‘বসার উপায় নেই, খেতে বাধ্য করেন দোকানিরা’
ময়মনসিংহের জয়নুল আবেদিন পার্কে বেলুন ফায়ার খেলছে এক শিশু সমকাল
নিজস্ব প্রতিবেদক, ময়মনসিংহ
প্রকাশ: ০৩ মে ২০২৬ | ০৭:৫৫
| প্রিন্ট সংস্করণ
চারটি বাঁশের ওপর লোহার ছয়টি আসন পেতে বানানো হয়েছিল নাগরদোলা। প্রতিটি আসনে চারজন দর্শনার্থী বসতে পারে। ছোট বাচ্চাসহ ২৫-৩০ জন আরোহী উঠে বসলেই নাগরদোলা চালানো হয়। দুই-তিনজন অপারেটরের সাহায্যে সম্পূর্ণ হাতের শক্তি ব্যবহার করে চালানো হয়।
গত শুক্রবার সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে প্রায় ৩০ জন আরোহী নিয়ে ভেঙে পড়ে নাগরদোলা।
এতে আহত হয় ৭-৮ জন। তাদের মধ্যে পাঁচজনকে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।
নাগরদোলার পাশের চটপটি দোকানের কর্মচারী বিপ্লব জানান, রাব্বি নামে একজন এই নাগরদোলা পরিচালনা করেন। শুক্রবার ছুটির দিন হওয়ায় পার্কে প্রচণ্ড ভিড় ছিল। নাগরদোলায় আসনের তুলনায় আরোহীর সংখ্যা বেশি থাকায় বাঁশের খুঁটি ভেঙে পড়ে। দুর্ঘটনার পর পালিয়ে যান রাব্বিসহ নাগরদোলার চার-পাঁচজন কর্মচারী।
ময়মনসিংহ নগরীর ব্রহ্মপুত্র নদের তীরে জয়নুল আবেদিন পার্ক চত্বরে ৮-১০টি নাগরদোলা আছে। এসব নাগরদোলা চালানোর জন্য ময়মনসিংহ সিটি করপোরেশন বা অন্য কোনো সংস্থা থেকে অনুমোদন নেওয়া হয়নি। পাশাপাশি ৩০০ গজের মধ্যে বসানো হয়েছে ৬টি নাগরদোলা। দুটি পরিচালনা করেন শরিফ ও মনা নামে দুই ব্যক্তি। মনাকে শনিবার দুপুরে ফোন করলে তিনি জানান, দুর্ঘটনার কারণে সব নাগরদোলা বন্ধ রয়েছে। বিকেলে চালুর চেষ্টা করা হবে। তবে প্রশাসনের তৎপরতার কারণে শনিবার চালু করা না গেলেও রোববার থেকে চলবে।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, জয়নুল আবেদিন পার্কে প্রতিদিন ২০-২৫ হাজার দর্শনার্থী আসে। তবে ছুটির দিনসহ যে কোনো উৎসবে এ সংখ্যা হয় দ্বিগুণ থেকে তিন গুণ। পার্কে অবৈধ নাগরদোলার পাশাপাশি ১০-১২টি অনুমোদনহীন রাইড রয়েছে। যেগুলোতে যে কোনো সময় দুর্ঘটনা ঘটতে পারে।
শনিবার দুপুরে পার্কে গিয়ে দেখা গেছে, গাছের ডালে এবং নদের ধারে বাঁশ দিয়ে ৬-৭টি দোলনা বানানো হয়েছে। এসব দোলনায় আরোহী বসার পর পেছন থেকে ধাক্কা দেয় অপারেটর। নদীর ধারে যেসব দোলনা বসানো হয়েছে, সেগুলোও ঝুঁকিপূর্ণ।
পার্কের ভেতর ভ্রাম্যমাণ বাদাম বিক্রেতা তোতা মিয়া বলেন, দোলনাগুলো চিকন রশি দিয়ে বানানো। ধাক্কা দেওয়ার সময় পড়ে গেলে নদীর তীর থেকে কমপক্ষে ৫০ থেকে ১০০ ফুট দূরে গিয়ে নদীর মাঝে পড়বে আরোহীরা। সাঁতার না জানলে মৃত্যু হতে পারে।
শুক্রবারের দুর্ঘটনার পর বন্ধ রাখা হয় বেলুন ফায়ারের দোকানগুলো। তবে শনিবার বিকেলে ফের চালু করা হয়েছে। পার্কে ঘুরতে আসা দর্শনার্থীরা জানান, পুরো পার্কে ৩-৪টি স্থানে বেলুনের মধ্যে বন্দুক দিয়ে গুলি করা হয়। বেলুনের আশপাশে উৎসুক জনতা ভিড় করে। ইমাম হোসেন নামে একজন জানান, যে কোনো সময় বন্দুকের গুলি লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়ে শরীরে লাগতে পারে।
জয়নুল আবেদিন পার্কে ‘বক্সিং আর্কেড মেশিন’ বা পাঞ্চিং মেশিন জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। ৪-৫টি মেশিন অবৈধভাবে চালানো হচ্ছে বলে জানান স্থানীয়রা। কোনো ধরনের নিরাপত্তা ব্যবস্থা বা পেশাদার তত্ত্বাবধায়ক ছাড়াই এ যন্ত্রের অবাধ ব্যবহার বড় ধরনের দুর্ঘটনার কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে।
গত ৭ এপ্রিল পার্কের সৌন্দর্য বৃদ্ধির লক্ষ্যে উচ্ছেদ অভিযান চালানো হয়। তবে স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রশাসনের অভিযান সত্ত্বেও পার্কের অধিকাংশ জায়গা অবৈধ দোকানের দখলে থাকে।
জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকৌশলী মোস্তাক আহমেদ জানান, চটপটি-ফুচকার দোকানদারদের অত্যাচারে পার্কের কোথাও বসা যায় না। বসতে গেলেই তাদের দোকানে খেতে বাধ্য করা হয়।
সিটি করপোরেশনের সচিব সুমনা আল মজীদ জানান, কিছু দিন পরপর অভিযান চালিয়ে পার্ক থেকে বড় দোলনাগুলো খুলে আনা হয়। কয়েক দিন পরই সেগুলো স্থাপন করা হয়। অবৈধ দোকানপাটের বিরুদ্ধে জেলা প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয় করে দুই-এক দিনের মধ্যে আবারও অভিযান চালানো হবে।
- বিষয় :
- দোকান
