নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁ
নদী খননের নামে রাতের আঁধারে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন
আনন্দবাজার হাটের পাশে মেঘনা নদীতে অবৈধভাবে বালু তুলছে ড্রেজার সমকাল
শাহাদাত হোসেন রতন, সোনারগাঁ (নারায়ণগঞ্জ)
প্রকাশ: ১৯ মে ২০২৬ | ০৮:০৩
| প্রিন্ট সংস্করণ
নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁয়ে নদী খননের (ড্রেজিং) নামে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন করা হচ্ছে। তবে অভিযুক্তরা বলছেন, তারা অনুমতি নিয়ে বালু কাটছেন। কিন্তু অনুমতির সঙ্গে বাস্তবের কোনো মিল নেই। বালু কেটে ডাম্পিং করার কথা থাকলেও তা করা হচ্ছে না। বালু কেটে রাতের আঁধারে বাল্কহেড দিয়ে অন্যত্র বিক্রি করার অভিযোগ উঠেছে।
উপজেলার মেঘনা নদীর তীরবর্তী বৈদ্যেরবাজার ইউনিয়নের ঐতিহ্যবাহী আনন্দবাজার হাট সংলগ্ন পাড়ঘেঁষে চক্রটি দুই সপ্তাহের বেশি সময় ধরে অবৈধভাবে বালু তুলছে। এতে নদীর তীর দুর্বল হয়ে পড়ছে। পাড়ে হাট ছাড়াও রয়েছে একটি এলপিজি ও একটি সিমেন্ট কারখানা। অপরিকল্পিতভাবে বালু তোলায় স্থানীয় ব্যবসায়ী ও বাসিন্দাদের মধ্যে উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়েছে। দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে আনন্দবাজার হাটসহ বিভিন্ন স্থাপনা বিলীন হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন তারা।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ) থেকে মুন্সীগঞ্জের চাকদা ড্রেজিং অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং (প্রাইভেট) লিমিটেড নামে একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেঘনা নদী খননের অনুমতি পায়। কথা ছিল আনন্দবাজার হাট থেকে বারদি ইউনিয়নের ছটাকিয়া গ্রাম পর্যন্ত দেড় কিমি এলাকার নদী খনন করা হবে। নিয়ম অনুযায়ী দিনের বেলায় অনুমোদিত কাটিং ড্রেজারের মাধ্যমে নদী খনন হবে। উত্তোলিত বালু পাড়ে ডাম্পিং করে নিয়মিত বিরতিতে নিলামের মাধ্যমে বিক্রি করা হবে। কিন্তু বাস্তবে দিনে নামমাত্র ড্রেজিং করা হচ্ছে। মূল কার্যক্রম চলে রাতে। এর আড়ালে চলছে অবৈধ বালু উত্তোলন।
অভিযোগ রয়েছে, প্রতিষ্ঠানটির পক্ষে সোনারগাঁয়ের ব্যবসায়ী মোমেন সিকদারের নেতৃত্বে স্থানীয় কয়েকজন রাজনৈতিক নেতাদের ছত্রছায়ায় প্রশাসনকে ম্যানেজ করে এভাবে বালু উত্তোলন করছেন।
সরেজমিন গিয়ে দেখা যায়, বৈদ্যেরবাজার ইউনিয়নের মেঘনা নদীর তীরবর্তী আনন্দবাজার হাটের পাশে বালু ফেলে বাঁধ তৈরি করা হয়েছে। সেখানে ড্রেজিংয়ে উত্তোলন করা বালু ডাম্পিং করার কথা। কিন্তু সেখানে তেমন বালু নেই। দুই সপ্তাহে একবারও বালু নিলামে তোলা হয়নি।
স্থানীয়রা জানান, আনন্দবাজার হাটের পাশে দিনের বেলা একটি কাটিং ড্রেজার দিয়ে নামমাত্র নদী খনন করা হয়। কিন্তু সন্ধ্যা নামলেই শুরু হয় অবৈধ ড্রেজারের বিকট শব্দ। ২০ থেকে ২৫টি শক্তিশালী ড্রেজার এনে সারা রাত আনন্দবাজার হাট ও হাড়িয়া এলাকায় পাড়ের দুইশ থেকে আড়াইশ গজ দূরে নদীর তলদেশ থেকে বালু কেটে বাল্কহেডে করে অন্যত্র নিয়ে যাওয়া হয়। দিনের বেলা ড্রেজারগুলো সরিয়ে নলচর এলাকায় নিয়ে রাখা হয়।
এলাকাবাসীর অভিযোগ, এই চক্রের সঙ্গে সোনারগাঁ উপজেলা যুবদলের সদস্য ও পিরোজপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান প্রার্থী মাসুম রানা, মেঘনা উপজেলার চালিভাঙ্গা ইউনিয়ন বিএনপির সহসভাপতি আব্দুল বারেক এবং নলচর গ্রামের হাবিবুল্লাহর ছেলে রবিউল্লাহ রবিসহ বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের কয়েকজন নেতাকর্মী জড়িত।
আনন্দবাজার হাটের ব্যবসায়ীরা জানান, নদীর তীর ঘেঁষে বালু তোলার ফলে মাটির স্থিতিশীলতা নষ্ট হচ্ছে। ভাঙন শুরু হলে হাটের দোকানপাট, রাস্তাঘাট ও ঘরবাড়ি নদীতে তলিয়ে যাবে। গত বর্ষায় এ চক্রের অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের কারণে পিরোজপুর ইউনিয়নের নুনেরটেক গ্রামের প্রায় ৩০টি বসতভিটা নদীতে বিলীন হয়। ওই স্থান আনন্দবাজারের বিপরীতে অবস্থিত। এবার এ পাশে অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের ফলে নতুন করে আরও বাড়িঘর, হাটবাজার ও জমিজমা বিলীন হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
এ বিষয়ে পরিবেশ রক্ষা উন্নয়ন সোসাইটির চেয়ারম্যান মোহাম্মদ হোসাইন বলেন, আনন্দবাজার হাট ঘেঁষে রাতের আধারে ড্রেজার লাগিয়ে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন করছে একটি চক্র। কিছু রাজনীতিবিদের ছত্রছায়ায় অবৈধ বালু উত্তোলন হচ্ছে।
সোনারগাঁও পৌরসভা ছাত্রদলের সাবেক আহ্বায়ক ফরহাদ শিকদার গত শুক্রবার ফেসবুকে এক স্ট্যাটাসে দাবি করেন, প্রায় ১৫ দিন ধরে বালু কাটাকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন গণমাধ্যম ও সামাজিক মাধ্যমে সংবাদ ও আলোচনা চলছে। এ সময় তিনি স্থানীয় প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন।
অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের বিষয়ে মোমেন সিকদার বলেন, বিআইডব্লিউটিএর নিয়ম অনুযায়ী ইজারাদার নদী খননের কাজ করছেন। আমরা শুধু কাজটি দেখভাল করছি। আমার কাছ থেকে সোনারগাঁয়ের বিএনপির নেতারা কাজটি নিয়ে নিয়েছেন। তারা নিয়ম অনুযায়ী কাজ করছেন বলে জানতে পেরেছি। যদি কেউ রাতের আঁধারে অবৈধভাবে বালু কাটে, তার দায়ভার আমার নয়।
পিরোজপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান প্রার্থী ও যুবদল নেতা মাসুম রানা বলেন, নদী থেকে বালু উত্তোলনের সঙ্গে তিনি জড়িত নন। সেখানে বালু কাটার জন্য তাঁর ড্রেজার ভাড়া দিয়েছেন।
সোনারগাঁয়ের ইতিহাস-ঐতিহ্য ও প্রত্নসম্পদ সংরক্ষণ কমিটির আহ্বায়ক কবি শাহেদ কায়েস বলেন, ২০১০ থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত স্থানীয় বালু সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে ‘মায়াদ্বীপ রক্ষা আন্দোলন’ করেছি। সেই আন্দোলনের ফলে চরটি রক্ষা পেলেও ব্যাপক ক্ষতির শিকার হয়েছিল। ২০১৪ সাল থেকে ওই এলাকায় বালু উত্তোলন বন্ধ ছিল। দুঃখজনক বিষয় হলো আবার স্থানীয় প্রভাবশালী মহলের ইন্ধনে আনন্দবাজার এলাকায় রাতের অন্ধকারে বালু উত্তোলন শুরু হয়েছে। এতে জনবসতি, পরিবেশ ও নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ মারাত্মক হুমকির মুখে রয়েছে।
বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ) নারায়ণগঞ্জের উপপরিচালক মো. মোবারক হোসেন বলেন, অভিযোগের ভিত্তিতে মেঘনা নদীর আনন্দবাজার এলাকা পরিদর্শন করেছি। এখানে একটা ড্রেজার বর্তমানে বৈধ। রাতে বালু উত্তোলন করা হলে তা সম্পূর্ণ অবৈধ। যারা রাতে বালু উত্তোলনের সঙ্গে জড়িত, ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানিয়ে তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
সোনারগাঁ থানার ওসি গোলাম সারোয়ার জানান, ইউএনও স্যারের নেতৃত্বে আমরা অভিযান পরিচালনা করেছি। অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধে পুলিশের পক্ষ থেকে সর্বোচ্চ সহযোগিতা করা হচ্ছে।
সোনারগাঁ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আসিফ আল জিনাত বলেন, বিআইডব্লিউটিএর অনুমতিসাপেক্ষে নদী খননের কাজ চলছে। তবে রাতে বালু লুটপাটের বিষয়টি জানা নেই। তদন্ত সাপেক্ষে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। আমাদের কিছু সীমাবদ্ধতা আছে, রাতের বেলা নদীতে অভিযান চালানো ঝুঁকিপূর্ণ এবং জনবল সংকটও রয়েছে। তবুও আমরা চেষ্টা করছি।
নারায়ণগঞ্জ জেলা প্রশাসক মো. রায়হান কবির বলেন, রাতের বেলায় অবৈধভাবে বালু উত্তোলনকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
- বিষয় :
- নদী
