শ্রম বিক্রির হাটেও মজুরি চড়া
নালিতাবাড়ী উপজেলার নাকশী বালুঘাটা বাজারে শ্রম বিক্রির অপেক্ষায় কৃষি শ্রমিক সমকাল
মিজানুর রহমান, নালিতাবাড়ী (শেরপুর)
প্রকাশ: ০৯ মে ২০২৬ | ০৭:৪৯
| প্রিন্ট সংস্করণ
সূর্য ওঠার আগ থেকেই শ্রমজীবী মানুষ ছুটে আসেন হাটে। চোখমুখে তাদের অসহায়ত্বের ছাপ। যাদের শ্রম বিক্রি করে সংসারের প্রয়োজন মেটাতে দরকার কিছু অর্থের। এই হাটে কিছু মানুষ আসেন নিজেদের শ্রম বিক্রি করতে, কিছু মানুষ আসেন শ্রম কিনতে। চলতে থাকে দরদাম, পণ্যের মতোই মৌসুম বিবেচনায় ওঠানামা করে দাম। দরদাম মিটিয়ে শ্রমিকদের সঙ্গে নিয়ে গন্তব্যে রওনা দেন কৃষক।
এই শ্রম বিক্রির হাট বসে নালিতাবাড়ী উপজেলার নাকশী বালুঘাটা বাজারে। ধানকাটা মৌসুমে প্রতিদিন ভোর ৫টা থেকে সাড়ে ৬টা পর্যন্ত চলে এই হাট। স্থানীয়দের কাছে ‘কামলার হাট’ নামে পরিচিত।
বৈশাখের ঝড়বৃষ্টির আশঙ্কায় মাঠে আর ধান রাখা যাচ্ছে না। তাই ধানকাটা শ্রমিকদের চাহিদা বেশি। চড়া দামেই শ্রমিকদের সঙ্গে চুক্তি করছেন কৃষকরা। সব মিলিয়ে জমে উঠেছে মাত্র এক থেকে দেড় ঘণ্টার শ্রম কেনাবেচার হাট।
নাকশী বালুঘাটা শ্রম বিক্রির হাট ঘুরে দেখা গেছে– জামালপুর, শেরপুর ও নালিতাবাড়ী থেকে এই হাটে ধানকাটার শ্রমিক জড়ো হন। প্রতিদিন শত শত শ্রমিকের শ্রম বেচাকেনা হয়ে থাকে। একেকজন শ্রমিকের দাম ওঠে এক হাজার ২০০ থেকে এক হাজার ৩০০ টাকা পর্যন্ত। বেচাকেনার পর চাষির সঙ্গে যান শ্রমিকরা। চাষিরাই শ্রমিকদের থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা করে থাকেন।
চাষিরা জানান, ১০-১২ দিন আগেও শ্রমিকের মজুরি কম ছিল। কিন্তু কয়েকদিন যেতে না যেতেই চড়া দামে শ্রমিক নিতে হচ্ছে। এর কারণ হিসেবে চাষিরা জানান, কয়েক দিনের বৃষ্টিতে ফসলের মাঠে পানি জমেছে। এ অবস্থায় ধান কাটার হারভেস্টারও মাঠে নামছে না। ফলে শ্রমিকরা বাড়তি মজুরি না পেলে কাজ করতে চান না।
শ্রীবরদী এলাকার শ্রমিক শেখ ফরিদ বলেন, ৭ সদস্যের একদল শ্রমিকের সঙ্গে শ্রম বিক্রির হাটে এসেছেন তিনি। সারাদিন গেরস্থের বাড়িতে ধান কাটার কাজ করে সন্ধ্যায় ফিরে আসেন হাটের পাশে একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের বারান্দায়। সেখানে সবাই মিলে রান্নাবান্না করে খেয়ে রাতযাপন করেন।
কাকরকান্দি এলাকা থেকে হাটে এসেছেন কৃষিশ্রমিক শফিকুল ইসলাম। তিনজনের দলে তিনি একজন। হাটের পাশে বালুঘাটা গ্রামে তারা এক গৃহস্থের এক একর জমির ধান কাটা ও বহন করার জন্য চুক্তি করেছেন। একরে পাবেন ২০ হাজার টাকা। তিনজন মিলে এক একর জমির ধান কাটা ও বহন করতে পাঁচ দিন সময় লাগবে। কাজ শেষে তাঁর ভাগে পড়বে ছয় হাজার ৬৬৬ টাকা।
কৃষিশ্রমিক আবু সামার বাড়ি নালিতাবাড়ী উপজেলার বনকুড়া গ্রামে। তিনি বলেন, হাটের পাশেই উত্তর নাকশী এলাকায় এক গৃহস্থের বাড়িতে ১ হাজার ২০০ টাকা দিন হাজিরায় ধান কাটতে যাচ্ছেন। সঙ্গে দুই বেলা খাবার জুটবে।
বাজারে দেখা হয় বকশীগঞ্জ উপজেলার কয়েকজন কৃষি শ্রমিকের সঙ্গে। তাদের একজন সফিক মিয়া। তিনি ৬ জনের দলে এসেছেন হাটে। তাঁর ভাষ্য, প্রতিবছর বোরো মৌসুমে ধান কাটার কাজ করতে আসেন তারা। গড়ে ১৫-২০ দিন কাজ করলে ১৬-১৮ হাজার টাকা পর্যন্ত জমা হয়। সঙ্গে এই কয়েক দিন খাওয়া-দাওয়া নিয়েও দুশ্চিন্তা থাকে না।
কৃষিশ্রমিক রফিজ, সাদ্দাম ও তোরাব আলী জানান, ১০-১২ দিন ধরে ধান কাটার কাজ চলছে। রোদ-বৃষ্টিতে ভিজে কাজ করতে হয়। পরিশ্রম বেশি। সব ধরনের জিনিসপত্রের দাম বেড়েছে। মজুরি কম দিলে পোষায় না। তাদের মতে, সারাবছর তেমন কাজ থাকে না। এই মৌসুমে বাড়তি আয় হলে কিছু দিন ভালোভাবে চলতে পারবেন।
চাষিদের দাবি, প্রতি একর জমির ধান কাটতে ১৮-২০ হাজার টাকায় চুক্তি করছেন শ্রমিকরা। একরপ্রতি ধান উৎপাদন হতে পারে ৭০-৮০ মণ। বাজারে মণপ্রতি ধানের দাম ৭৩০-৯৩০ টাকা।
হাটে কথা হয় কৃষক মনিরুজ্জামান মনিরের সঙ্গে। তিনি জানান, দুই একর জমির ধান কাটা হয়েছে। ৩৬ জন শ্রমিক দিয়ে ধান কাটাতে হয়েছে, যেখানে জনপ্রতি দিনে ১ হাজার ২০০ টাকা করে মজুরি দিতে হয়েছে। তার দাবি, চাষাবাদ করতে ও অতিরিক্ত মজুরির কারণে উৎপাদন খরচ অনেক বেড়ে গেছে। অথচ ধানের দাম কম। প্রকারভেদে প্রতি মণ ধান বিক্রি করতে হচ্ছে ৮৩০ থেকে ৯৩০ টাকা দরে।
দক্ষিণ নাকশী গ্রামের কৃষক আজবাহার বলেন, ‘আমি ১০ একর জমিতে ধানচাষ করেছি। এখন ধান কাটতে দৈনিক আমার ২০ জন শ্রমিক লাগবে। প্রত্যেক শ্রমিক ১ হাজার ২০০ থেকে ১ হাজার ৩০০ টাকা দৈনিক মজুরি দাবি করছেন।’ তাঁর ভাষ্য, জমির ধান কাটতে শুধু মজুরি না, শ্রমিকদের পেছনে আরও বিভিন্ন খরচ রয়েছে।
কৃষি কর্মকর্তার কার্যালয়ের তথ্যমতে, চলতি বোরো মৌসুমে নালিতাবাড়ী উপজেলায় ২৩ হাজার ১৩৫ হেক্টর জমিতে বোরো ধান চাষ হয়েছে। ইতোমধ্যে প্রায় ৩০ শতাংশ ধান কাটা শেষ হয়েছে। এই মৌসুমে শ্রমিকের চাহিদা বেশি থাকায় মজুরি বেড়েছে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
উপজেলার অতিরিক্ত কৃষি কর্মকর্তা রাশিদুজ্জামান ইমরান বলেন, উপজেলায় শ্রমিক সংকট মোকাবিলায় পর্যায়ক্রমে ৫০ ভাগ ভর্তুকিতে ৫২টি কম্বাইন্ড হারভেস্টার বিতরণ করা হয়েছে। প্রাকৃতিক দুর্যোগ এড়াতে কৃষকদের ৮০ ভাগ ধান পাকা হলেই কাটার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। নিরাপদে ফসল ঘরে তুলতে কৃষককে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করা হচ্ছে।
- বিষয় :
- শ্রমবাজার
