আইল দেখাল বড় আয়ের পথ
প্রতি মৌসুমে ধানি জমির পাশে ছোট পরিসরে মিষ্টিকুমড়া আবাদ করেন বরিশালের আগৈলঝাড়া উপজেলার বাহাদুরপুর গ্রামের কৃষকরা -সমকাল
কেএম আজাদ রহমান, আগৈলঝাড়া (বরিশাল)
প্রকাশ: ১৫ মে ২০২৬ | ০৮:৪৯ | আপডেট: ১৫ মে ২০২৬ | ১১:২৯
| প্রিন্ট সংস্করণ
দুই দশক আগের কথা। এক মৌসুমে বোরো ধান রোপণের জন্য জমি প্রস্তুত করছিলেন গোবিন্দ হালদার। এই কৃষক লক্ষ্য করলেন, তিনি আগাছা জড়ো করে আইলের (দুই জমির মাঝখানের জায়গা) ওপর রাখেন। এভাবে প্রতি মৌসুমে আইল বড় হচ্ছে; কমছে আবাদি জমি। এখানে বিকল্প ফসল হিসেবে কী করা যায়, তা ভাবতে ভাবতে তাঁর মাথায় একটা উপায় এলো। তিনি হাট থেকে মিষ্টিকুমড়ার এক প্যাকেট বীজ কিনে আইলের ওপর বুনে দিলেন। আলাদা করে তেমন যত্ন করা লাগল না। তবে ফলন বেশ ভালো হলো। তিন মাস পর প্রায় ৫০ হাজার টাকার মিষ্টিকুমড়া বিক্রি করলেন গোবিন্দ।
প্রথম চাষেই ব্যাপক লাভ হওয়ায় পরের বছর থেকে আইলের ওপর দেশি মিষ্টিকুমড়া আবাদ করতে থাকলেন বরিশালের আগৈলঝাড়া উপজেলার বাহাদুরপুর গ্রামের এই কৃষক। তাঁর দেখাদেখি গ্রামের আরও কয়েকজন আইলের ওপর এই সবজি আবাদ শুরু করলেন। এভাবে ধান চাষের পাশাপাশি মিষ্টিকুমড়ার জন্য আইল বড় করে এক টুকরোর মতো জমি রাখতে থাকলেন বাহাদুরপুরের কৃষকরা। কয়েক বছর ধরে প্রতি মৌসুমে তারা প্রায় কোটি টাকার মিষ্টিকুমড়া বিক্রি করছেন। তাদের দেখাদেখি আশপাশের গ্রামেও ধানের জমির পাশে এই সবজি আবাদ হচ্ছে।
এক গ্রামেই দুই হাজার চাষি
বাহাদুর গ্রামে প্রায় হাজার পরিবার কৃষির ওপর নির্ভরশীল। এসব পরিবারে অন্তত দুই হাজার কৃষক আছেন। যারা প্রত্যেকে ধানের জমির পাশে এক টুকরো জমিতে মিষ্টিকুমড়া আবাদ করেন। কৃষকরা বোরো ধান রোপণের আগে আশ্বিন-কার্তিক-অগ্রহায়ণ মাসে জমি প্রস্তুত করেন। এ সময় আইলে মিষ্টিকুমড়া বীজ বপন করেন তারা।
তিন (ফাল্গুন, চৈত্র ও বৈশাখ) চলে বেচাকেনা। বাহাদুর গ্রামের অন্তত দুই হাজার চাষি এভাবে মিষ্টিকুমড়া চাষ করছেন। এই সবজি আবাদে আলাদা করে সার খরচ লাগে না। যত্নেরও প্রয়োজন হয় না তেমন। বাহাদুরপুর ও আশপাশের গ্রামের প্রত্যেক চাষি প্রতি মৌসুমে মিষ্টিকুমড়া বিক্রি করে লক্ষাধিক টাকা আয় করেন। তাছাড়া, কুমড়ার ডগা শাক হিসেবে বিক্রি করেও বাড়তি আয় করেন তারা।
সরেজমিন দেখা যায়, আগৈলঝাড়া উপজেলার রাজিহার ইউনিয়নের বাহাদুরপুর গ্রামের প্রতিটি ধানি জমির পাশে আলাদা করে কিছু জমি রাখা। সেখানে চাষ করা হয়েছে মিষ্টিকুমড়া। যদিও এখন এই সবজির মৌসুম শেষ। তবে কয়েকটি জমিতে কৃষকদের মিষ্টিকুমড়া তুলতে দেখা যায়।
তাদের একজন গোবিন্দ হালদার জানান, ২০০৬ সালে কিছু মিষ্টিকুমড়ার বীজ কিনে জমির আইলে বপন করেন। তিন মাস পরে ফলন ভালো হওয়ায় ৫০ হাজার টাকার মিষ্টিকুমড়া বিক্রি করেন। এর পরের বছর থেকে মিষ্টিকুমড়ার বীজ বপনের জমির পরিমাণ বাড়িয়ে দেন।
চাষিরা যা বলছেন
গোবিন্দ হালদারের দেখাদেখি একে একে বাহাদুরপুরের সহস্রাধিক কৃষক পরিবার মিষ্টিকুমড়া চাষ শুরু করে। গ্রামবাসী জানান, সবাই কোনো না কোনো জমিতে মিষ্টিকুমড়ার চাষ করছেন। এমন কোনো পরিবার খুঁজে পাওয়া যাবে না, যারা কমবেশি মিষ্টিকুমড়ার আবাদ করে না। ঘেরের পাড়, বাড়ির উঠান, বাড়ির পরিত্যক্ত আঙিনা ও চলাচলের রাস্তার পাশেও চাষ হচ্ছে এই সবজি।
প্রবীণ কৃষক সুরেন্দ্রনাথ ভদ্র বলেন, ‘আমি এক হাজার ৭০০ টাকা খরচ করে চলতি মৌসুমে এক লাখ টাকার বেশি মিষ্টিকুমড়া হাটে বিক্রি করেছি।’ একই গ্রামের স্বপন ঘটক জানান, অল্প জমিতে কম খরচে অধিক লাভবান হওয়ায় আশপাশের গ্রামের কৃষকরাও মিষ্টিকুমড়া চাষে আগ্রহী হয়ে পড়ছেন।
নারীরাও এই ফসল আবাদ করছেন। তাদের একজন রিতা হালদার। তিনি বলেন, ‘১৮ বছর আগে বাহাদুরপুর গ্রামে আমার বিয়ে হয়। বিয়ের পর থেকে প্রতিবছর স্বামীকে নিয়ে কুমড়া চাষ করে সংসারে সচ্ছলতা এনেছি।’
রাজিহার ইউনিয়নের ৬ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য (বাহাদুরপুর) রণজিৎ ভক্ত বলেন, এই ওয়ার্ডে সহস্রাধিক পরিবার রয়েছে। তারা সবাই মিষ্টিকুমড়া চাষি। এর মধ্যে আমি নিজেও একজন। শুরুটা এ গ্রাম থেকে হলেও এটি পর্যায়ক্রমে আশপাশের আট থেকে ১০টি গ্রামে ছড়িয়ে পড়েছে।
তিন মাসে চাষে দুই কোটি টাকা আয়
দেশি মিষ্টিকুমড়া বীজ দিয়ে বপন শুরু করেন বাহাদুরপুরের কৃষকরা। তবে বর্তমানে ব্যাংকক-১ জাতের হাইব্রিড বীজ বপন করছেন। তারা কার্তিক মাসের দিকে বীজ বোনেন। বিক্রি শুরু হয় ফাল্গুন মাসের দিকে। প্রতিটি মিষ্টিকুমড়ার ওজন পাঁচ থেকে ২০ কেজি পর্যন্ত হয়ে থাকে। ওই এলাকায় পাইকারি বিক্রির কোনো মোকাম নেই। তাই উত্তর বাহাদুরপুর মাধ্যমিক বিদ্যালয় মাঠে প্রতি বৃহস্পতিবার ও দক্ষিণ বাহাদুরপুর হাটে সোমবার এবং পাশের পীড়ারবাড়ি হাটে প্রতি সপ্তাহে শুক্র ও মঙ্গলবার মিষ্টিকুমড়ার পাইকারি বেচাকেনা চলে।
ক্রেতা-বিক্রেতা ও স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বছরের তিন মাস (ফাল্গুন, চৈত্র, বৈশাখ) প্রতি হাটে ২০০ থেকে আড়াইশ মণ মিষ্টিকুমড়া বেচাকেনা হয়। সপ্তাহে বাহাদুরপুর ও পীড়ারবাড়িতে প্রতি হাটে যদি ২০০ মণ হিসাব করা হয়, তাহলে চার হাটে বিক্রির পরিমাণ দাঁড়ায় এক হাজার ৬০০ মণ এবং মাসে ছয় হাজার ৪০০ মণ। এই হিসাবে তিন মাসে বিক্রি হয় গড়ে প্রায় ১৯ হাজার ২০০ মণ। এক হাজার টাকা মণ দর ধরে এই কুমড়ার দাম দাঁড়ায় এক কোটি ৯২ লাখ টাকা।
মিষ্টিকুমড়ার হাটে পাইকারি কুমড়া কিনে আগৈলঝাড়া উপজেলা সদর, গৈলা বাজার, পয়সার হাট, গৌরনদী উপজেলা, টরকি বন্দর, মাহিলারা বাজার, ভূরঘাটা বাজার, কালকিনি উপজেলা, মাদারীপুরসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে বিক্রি করে আসছেন কমপক্ষে ১০ জন। চাষিদের বাড়ি বাড়ি গিয়েও কিনে থাকেন তারা।
বাহাদুরপুর বাজারের সভাপতি সুভাষ চন্দ্র ভক্ত বলেন, বাজারে জায়গা কম থাকায় পাশেই স্কুল মাঠে মৌসুমে প্রতি হাটে ২০০-৩০০ মণ মিষ্টিকুমড়া বিক্রি হয়। দূরদূরান্ত থেকে পাইকার আসেন।
মিলছে পরামর্শ
আগৈলঝাড়া উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ মো. ইছা বলেন, মিষ্টিকুমড়ায় ভিটামিন এ, সি, ই রয়েছে। বাহাদুরপুরসহ আগৈলঝাড়া উপজেলায় আট হেক্টর জমিতে এই সবজি চাষ হচ্ছে। আমাদের উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তারা নিয়মিত মাঠে দেখাশোনা করে চাষিদের পরামর্শ দিয়ে আসছেন।
বাংলাদেশ কৃষক ঐক্য ফাউন্ডেশনের কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি শাহাবুদ্দিন ফরাজি বলেন, আমাদের সংগঠনের পক্ষ থেকে সরেজমিন ওই এলাকায় কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে তাদের উন্নত জাতের কুমড়া বীজ দেওয়া হবে। জমি ব্যবহার না করে (জমির আইলে) কুমড়া ফলানো পদ্ধতি সারাদেশে কৃষকদের মাঝে ছড়িয়ে দিতে হবে।
- বিষয় :
- কৃষি
