ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

জমা টাকা ফেরতের দাবি

চট্টগ্রামে আমানতকারীদের বিক্ষোভ, ৫ ব্যাংকে তালা 

আতঙ্কে ব্যাংক কর্মকর্তারা, অতিরিক্ত পুলিশ মেতায়েন

চট্টগ্রামে আমানতকারীদের বিক্ষোভ, ৫ ব্যাংকে তালা 
×

ছবি-সংগৃহীত

চট্টগ্রাম ব্যুরো

প্রকাশ: ০৫ মে ২০২৬ | ০০:৩৩

আমানত ফিরে পেতে টানা দুদিন ধরে চট্টগ্রামে বিক্ষোভ ও ব্যাংক অবরোধ করছেন আমানতকারীরা। গতকাল সোমবার সকাল ১০টার দিকে তারা আগ্রাবাদ এক্সেস সড়কে একত্র হয়ে বিক্ষোভ শুরু করেন। কিছুক্ষণ পর বিক্ষোভ মিছিল নিয়ে তারা প্রথমে যান আগ্রাবাদ বাণিজ্যিক এলাকায় থাকা এক্সিম ব্যাংকে। সেখানে কর্মরত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বের করে দিয়ে তালা মেরে দেয় আন্দোলনকারীরা। পরে একইভাবে তালা মারা হয় ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক ও ইউনিয়ন ব্যাংকের শাখায়। 

তালা মেরে ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারের সামনে গিয়ে অবস্থান নেন আমানতকারীরা। সেখানে মানববন্ধন করেন তারা। একপর্যায়ে শতাধিক আমানতকারী স্লোগান ধরে ‘আমার টাকা ব্যাংকে, আমি কেন রাস্তায়’। অতিরিক্ত পুলিশ এনে পরে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে ব্যাংক কর্তৃপক্ষ। এ সময় বিভিন্ন ব্যাংকের গ্রাহকদের মধ্যে আতঙ্ক দেখা দেয়। অনেকে লেনদেন না করে ব্যাংক থেকে ফিরে যান।
সমগ্র বাংলাদেশ ভুক্তভোগী আমানতকারী অ্যাসোসিয়েশন চট্টগ্রামের ব্যানারে টানা দুই দিন ধরে তালা মারা কর্মসূচি পালন করা হচ্ছে চট্টগ্রামের একীভূত হওয়া ব্যাংকের শাখাগুলোতে। আমানত ফিরে পেতে রোববারও খাতুনগঞ্জের চারটি শাখায় তালা দিয়েছিলেন আমানতকারীরা। গতকাল আগ্রাবাদ বাণিজ্যিক এলাকার ব্যাংকে একই কর্মসূচি পালন করেন তারা। 

ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারের সামনে আয়োজিত সংক্ষিপ্ত এক বিক্ষোভ সমাবেশে বক্তারা তাঁদের আমানতের পূর্ণ নিরাপত্তা ও দ্রুত ফেরতের নিশ্চয়তার দাবি জানান। পাশাপাশি হেয়ার কাট বা মুনাফা কেটে রাখার সিদ্ধান্ত বাতিল, লেনদেন স্বাভাবিক করা এবং গ্রাহকদের হয়রানি বন্ধের আহ্বান জানান তাঁরা।
একীভূত হওয়ার প্রক্রিয়ায় থাকা ব্যাংকগুলো হলো সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক, এক্সিম ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক, ইউনিয়ন ব্যাংক ও ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক। এসব ব্যাংকে প্রায় ৭৫ লাখ আমানতকারীর মোট ১ লাখ ৩১ হাজার কোটি টাকা জমা রয়েছে। 

যা বলছেন আন্দোলনকারীরা
আন্দোলন প্রসঙ্গে সমগ্র বাংলাদেশ ভুক্তভোগী আমানতকারী অ্যাসোসিয়েশন চট্টগ্রামের সভাপতি আবুল কালাম আজাদ বলেন, আমাদের জীবনের সঞ্চয় এই ব্যাংকে রেখেছি নিরাপত্তার জন্য। এখন সেই টাকা তুলতে পথে পথে হাঁটতে হচ্ছে। সামনে কোরবানি, আমাদের পরিবার আছে। কিন্তু একীভূতকরণের নামে আমাদের টাকা আটকে রাখা হচ্ছে। 

ব্যাংকের সামনে কথা হয় সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ আজমের সঙ্গে। তিনি বলেন, আমরা নিয়ম অনুযায়ী সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ে স্মারকলিপি দিয়েছি। এখন শাখায় শাখায় তালা দেওয়ার কর্মসূচি চলছে। সামনে বড় আন্দোলন কর্মসূচি আসবে। এভাবে আমাদের কষ্টের টাকা বেহাত হতে দেব না। 

আমানতকারীদের বক্তব্য
সামিনা আক্তার নামের এক আমানতকারী বলেন, সামনে কোরবানির ঈদ, কিন্তু টাকা নেই। টাকা না পেলে কোরবানি কীভাবে দেব? আমরা গ্রাহক, আমাদের তো কোনো দোষ নেই। বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমোদন নিয়েই তো এসব ব্যাংক শাখা খুলেছে। এদের দায় এখন তাদেরই নিতে হবে।

ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক আগ্রাবাদ শাখার আমানতকারী শারমিন জান্নাত বলেন, অনেক কষ্টে উপার্জন করা টাকা ব্যাংকে রেখে আমরা কোনো অপরাধ করিনি। আমাদের আমানত নিয়ে কেন এই তালবাহানা? আমার টাকা আমি ফেরত নেব, তাতে আবার হেয়ার কাট কিসের? সরকার সমস্যার সমাধান না করে আমাদের রাস্তায় নামতে বাধ্য করেছে।

ব্যবসায়ী নুরুল আমিন বলেন, ‘গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংকে আমার অর্ধকোটি টাকা আটকে আছে। তারা এক টাকাও দিচ্ছে না। ব্যবসা বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে। সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে।’

আতঙ্কে ব্যাংক কর্মকর্তারা
টানা আন্দোলন দেখে আতঙ্কের মুখে আছেন সংশ্লিষ্ট পাঁচ ব্যাংকের কর্মকর্তারা। নাম প্রকাশ না করে সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংকের এক কর্মকর্তা বলেন, আমরা যা করছি তা কর্তৃপক্ষের নির্দেশে করছি। হেয়ারকাট ছাড়া আমানত নবায়ন করা হচ্ছে। সমস্যা সমাধানের চেষ্টা চলছে। 

গ্লোবাল ব্যাংকের আরেক কর্মকর্তা বলেন, আমরা ওপরের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করছি। কিন্তু আমাদের সঙ্গে এসে দুর্বব্যবহার করছে আন্দোলনকারীরা। এখানে আমাদের কী দোষ?

অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন
ব্যাংকে তালা দেওয়ার ঘটনায় বিভিন্ন শাখাতে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। ডবলমুরিং থানার ওসি জামাল উদ্দিন খান বলেন, ব্যাংকগুলোর সামনে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। কেউ যাতে অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটাতে না পারে সেজন্য সতর্ক আছি আমরা। 

গত ১৪ জানুয়ারি কেন্দ্রীয় ব্যাংক একীভূত প্রক্রিয়ায় থাকা পাঁচ ব্যাংকের আমানতে ২০২৪ সালের শুরু থেকে ২০২৫ সালের শেষ পর্যন্ত কোনো মুনাফা না দেওয়ার সিদ্ধান্ত জানায়। এতে আমানতকারীদের মধ্যে উদ্বেগ ও সমালোচনা তৈরি হয়। পরে সেই অবস্থান থেকে সরে এসে নতুন সিদ্ধান্তে ২০২৪ ও ২০২৫ সালের জন্য ব্যক্তিগত ও মেয়াদি আমানতে ৪ শতাংশ মুনাফা নির্ধারণ করা হয়। 

আরও পড়ুন

×