ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

ছোট ফেনী নদীর ভাঙনে বাড়ছে ঘরহারা মানুষ

ছোট ফেনী নদীর ভাঙনে বাড়ছে ঘরহারা মানুষ
×

ভাটার টানে তীর ভাঙছে ছোট ফেনী নদীর। গতকাল রোববার দুপুরে ফেনীর সোনাগাজী উপজেলার সাহেবেরঘাট সংলগ্ন এলাকায়। ছবি: সমকাল

সোনাগাজী (ফেনী) সংবাদদাতা

প্রকাশ: ০৪ মে ২০২৬ | ১১:৫২

নোয়াখালীর কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার মুছাপুর রেগুলেটর ছোট ফেনী নদীর পানির তীব্র চাপে ভেঙে যায় ২০২৪ সালের আগস্টের ভয়াবহ বন্যায়। এতে করে কোম্পানীগঞ্জ ও সোনাগাজী উপজেলায় নদীটির দুই তীরে ভাঙন তীব্র হয়েছে। ইতোমধ্যে ফসলি জমি, ফলের বাগান, রাস্তাঘাট ও কয়েকশ বসতভিটাও বিলীন হয়েছে নদীতে।

নদীভাঙন থেকে তীরবাসীকে রক্ষার দাবিতে গতকাল রোববার সোনাগাজীর দুটি ইউনিয়নের বাসিন্দারা মানববন্ধন করেছেন। উপজেলার চর চান্দিয়া ও চর দরবেশ ইউনিয়নের সীমান্তবর্তী সাহেবের ঘাট সেতু সংলগ্ন এলাকায় এই কর্মসূচি পালিত হয়। ঘণ্টাব্যাপী কর্মসূচিতে বিভিন্ন গ্রামের শত শত নারী-পুরুষ ও শিশুরা অংশ নেন। কয়েকশ মিটার দীর্ঘ মানববন্ধনে ব্যানার ও প্ল্যাকার্ড হাতে দুর্দশার চিত্র তুলে ধরেন এলাকাবাসী। এতে জরুরি ব্যবস্থা গ্রহণের দাবিসহ নানা স্লোগান লেখা ছিল।

মানববন্ধনে বক্তব্য রাখতে গিয়ে ইতালি মার্কেট এলাকার বাসিন্দা সাহেদা খাতুন বলেন, ‘আমার স্বামী নেই। একটি মেয়ে নিয়ে ভিটাতে কোনোমতে দিন কাটাচ্ছি। যদি এই বাড়িটাও নদীতে চলে যায়, তাহলে কোথায় যাব, কোথায় থাকব?’ এই নারীর মাথা গোঁজার শেষ আশ্রয়টুকুও নদীভাঙনের ঝুঁকিতে আছে। তিনি ভাঙন রোধে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য প্রধানমন্ত্রীর সরাসরি হস্তক্ষেপ কামনা করেন।

অন্য বক্তারা বলেন, চর দরবেশ ও চর চান্দিয়া ইউনিয়নের বেশ কয়েকটি গ্রামের শত শত একর ফসলি জমি, ঘরবাড়ি ও বিভিন্ন স্থাপনা ইতোমধ্যে নদীতে বিলীন হয়ে গেছে। আরও অনেক জমি ও ঘরবাড়ি ভাঙনের ঝুঁকিতে পড়েছে। যে কোনো মুহূর্তে এসব নদীতে তলিয়ে যাওয়ার শঙ্কা নিয়েই বসবাস করছেন নদীপারের বাসিন্দারা। 

তারা জানান, ছোট নদীতীরের অন্তত ৪০০ মিটার এলাকা বেশি ঝুঁকিপূর্ণ। ওই অংশে দ্রুত সময়ের মধ্যে জিওব্যাগ ফেলে ভাঙন রোধ করা প্রয়োজেন। এ ছাড়া তারা ড্রেজিংয়ের মাধ্যমে নদীর বাঁকা অংশ সোজা করার দাবি জানান। তাদের দাবি দ্রুত পূরণ করা না হলে চর চান্দিয়া ইউনিয়ন ও চর দরবেশ ইউনিয়নের বেশ কিছু এলাকা চিরতরে বিলীন হয়ে যেতে পারে।

পশ্চিম চর দরবেশ গ্রামের জামাল উদ্দিন বলেন, হঠাৎ ভাঙনের শিকার হয়ে পরিবার নিয়ে আত্মীয়ের বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছেন। তাঁকে অনেক দুর্ভোগের মধ্যে দিন কাটাতে হচ্ছে। কিন্তু এখানে স্থায়ীভাবে ভাঙনরোধে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না। মাত্র দুই মাসের মধ্যে কয়েকশ মানুষ গৃহহারা হয়েছেন। চোখের সামনে বাড়িঘর বিলীন হয়ে যাচ্ছে। তারা কিছুই করতে পারছেন না। 

উত্তর চর সাহাভিকারী গ্রামের বাসিন্দা আমান উল্যাহ বলেন, গ্রামের পশ্চিম পাশ দিয়ে ছোট ফেনী নদী চলে গেছে। ২০২৪ সালের বন্যার পর থেকে নদীতে প্রবল স্রোত বইছে। দু-তিন কিলোমিটার এলাকাজুড়ে ভাঙন চলছে। জোয়ার-ভাটার সময় বাড়ি ও জমির তীর ভেঙে নদীতে আছড়ে পড়ছে। ১০ বছর আগে তাঁর বাড়ি নদীতে চলে যায়। এখন অন্যের জমিতে থাকেন। এ গ্রামেও ভাঙন হচ্ছে। এখনও পর্যন্ত গ্রামের চার ভাগের দুই ভাগ বিলীন হয়ে গেছে। 

কাজীরহাটের বাসিন্দা ছকিনা বেগম বলেন, চোখের সামনে বসতবাড়ি, ফসলি জমিসহ তিল তিল করে গড়ে তোলা স্বপ্ন নদীতে বিলীন হয়ে যাচ্ছে। কীভাবে কী করবেন, কিছুই ভেবে পাচ্ছেন না। সহায়-সম্বল হারিয়ে কোথায় গিয়ে মাথা গোঁজার ঠাঁই করবেন, তা নিয়ে দুশ্চিন্তায় আছেন।

উপজেলার চর দরবেশ ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান আবুল কালাম আজাদ বলেন, তাঁর ইউনিয়নের কয়েকশ পরিবার নদীভাঙনে সব হারিয়েছেন। তাঁর ৪০-৫০ জন আত্মীয় দুই-তিন সপ্তাহের মধ্যে নদীভাঙনের শিকার হয়েছেন। তারা সব হারিয়ে অন্যের বাড়ি, সড়কের পাশে ও বস্তিতে আশ্রয় নিয়েছেন। এত মানুষ সব হারানোর পরও ভাঙনরোধে স্থায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না। এলাকাবাসী বালুভর্তি বস্তা ও বাঁশ-গাছ কেটে নদীতে বাঁধ দিয়ে ঘরবাড়ি রক্ষার চেষ্টা করছেন। কিন্তু কিছুতেই তা টিকছে না। 

মানববন্ধনে আরও অংশ নেন জেলা কৃষক দলের সাধারণ সম্পাদক ও চর চান্দিয়া ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান সামছুদ্দিন খোকন, বিএনপি নেতা সেলিম রেজা, যুবদল নেতা রায়হান সাব্বির, ব্যবসায়ী আবুল কালাম প্রমুখ। 

আরও পড়ুন

×