ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

৩৬ কোটি টাকার প্রকল্প এখন মৃত্যুফাঁদ

৩৬ কোটি টাকার প্রকল্প এখন মৃত্যুফাঁদ
×

কুষ্টিয়ার কুমারখালী পৌর শহরের প্রবেশমুখেই সড়ক কেটে চলছে নালা নির্মাণ। এতে ঝুঁকিতে পড়েছে দোকানপাট। বৃহস্পতিবার তোলা সমকাল

কুমারখালী (কুষ্টিয়া) প্রতিনিধি

প্রকাশ: ১৬ মে ২০২৬ | ০৮:০৭

| প্রিন্ট সংস্করণ

৩৬ কোটি টাকার ড্রেন ও সড়ক নির্মাণ প্রকল্প। উদ্দেশ্য ছিল জলাবদ্ধতা নিরসন আর নাগরিক সুবিধা বাড়ানো। কিন্তু কুষ্টিয়ার কুমারখালী পৌরসভায় সেই উন্নয়ন প্রকল্পই এখন মানুষের আতঙ্কের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। খোঁড়া ড্রেন, ভাঙা সড়ক আর নিরাপত্তাহীন নির্মাণকাজে বাড়ছে দুর্ঘটনা। নিরাপত্তাব্যবস্থা ছাড়াই ফেলে রাখা নির্মাণাধীন ড্রেনে পড়ে সম্প্রতি প্রাণ গেছে ছয় বছরের শিশু ইফাদের।
স্থানীয়দের অভিযোগ, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের গাফিলতি, পৌরসভার জনবল সংকট, কর্তৃপক্ষের দুর্বল তদারকিতে বছরের পর বছর ধরে ঝুলে আছে উন্নয়নকাজ। এতে চরম দুর্ভোগে পড়েছেন পৌরবাসী। 
 পৌর কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের আইইউজিআইপি প্রকল্পের আওতায় ২০২৩-২৪ ও ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ধাপে ধাপে ড্রেন ও সড়ক নির্মাণের কাজ শুরু হয়। এর মধ্যে প্রায় ৩৬ কোটি টাকা ব্যয়ে চারটি প্রকল্প বর্তমানে চলমান। কিন্তু অধিকাংশ কাজই নির্ধারিত সময়ে শেষ হয়নি। কয়েক দফা মেয়াদ বাড়িয়েও কাজের অগ্রগতি সন্তোষজনক নয়।

২০২৪-২৫ অর্থবছরে ঢাকার মেসার্স নূর কনস্ট্রাকশন পায় ৫ নম্বর প্রকল্পের কাজ। এর আওতায় ৩ নম্বর ওয়ার্ডে আইনজীবী কাজলের বাড়ি থেকে মাথাভাঙা মন্দির এবং হারুন মিয়ার বাড়ি থেকে গড়াই নদী পর্যন্ত এক হাজার ৬৭ মিটার ড্রেন নির্মাণে ব্যয় ধরা হয় প্রায় তিন কোটি ৮৬ লাখ টাকা। চুক্তি অনুযায়ী গত ২৫ মার্চ কাজ শেষ হওয়ার কথা থাকলেও এখন পর্যন্ত অগ্রগতি মাত্র ৪ শতাংশ। একই সময়ে ৬ ও ৭ নম্বর ওয়ার্ডে আরও দুটি ড্রেন নির্মাণের কাজ শুরুই হয়নি। এ দুটি প্রকল্পের ব্যয় প্রায় দুই কোটি ৩২ লাখ টাকা।

এ ছাড়া ৪ নম্বর ওয়ার্ডের গণমোড় থেকে দেলোয়ার মোড় পর্যন্ত প্রায় দেড় কোটি টাকার সড়ক নির্মাণকাজও শুরু হয়নি। অপরদিকে, ৩ নম্বর ওয়ার্ডে এম এন স্কুল থেকে পাবলিক লাইব্রেরি পর্যন্ত সড়ক নির্মাণের অগ্রগতি প্রায় ৬০ শতাংশে আটকে আছে। গত সোমবার নির্মাণাধীন ড্রেনে পড়ে মারা যায় ছয় বছরের শিশু ইফাদ। 
গত বুধবার সকালে এম এন পাইলট মডেল মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সামনের এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, রাস্তার পাশে বড় বড় গর্ত খুঁড়ে ফেলে রাখা হয়েছে। কোথাও রড বের হয়ে আছে, কোথাও জমে আছে নোংরা পানি। নেই কোনো সুরক্ষা বেষ্টনী বা সতর্কতামূলক চিহ্ন।  শিশুটির মামা স্বাধীন হোসেন বলেন, ‘সময়ে কাজ শেষ হলে ইফাদের মৃত্যু হতো না। এই মৃত্যুর দায় ঠিকাদার ও পৌর কর্তৃপক্ষ এড়াতে পারে না।

এলংগী এলাকার ব্যবসায়ী কুরমান আলী বলেন, ‘ড্রেনের নামে রাস্তা কেটে রেখে গেছে। গাড়ি উল্টে পড়ে মানুষ আহত হচ্ছে। ঘরবাড়ি ভেঙে যাচ্ছে। কিছু বললে ঠিকাদারের লোকজন উল্টো ধমক দেয়।’ সমীর কুমার মিত্র নামে এক বাসিন্দা জানান, ভেকু দিয়ে নালা কাটার কারণে তাঁর বাড়ির দেয়াল ও পাশের দোকান ভেঙে পড়েছে। এ ঘটনায় তিনি ইউএনওর কাছে লিখিত অভিযোগও দিয়েছেন।
২০২৩-২৪ অর্থবছরের প্রথম ও দ্বিতীয় প্রকল্পের কাজ পায় মাদারীপুরের কিংডম বিল্ডার্স ও নূরজাহান রিসোর্স ইন্টারন্যাশনাল (জেভি)। সংশ্লিষ্টদের দাবি, সাবেক মেয়র ও উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সামছুজ্জামান অরুণের ঘনিষ্ঠ আত্মীয় ছিলেন ওই ঠিকাদার। সরকার পতনের পর ঠিকাদারের লোকজন এলাকা ছেড়ে চলে গেলে স্থানীয় ঠিকাদার লিটন আলী কাজের দায়িত্ব নেন। কিন্তু কয়েক দফা মেয়াদ বাড়িয়েও প্রকল্প শেষ হয়নি। তৃতীয় প্রকল্পের কাজ পায় ঢাকার সিএসআই-প্রিভিলিয়েন্ট জেভি। এই প্রকল্পেরও কাজ নির্ধারিত সময়ে শেষ হয়নি। বর্তমানে চারটি প্রকল্পের গড় অগ্রগতি প্রায় ৭০ শতাংশ বলে দাবি পৌর কর্তৃপক্ষের।
কুমারখালী দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটির সাধারণ সম্পাদক হাবীব চৌহান বলেন, ‘সঠিক তদারকির অভাবে কাজে ব্যাপক অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনা হয়েছে। তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।’
ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি স্বপন শেখ বলেন, ‘অভ্যন্তরীণ জটিলতা, রাজনৈতিক অস্থিরতা ও স্থান-সংক্রান্ত সমস্যার কারণে কাজে বিলম্ব হয়েছে। সময় বাড়ানোর আবেদন করা হয়েছে।’
পৌরসভার প্রশাসক ও ইউএনও ফারজানা আখতার বলেন, ‘জনবল সংকটসহ নানা কারণে এতদিন নিবিড় তদারকি সম্ভব হয়নি। শিশুমৃত্যুর ঘটনায় আমরা দুঃখিত। ঠিকাদারকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়েছে। এখন থেকে কাজ কঠোরভাবে মনিটর করা হবে।’

আরও পড়ুন

×