ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

লিবিয়ায় মাফিয়াদের হাতে জিম্মি বরিশালের আসাদুল, ৩০ লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি

লিবিয়ায় মাফিয়াদের হাতে জিম্মি বরিশালের আসাদুল, ৩০ লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি
×

আসাদুল বক্তিয়ার। ছবি: সংগৃহীত

আগৈলঝাড়া (বরিশাল) প্রতিনিধি

প্রকাশ: ০৫ মে ২০২৬ | ১৬:৩১ | আপডেট: ০৫ মে ২০২৬ | ১৬:৫৬

লিবিয়ায় মাফিয়া চক্রের হাতে জিম্মি হয়ে গত দুই মাস ধরে নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন বরিশালের আগৈলঝাড়া উপজেলার আসাদুল বক্তিয়ার নামের এক যুবক।

পরিবারের অভিযোগ, নির্যাতনের রোমহর্ষক ভিডিও পাঠিয়ে তাদের কাছে ৩০ লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করেছে চক্রটি। ইতিমধ্যে ধারদেনা করে ৪ লাখ টাকা দেওয়া হলেও, বাকি টাকা আগামী দুই দিনের মধ্যে না দিলে আসাদুলকে হত্যার পর চার টুকরো করে মরুভূমিতে ফেলে দেওয়ার হুমকি দিচ্ছে মাফিয়ারা। 

আসাদুল উপজেলার চাত্রিশিরা গ্রামের আবু বক্তিয়ারের ছেলে। সংসারে সচ্ছলতা ফেরাতে ২০২২ সালের ১১ অক্টোবর ভিজিট ভিসায় আত্মীয় এরফান সরদারের মাধ্যমে বৈধ পথে তিনি লিবিয়ায় যান। সেখানে আনজারা শহরে মসজিদের পাশে একটি দোকানে টেইলারিংয়ের কাজ করে মাসে ২০-২৫ হাজার টাকা দেশে পাঠাতেন।

পরিবার জানায়, গত ৯ রমজান সেহরি খাওয়ার পর ভোররাতে ৫-৬ জনের একটি মাফিয়া দল তাকে বাসা থেকে জোরপূর্বক তুলে নিয়ে যায়। এরপর তাদের আস্তানায় আটকে রেখে হাত-পা বেঁধে উল্টো করে ঝুলিয়ে ও বিবস্ত্র করে বেদম মারধর করা হয়। চাকু দিয়ে খুঁচিয়ে রক্ত ঝরানো ও হাত-পায়ের নখ উপড়ে ফেলার হুমকি দিয়ে সেই দৃশ্য ভিডিও কলে দেশে থাকা পরিবারকে দেখিয়ে ৩০ লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করা হয়।

লিবিয়ায় থাকা আসাদুলের শ্যালক এরফান সরদার বিষয়টি স্থানীয় দুটি থানায় জানালে মাফিয়ারা ক্ষিপ্ত হয়ে তাকেও খুঁজতে শুরু করে। জীবনের নিরাপত্তাহীনতায় এরফান গত ৩০ মার্চ বাংলাদেশে পালিয়ে আসেন এবং বোন নিপা বেগমকে সঙ্গে নিয়ে প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ে ঘটনার বিবরণ দিয়ে লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন। অভিযোগের বিষয়টি জানতে পেরে মাফিয়ারা আসাদুলের ওপর নির্যাতনের মাত্রা আরও বাড়িয়ে দেয়।

নির্যাতনের মাত্রা সইতে না পেরে ভিডিও কলে আসাদুল তার জীবন বাঁচানোর আকুতি জানান। নিরুপায় হয়ে পরিবার সুদে ৩ লাখ ও শ্বশুরবাড়ি থেকে ১ লাখ টাকা জোগাড় করে রোববার ও সোমবার ব্যাংক ও বিকাশের মাধ্যমে মাফিয়াদের ৪ লাখ টাকা প্রদান করে। কিন্তু মাফিয়ারা জানিয়ে দেয়, দুই দিনের মধ্যে বাকি টাকা না দিলে আসাদুলকে কেটে ৪ টুকরো করে মরুভূমিতে ফেলে দেওয়া হবে।

ছেলের এমন পরিণতিতে দিশেহারা পিতা আবু বক্তিয়ার বলেন, “ফিয়ারা ৩০ লাখ টাকা চায়, দুই মাসে এক টাকাও জোগাড় করতে পারি নাই। ছেলেকে ঝুলিয়ে পিটাচ্ছে, শরীর থেকে রক্ত ঝরছে। সম্পত্তি থাকলে বিক্রি করে টাকা দিতাম। একজন পিতা হয়ে ছেলের এমন করুণ পরিণতি দেখে কীভাবে সইব? সরকার ও প্রশাসনের কাছে দাবি, আমার কলিজার টুকরা বাবারে আইনা দেন।”

আসাদুলের মা বকুল বেগম ও স্ত্রী নিপা বেগমও কান্নায় ভেঙে পড়ে স্বামীকে উদ্ধারের জন্য প্রশাসন ও সরকারের কাছে আকুতি জানিয়েছেন। বাবার ফেরার অপেক্ষায় পথ চেয়ে আছে আসাদুলের দুই ছেলে হামিম ও শামিম। 

মা বকুল বেগম বলেন, “ওরা টাকার জন্য আমার ছেলেকে ঝুলিয়ে পিটাচ্ছে এবং চাকু দিয়ে শরীর থেকে রক্ত ঝরাচ্ছে। আমি তো একজন মা, তা দেখে কীভাবে সহ্য করব? আমাদের সহায়-সম্বল কিছুই নেই। কীভাবে ছেলেকে ছাড়িয়ে আনব? দুই মাসে আমাদের নাওয়া-খাওয়া, ঘুম নেই। কীভাবে বেঁচে আছি, আল্লাহই জানেন।” 

স্ত্রী নিপা বেগম জানান, “বাকি টাকা দুই দিনের মধ্যে না দিলে তাকে মেরে ফেলবে বলে হুমকি দিচ্ছে। স্বামী আমাকে বলে বাঁচাও—এখন আমি কী করব? আমি কীভাবে তাকে বাঁচাব?"

এ ব্যাপারে আগৈলঝাড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা লিখন বনিক বলেন, লিবিয়ায় এক যুবককে অপহরণ করে মুক্তিপণ আদায়ের বিষয়টি মিডিয়া কর্মীর মাধ্যমে আমি জানতে পেরেছি। ওই পরিবার আমার কাছে লিখিতভাবে জানালে ওই কপি আমি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে প্রেরণসহ ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করব।

আরও পড়ুন

×