আড়াই বছরের শিশুসহ মা কারাগারে, ফটকে দাঁড়িয়ে ছিল আরও দুই সন্তান
ছবি: সংগৃহীত
লক্ষীপুর প্রতিনিধি
প্রকাশ: ১২ মে ২০২৬ | ১৬:৪০ | আপডেট: ১২ মে ২০২৬ | ২০:১৪
লক্ষ্মীপুরে আড়াই বছরের এক শিশুকে নিয়ে মাকে কারাগারে যেতে হয়েছে। ফারহানা আক্তার শিল্পী নামের ওই নারীকে মারামারি মামলায় কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দিয়েছেন আদালত।
ওই নারীকে কারাগারে নেওয়ার সময় জেল গেটের বাইরে স্কুলড্রেস পরে দাঁড়িয়ে মায়ের অপেক্ষায় ছিল আরও দুই শিশু সন্তান। মাকে কারাগারে যেতে হচ্ছে শুনে স্বজনরা দুই শিশুকে জেল গেটে নিয়ে আসেন। ছোট্ট শিশুটি মায়ের কোল ছাড়েনি, আর বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা দুই সন্তান বুঝতেই পারছিল না—কেন তাদের মা হঠাৎ করে লোহার গেটের ওপারে চলে গেলেন।
সোমবার বিকেলে লক্ষ্মীপুর জেলা কারাগারের সামনে এমন দৃশ্যের দেখা মিলেছে।
আদালত সূত্রে জানা যায়, একটি মারামারি মামলায় ফারহানা আক্তার শিল্পী ও জহির উদ্দিন নামে দুই ব্যক্তিকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন বিচারক। পরে শিল্পীকে তাঁর আড়াই বছরের শিশু সন্তানসহ কারাগারে নেওয়া হয়।
মামলার এজাহার সূত্রে জানা যায়, মামলার বাদী মাহাতাব উদ্দিন ভূঁইয়া। তিনি লক্ষ্মীপুর পৌরসভার ১ নম্বর ওয়ার্ডের সাহাপুর এলাকার মৃত ছিদ্দিক উল্যাহ ভূঁইয়ার ছেলে। গত ১৫ এপ্রিল তাঁর ওপর হামলার অভিযোগ এনে তিনি অতিরিক্ত চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আমলি সদর আদালতে একটি মামলা দায়ের করেন।
মামলার এজাহারে আরও উল্লেখ করা হয়, অভিযুক্ত শিল্পী রড দিয়ে বাদীর মাথার পেছনে আঘাত করেন। এতে বাদীর মাথার হাড় ভেঙে গুরুতর জখম হয় এবং মাথা থেকে রক্তক্ষরণের ঘটনা ঘটে বলে অভিযোগে বলা হয়েছে।
মামলায় প্রতিবেশী ফারহানা আক্তার শিল্পীসহ মোট ১০ জনের নাম উল্লেখ করা হয় এবং আরও ৫ জন অজ্ঞাতনামাকে আসামি করা হয়। শিল্পী লক্ষ্মীপুর পৌরসভার সাহাপুর এলাকার ইসমাইল হোসেনের স্ত্রী।
এ বিষয়ে আইনজীবী মহসিন কবির স্বপন জানান, শিশু সন্তানসহ ফারহানা আক্তার শিল্পী বর্তমানে কারাগারে রয়েছেন। তাঁর অন্য দুই শিশু সন্তানের পরীক্ষা চলমান থাকায় বিষয়টি আরও মানবিক উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে।
আসামিপক্ষের আরেক আইনজীবী রাকিবুল হাসান তামিম বলেন, ‘এজহারে উল্লেখ করা হয়েছে শিল্পী লোহার রড দিয়ে বাদীর মাথায় আঘাত করেন, এতে বাদীর মাথা ফেটে মগজ বের হয়ে যায় বলে অভিযোগ রয়েছে। তবে আদালতে জমা দেওয়া মেডিকেল সার্টিফিকেটে চিকিৎসকরা সাধারণ জখম উল্লেখ করেছেন।’ এ কারণে ঘটনাটি জামিনযোগ্য হলেও আদালত শিল্পীসহ দুইজনকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন।
ফারহানা আক্তার শিল্পীর স্বজনরা জানান, তিনি একজন গৃহিণী এবং পরিবারের প্রধান দায়িত্ব তার কাঁধেই ছিল। আড়াই বছরের শিশু বাদেও তার আরও দুইজন স্কুলপড়ুয়া সন্তান রয়েছে, যারা মায়ের অনুপস্থিতিতে চরম মানসিক কষ্টে দিনযাপন করছে।
স্বজনদের দাবি, এটি শুধু একটি আইনি বিষয় নয়, বরং একটি মানবিক বিষয়ও। শিশুদের ভবিষ্যৎ, মানসিক অবস্থা এবং পারিবারিক সংকট বিবেচনায় আদালতের কাছে তারা জামিনের আবেদন জানিয়েছেন। তারা বলেন, একজন মাকে দীর্ঘদিন কারাগারে রাখলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে তার সন্তানরা।
মামলার বাদী মাহাতাব উদ্দিন ভূঁইয়া জানান, প্রতিবেশী ফারহানা আক্তার শিল্পীর সঙ্গে তাদের দীর্ঘদিন ধরে জমিজমা সংক্রান্ত বিরোধ চলে আসছিল। সেই বিরোধের জের ধরে পরিকল্পিতভাবে তার পরিবারকে বিভিন্ন সময় হয়রানি ও হামলার শিকার হতে হয়েছে। তিনি অভিযোগ করেন, এক ঘটনায় তার মায়ের পা ভেঙে দেওয়া হয় এবং তার ছোট ভাইয়ের মাথায় রড দিয়ে আঘাত করে থেঁতলে দেওয়া হয়। তাকেও মারধর করে গুরুতর আহত করা হয়। এসব ঘটনায় তাদের পরিবার চরম আতঙ্ক ও দুর্ভোগের মধ্যে দিন কাটাচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, এখন ঘটনার প্রকৃত দিক আড়াল করে মানবিকতার বিষয় সামনে এনে সহানুভূতি আদায়ের চেষ্টা করা হচ্ছে। তার দাবি, ফারহানা আক্তার শিল্পী নিজের ছোট সন্তানদের বিষয়টি সামনে এনে মানুষের সহানুভূতি পাওয়ার জন্য পরিকল্পিতভাবে নাটক করছেন। এমনকি দুই শিশুকে স্কুলের পোশাক পরিয়ে কারাগারের সামনে নিয়ে গিয়ে বিষয়টিকে ভিন্নভাবে উপস্থাপনের চেষ্টা করা হয়েছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
মাহাতাব উদ্দিন ভূঁইয়া আরও বলেন, আমাদের পরিবারের ওপর যে নির্যাতন হয়েছে, সেটি আড়াল করে এখন আইনের ফাঁক গলে বের হওয়ার চেষ্টা চলছে। মানবিক বিবেচনার কথা বলে মূল ঘটনাকে ভিন্ন খাতে নেওয়া হচ্ছে। আমরা চাই, প্রকৃত ঘটনা তদন্ত করে দোষীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হোক এবং কেউ যেন ‘নাটক’ করে আইনের সুযোগ নিতে না পারে।
এদিকে বিষয়টি নিশ্চিত করে লক্ষ্মীপুর জেলা কারাগারের ভারপ্রাপ্ত জেলার নুর মোহাম্মদ সোহেল জানান, আড়াই বছরের শিশুকে সঙ্গে নিয়েই তাঁর মা শিল্পীকে বিকেলে কারাগারে আনা হয়েছে।
- বিষয় :
- লক্ষ্মীপুর
- শিশু
- কারাগার
