নদীর পানি বিক্রি করে চলছে ২০ পরিবারের সংসার
যমুনা নদী থেকে পানি সংগ্রহ করে নিয়ে যাচ্ছেন আমানত আলী। সম্প্রতি পাবনার বেড়া উপজেলার মোহনগঞ্জ ঘাটে সমকাল
জালাল উদ্দিন, সাঁথিয়া (পাবনা)
প্রকাশ: ০৯ মে ২০২৬ | ০৮:০৬
| প্রিন্ট সংস্করণ
শিল্পায়ন ও নগরায়ণের ফলে মানুষের দৈনন্দিন অভ্যাসে পরিবর্তন এলেও পাবনার বেড়া উপজেলায় নদী আজও অনেকের টিকে থাকার প্রধান অবলম্বন। আধুনিক প্রযুক্তির যুগে যখন বাড়িতে বাড়িতে সাবমার্সিবল পাম্প বসছে, তখন যমুনা ও হুরাসাগর নদীর পানি সংগ্রহ ও বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করছেন ২০টি পরিবার। তাদের কাছে নদী কেবল একটি জলরাশি নয়; বরং সন্তানদের পড়াশোনা ও সংসারের ঘানি টানার প্রধান উৎস।
নদী থেকে ড্রামে ভরা পানি যাচ্ছে দোকানে
বেড়া উপজেলার বেড়া বাজার, মোহনগঞ্জ, হাটুরিয়া, নাকালিয়াসহ আশপাশের এলাকায় এই ব্যতিক্রমী চিত্র দেখা যায়। প্রতিদিন ভোরের আলো ফোটার আগেই মোহনগঞ্জ মহল্লার আমানত আলীর মতো পানি বিক্রেতারা যমুনা ও হুরাসাগর নদী থেকে পরিষ্কার পানি সংগ্রহ শুরু করেন। বড় ড্রাম ও প্লাস্টিক পাত্রে সেই পানি ভরে নিজস্ব ভ্যানে করে তারা পৌঁছে দেন বিভিন্ন খাবার হোটেল, মিষ্টির কারখানা, বেকারি, চায়ের দোকান ও ক্ষুদ্র শিল্প-কারখানায়। ২০ থেকে ২৫টি দোকানে প্রতিদিন ৪০ ক্যান বা এক হাজার লিটার পানি সরবরাহ করা হয়। প্রতি ক্যানে ২৫ লিটার পানি থাকে। প্রতি লিটারের দাম এক টাকা। এ ছাড়াও বিয়েবাড়ি বা অন্যান্য অনুষ্ঠানেও পানি সরবরাহ করা হয়।
মোহনগঞ্জ বাজারের চায়ের দোকানি মকবুল হোসেন জানান, এলাকায় নলকূপের পানিতে আয়রন বা লোহার পরিমাণ বেশি থাকায় চায়ের স্বাদ ও রং নষ্ট হয়ে যায়। নদীর পানি ফুটিয়ে ব্যবহার করলে চায়ের গুণগত মান ভালো থাকে। একই কথা বলেন হোটেল মালিকরা। তারা জানান, ভাত রান্না, ডাল সিদ্ধ ও সবজি ধোয়ার জন্য প্রতিদিন তাদের প্রচুর পরিমাণ পানি প্রয়োজন হয়, যা বিক্রেতাদের মাধ্যমে সংগ্রহ করা অনেক সহজ।
মাসিক আয় ২৫ হাজার থেকে ৩০ হাজার টাকা
এই পেশায় যুক্ত রফিকুল ইসলাম জানান, প্রতিদিন সকাল থেকে রাত পর্যন্ত তিনি প্রায় ৮-১০টি দোকানে পানি সরবরাহ করেন। পানি বিক্রেতারা জানান, প্রতিদিন গড়ে ৮০০ থেকে এক হাজার টাকা পর্যন্ত তাদের আয় হয়। মাস শেষে এই আয়ের পরিমাণ দাঁড়ায় ২৫ হাজার থেকে ৩০ হাজার টাকা। এই অর্থ দিয়েই তাদের পরিবারের ভরণপোষণ, চিকিৎসা ও সন্তানদের পড়াশোনার খরচ মেটানো হয়। বিকল্প কাজ না থাকায় অনেক অভাবী মানুষ এই পরিশ্রমসাধ্য পেশাকেই বেছে নিয়েছেন।
স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, নদীর পানি সংরক্ষণ ও প্রাথমিক পরিশোধনের সরকারি ব্যবস্থা থাকলে এই পেশা আরও টেকসই হতে পারত। তবে সরাসরি নদীর পানি ব্যবহারের ক্ষেত্রে স্বাস্থ্যঝুঁকির বিষয়ে সতর্ক করেছেন বিশেষজ্ঞরা।
বেড়া উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. তাহমিনা সুলতানা বলেন, নদীর পানিতে জীবাণু বা রাসায়নিক দূষণ থাকতে পারে, যা থেকে পানিবাহিত রোগ হওয়ার আশঙ্কা থাকে। তবে পানি ফুটিয়ে নিলে তা অনেকটাই নিরাপদ হয়। স্থানীয়দের নিরাপদ পানি ব্যবহারের বিষয়ে সচেতন করার পাশাপাশি পানি ব্যবস্থাপনায় সরকারি নিয়ম মানা জরুরি বলে তিনি উল্লেখ করেন।
- বিষয় :
- পানি
