতা ফেরাতে ঋণ নিয়ে এখন আরও বেশি বিপদে পড়েছেন বলে জানান তিনি।

তিনি জানান, ধান নষ্ট হয়ে লোকসানের পাশাপাশি কাঁধে চেপে বসেছে ঋণের বোঝা। কীভাবে শোধ করবেন, সে চিন্তায় দিশেহারা অবস্থা তার। 

তিনি আরও বলেন, বৃষ্টিতে ধান নষ্ট না হলে এই এক বিঘা জমি থেকেই আমার প্রায় ৬ মাসের চালের ব্যবস্থা হয়ে যেত। এখন যে শ্রমিক দিয়ে ধান কাটাব, তারও উপায় নেই। একজন শ্রমিককে দিনে ১২০০ থেকে ১৩০০ টাকা দিতে হয়। সঙ্গে তিন বেলা খাবার, চা-নাস্তা দিয়ে ১৬০০ টাকার বেশি খরচ হয়ে যায়। দুই মণ ধান বিক্রির টাকা একজন শ্রমিকের পেছনে খরচ কীভাবে করব, বাধ্য হয়ে ধান মাঠেই ফেলে রেখেছি।

কৃষকদের দাবি, কৃষি অফিস থেকে কোনো পূর্বাভাস পাননি তারা। আবহাওয়া খারাপের সংবাদ পেলে আগে ধান কেটে নিরাপদে রাখার সুযোগ পেতেন। সেক্ষেত্রে এত বড় লোকসানে পড়তে হতো না তাদের।

কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, জেলায় এবার ৬৮ হাজার ১৭১ হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ হয়েছে। যেখানে উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয় ২ লাখ ৮০ হাজার মেট্রিক টন। তবে এবার ফলন ভালো হওয়ায় লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে উৎপাদন বেশি হওয়ার আশা ছিল। কিন্তু শিলাবৃষ্টি ও গেল দুদিনের ঝড়-বৃষ্টিতে চাষিদের অনেক ক্ষতি হয়েছে। পানিতে নিমজ্জিত হওয়ায় মোট উৎপাদিত ধানের অন্তত ৫ শতাংশ ঝরে যাবে বলে আশঙ্কা কৃষি বিভাগের।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের বাগেরহাট কার্যালয়ের উপপরিচালক মো. মোতাহার হোসেন বলেন, জেলায় ১৫ হাজার হেক্টরের মতো জমির ধান কর্তন সম্পন্ন হয়েছিল। বাকি ৫৩ হাজার হেক্টরের মতো জমির ধান মাঠে। এর মধ্যে ভারী বৃষ্টি ও ঝড়ো বাতাসে কিছু জমিতে ধান হেলে পড়ছে। অনেক কৃষকের জমিতে কাটা ধান রয়েছে, যা পানিতে তলিয়ে গেছে। এতে মোট উৎপাদনের ৫ শতাংশের মতো ধান ঝরে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে বৃহস্পতিবার বৃষ্টি হয়নি। আশা করছি, মাঠ থেকে পানি সরে যাবে।

প্রাথমিকভাবে ১২ হাজার ১৮৯ মেট্রিক টনের মতো ধান নষ্ট হতে পারে। ধানের দাম ৮০০ টাকা মণ অনুযায়ী এতে ২৪ কোটি ৮৯ লাখ টাকা আর্থিক ক্ষতির হিসাব বিবেচনা করা হচ্ছে। তবে ফলন ভালো হওয়ায় ক্ষতি হলেও উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হবে বলে মনে করেন এই কৃষি কর্মকর্তা। 

আরও পড়ুন

×