পরশুরামে ধর্ষণ মামলায় ফাঁসানো হয় ইমামকে
ডিএনএ পরীক্ষায় মিলল সন্তানের পিতৃপরিচয়
ফাইল ছবি
ফেনী প্রতিনিধি
প্রকাশ: ০৭ মে ২০২৬ | ২২:৪৯
অবশেষে ডিএনএ পরীক্ষায় নির্দোষ প্রমাণিত হয়েছেন ফেনীর পরশুরামে কিশোরীকে ধর্ষণের অভিযোগে গ্রেপ্তার মসজিদের ইমাম মোজাফফর আহমদ (২৫)। একই সঙ্গে তদন্ত ও ডিএনএ প্রতিবেদনে বেরিয়ে এসেছে কিশোরীর ভূমিষ্ঠ সন্তানের পিতৃপরিচয়। পরিকল্পিতভাবে ওই ইমামকে ধর্ষণ মামলায় ফাঁসানো হয়েছিল বলে জানিয়েছে পুলিশ।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ফেনীর পরশুরামের বক্সমাহমুদ ইউনিয়নের উত্তর টেটেশ্বর গ্রামের ১৪ বছরের এক কিশোরী অন্তঃসত্ত্বা হয়ে সন্তান প্রসব করলে পরিবারের পক্ষ থেকে স্থানীয় জামে মসজিদের ইমাম মোজাফফরের বিরুদ্ধে ধর্ষণের অভিযোগ আনা হয়।
২০২৪ সালের ২৪ নভেম্বর ওই কিশোরীর মা বাদী হয়ে পরশুরাম মডেল থানায় নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে মামলা করেন। এ অভিযোগ মিথ্যা দাবি করে ওই বছরের ২৬ নভেম্বর মোজাফফর আহমদ ফেনীর আদালতে পাল্টা মামলা করতে গেলে আদালত চত্বর থেকে তাঁকে পুলিশের হাতে তুলে দেওয়া হয়। পরে এক মাস দুই দিন কারাভোগ করে জামিনে মুক্তি পান মোজাফফর।
মামলার তদন্তের অংশ হিসেবে ২০২৪ সালের ২২ ডিসেম্বর অভিযুক্ত মোজাফফর ও কিশোরীর সংরক্ষিত ভ্যাজাইনাল সোয়াব ঢাকার মালিবাগে সিআইডির ফরেনসিক ল্যাবরেটরিতে পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়। ২০২৫ সালের ২১ জানুয়ারি প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়, ভ্যাজাইনাল সোয়াবে পুরুষের বীর্যের উপস্থিতি শনাক্ত হয়নি। ফলে মোজাফফরের ডিএনএর সঙ্গে তুলনামূলক মতামত দেওয়া সম্ভব হয়নি।
এরপর কিশোরী ও তার ভূমিষ্ঠ হওয়া শিশুকন্যার জৈবিক পিতা শনাক্তে নতুন করে ডিএনএ পরীক্ষার আবেদন করে পুলিশ। তদন্ত চলাকালে পুলিশ কিশোরীকে জিজ্ঞাসাবাদ করলে একপর্যায়ে সে স্বীকার করে, তার আপন বড় ভাই (২২) দীর্ঘদিন ধরে তাকে ধর্ষণ করে আসছিল। বিষয়টি আড়াল করতে পরিবারের সদস্যরা স্থানীয় মসজিদের ইমাম মোজাফফরকে ফাঁসানোর চেষ্টা করেন। পরে ২০২৫ সালের ১৯ মে ওই কিশোরীর অভিযুক্ত ভাইকে গ্রেপ্তার করে আদালতে পাঠায় পুলিশ। পরদিন আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দিতে আপন বোনকে ধর্ষণের কথা স্বীকার করেন তিনি।
আদালতের নির্দেশে একই বছরের ৪ আগস্ট কিশোরী, তার শিশুকন্যা এবং বড় ভাইয়ের ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ করে ফরেনসিক পরীক্ষার জন্য ঢাকায় পাঠানো হয়। ৯ আগস্ট প্রকাশিত ডিএনএ প্রতিবেদনে নিশ্চিত করা হয়, কিশোরীর অভিযুক্ত ভাইয়ের সঙ্গে শিশুটির জৈবিক পিতা হিসেবে ৯৯ দশমিক ৯৯ শতাংশ মিল রয়েছে। একই প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, কারাভোগ করা মোজাফফর ওই শিশুর জৈবিক পিতা নন।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ও পরশুরাম মডেল থানা পুলিশের উপপরিদর্শক শরীফ হোসেন অভিযোগপত্রে উল্লেখ করেন, মোজাফফর আহমদের বিরুদ্ধে আনীত ধর্ষণের অভিযোগের সত্যতা পাওয়া যায়নি। ফলে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের মামলা থেকে তাকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে, ওই কিশোরীর ভাইয়ের বিরুদ্ধে একই ধারায় অভিযোগপত্র দাখিল করা হয়। বর্তমানে তিনি ফেনী জেলা কারাগারে রয়েছেন।
এ ব্যাপারে মোজাফফর আহমদ বলেন, আমি সম্পূর্ণ নির্দোষ হয়েও কারাভোগ করেছি। এ ঘটনায় সামাজিকভাবে অপমানিত হয়েছি, মসজিদের ইমামতি ও ইসলামিক ফাউন্ডেশনের চাকরি হারিয়েছি। মামলার খরচ চালাতে বাড়ির পাশে থাকা জমিও বিক্রি করতে হয়েছে।
মোজাফফর আহমেদের আইনজীবী আবদুল আলিম মাকসুদ বলেন, তদন্ত শেষ হওয়ার আগেই কাউকে দোষী আখ্যা দিলে নিরপরাধ মানুষের জীবনে কতটুকু খারাপ পরিণতি হতে পারে এ ঘটনা তারই দৃষ্টান্ত।
পরশুরাম মডেল থানার ওসি মো. আশরাফুল ইসলাম বলেন, ডিএনএ পরীক্ষায় প্রকৃত সত্য সামনে আসার পর ওই ইমামের নাম অভিযোগপত্র থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে।
- বিষয় :
- ডিএনএ টেস্ট
- ফেনী
- কিশোরীকে ধর্ষণ
- ইমাম
