জন্মোৎসব
সংগীতের মানিকজোড়
রমেশ শীল ও বিনয় বাঁশি সংগৃহীত
তৌফিকুল ইসলাম বাবর ও শাহীনুর কিবরিয়া মাসুদ, চট্টগ্রাম
প্রকাশ: ১২ মে ২০২৬ | ০৮:৪৮
| প্রিন্ট সংস্করণ
একজন বঙ্গসেরা কবিয়াল, আরেকজন ঢোলের জাদুকর। তারা সহপাঠী, একসঙ্গে দলে গান-বাজনা করতেন। একই গ্রামের এই দুই কিংবদন্তি পেয়েছেন রাষ্ট্রীয় মর্যাদাপূর্ণ একুশে পদকও। তাদের একজন কবিয়াল রমেশ শীল। যিনি কবিগানের পাশাপাশি মরমি ও মাইজভাণ্ডারী গানকে নিয়ে গেছেন অনন্য এক মাত্রায়। অন্যজন ঢোলবাদক বিনয় বাঁশি জলদাস। যিনি ঢোল বাজিয়ে সুনাম কুড়িয়েছেন দেশ-বিদেশে। ঢোল প্রধান বাদ্যযন্ত্র হলেও তিনি তবলা, ঢাক, খোল, সানাই, বেহালা, দোতারা, করতাল, মৃদঙ্গ, ডগর, হারমোনিয়াম, বাঁশিসহ দেশীয় বিভিন্ন বাদ্যযন্ত্রেও সমান পারদর্শী ছিলেন। ৩৫ বছর রমেশ শীলের গানে ঢোল বাজিয়েছেন বিনয়।
গত শনিবার ছিল রমেশ শীলের ১৫০তম জন্মদিন। দিনটি উপলক্ষে চট্টগ্রামের বোয়ালখালীতে অনুষ্ঠিত দুই দিনব্যাপী জন্মোৎসব রোববার শেষ হয়। বোয়ালখালী উপজেলার পূর্ব গোমদণ্ডী গ্রামের একপাশে রমেশ শীলের বাড়ি এবং আরেকপাশে বিনয় বাঁশির। রমেশ শীলের জন্মোৎসবে স্থানীয় লোকজনের পাশাপাশি আনাগোনা ছিল দেশের নানা প্রান্ত থেকে আসা ভক্তের।
‘ইস্কুল খুইলাছেরে মওলা ইস্কুল খুইলাছে, গাউসুল আজম মাইজভাণ্ডারী ইস্কুল খুইলাছে’– রমেশ শীলের এই গানটি চট্টগ্রামের গণ্ডি পেরিয়ে সারাদেশে এখনও তুমুল জনপ্রিয়। এমন অনেক আধ্যাত্মিক গান লিখে দরাজ গলায় গেয়েছেন তিনি। ২০০২ সালে একুশে পদক (মরণোত্তর) পান রমেশ শীল। ১৯৬৭ সালের ৬ এপ্রিল ৯০ বছর বয়সে চিরবিদায় নেন তিনি। ১৯৪৮ সালে কলকাতার শ্রদ্ধানন্দ পার্কে তাঁকে ‘বঙ্গের শ্রেষ্ঠ কবিয়াল’ উপাধি দেওয়া হয়েছিল বলে জানিয়েছেন তাঁর নাতি কাজল শীল।
কবিয়ালের জীবন ও কর্ম নিয়ে জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক মুস্তফা নঈম বলেন, কবিয়াল রমেশ শীল শুধু গান করেননি, লিখেছেন সহস্রাধিক গানও। মাইজভাণ্ডারী গানের জনকও বলা হয় তাঁকে। দরদি গলা ও সুরে কবিগান, পালাগান, মরমি গানকে অন্য মাত্রায় নিয়ে গেছেন তিনি। মাইজভাণ্ডারের ভক্ত-অনুরাগীরা তাঁকে রমেশ মাইজভাণ্ডারী বলেও ডাকতেন।
জন্মোৎসবে অংশ নেন বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার বিশিষ্টজন। ময়মনসিংহ থেকে উৎসবে যোগ দেওয়া হরিহরণ দাস বলেন, রমেশ শীলের গানের পরতে পরতে মানবতা, সাম্য ও অসাম্প্রদায়িকতার পাশাপাশি দ্রোহ ও মুক্তির চেতনা উঠে এসেছে। তাঁর গান শুনে বড় হয়েছি। এমন সাধকের সমাধি এসে তার আধ্যাত্মিক সান্নিধ্য নিতে ছুটে এসেছি।
কবিয়াল রমেশের কথা এলেই অবধারিতভাবে আসে ঢোলবাদক বিনয় বাঁশি জলদাসের নামও। ঢোলে সুর তোলার খেলায় মেতে ওঠা ছিল যেন এই ঢোল জাদুকরের নেশা। শৈশব-কৈশোর থেকে ঢোলের সঙ্গেই গড়ে ওঠে তাঁর মিতালি। দুই হাতের আঙুল ছিল যেন জাদুরকাঠি। গ্রামীণ ঐতিহ্য আর লোকসংস্কৃতির ধারক-বাহক এই ঢোলেরই বরপুত্র হয়ে ওঠেন তিনি। যে অনুষ্ঠানে রমেশকে ‘বঙ্গসেরা’ কবিয়াল ঘোষণা করা হয়, সেই অনুষ্ঠানেও ঢোল বাজিয়ে দর্শকদের মুগ্ধ করেছিলেন বিনয় বাঁশি। ১৯১১ সালের ১ অক্টোবর জন্ম নেওয়া এই ঢোলবাদক ২০০২ সালের ৫ এপ্রিল মৃত্যুবরণ করেন। ২০০১ সালে পান একুশে পদক।
বিনয় বাঁশির নাতি বিধান দাস বলেন, মানুষ আধুনিক বাদ্যযন্ত্রে ধাবিত হওয়ায় পূজা-পার্বণ, ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে ঢোলের চাহিদা দিন দিন কমে যাচ্ছে।
- বিষয় :
- দিবস
