জুট মিল মাদকসেবীদের অভয়ারণ্য
তানভীর হোসাইন, ময়মনসিংহ
প্রকাশ: ২৩ মে ২০২৬ | ০৭:৫০
| প্রিন্ট সংস্করণ
গৌরীপুরের ভাঙ্গামারী ইউনিয়ন থেকে বছরদশেক আগে ভাগ্যের চাকা ঘোরাতে শম্ভুগঞ্জে এসেছিলেন পারুল বেগম। ২০১৬ সালে কাজ শুরু করেছিলেন ময়মনসিংহ জুট মিলস লিমিটেডে। টানাপোড়েনের সংসারে মিলটিই ছিল পারুলের বেঁচে থাকার অবলম্বন। কিন্তু ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর মিলটির যাত্রা থমকে দাঁড়ায়। একপর্যায়ে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে মিলের চাকা পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়।
গত বৃহস্পতিবার দুপুরে মিল চত্বরে দাঁড়িয়ে উদাস দৃষ্টিতে পারুল বেগম বলছিলেন, ‘ফেব্রুয়ারি থাইক্যা মিল এক্কেরে বন্ধ। পরিবার নিয়া না খাইয়া মরার দশা হইছে। অন্য কোথাও যে যামু, হেই কামও পাইতাছি না।’ তিনি জানান, লোকজন বেড়াতে এলে তাদের দুরবস্থা দেখে ১০০-২০০ টাকা সাহায্য দিয়ে যায়। এই সামান্য টাকা দিয়েই কোনো মতে তাদের সংসার চলছে। মিল চালু না হলে না খেয়ে মরা ছাড়া গতি নেই বলে হতাশা প্রকাশ করেন তিনি।
উৎপাদন বন্ধ হওয়ায় সিংহভাগ শ্রমিক চলে গেছেন। এই সুযোগে মাদকসেবীদের আনাগোনা বেড়ে গেছে। মিলের ভেতরে ঢুকতেই চোখে পড়ে ভুতুড়ে পরিবেশ। শ্রমিকদের জন্য নির্মিত চারতলা আবাসিক কোয়ার্টারটি অরক্ষিত। বিশাল এই ভবনে ৫৬টি কক্ষ রয়েছে। কিন্তু বৃহস্পতিবার দুপুরে ভবনের নিচতলায় গিয়ে দেখা যায়, মাত্র ৪-৫ জন বয়োবৃদ্ধ নারী-পুরুষ বারান্দায় বসে আছেন। নিচতলা থেকে চারতলা পর্যন্ত পুরো ভবনটিই খাঁ খাঁ করছে। মাত্র ৩-৪টি পরিবার কোনো উপায় না পেয়ে ঝুঁকি নিয়ে এখানে পড়ে আছে।
দীর্ঘ ১২ বছর এখানে অপারেটর হিসেবে কাজ করেছেন তারাকান্দা উপজেলার মেঘলা ভৌমিক। দুই মেয়ে নিয়ে এই কোয়ার্টারেই তাঁর বসবাস। ক্ষোভ ও শঙ্কা প্রকাশ করে তিনি জানান, দুই মাস ধরে মিল বন্ধ। আয়ের কোনো উৎস নেই। তাঁর ওপর দিন-রাত মাদকসেবীদের আনাগোনা। নিরাপত্তার অভাবে বড় মেয়েকে কয়েকদিন আগে বিয়ে দিয়েছেন। ছোট মেয়ে অষ্টম শ্রেণিতে পড়ে। তাঁকে নিয়ে প্রতিমুহূর্ত আতঙ্কে কাটে।
কর্মকর্তা-কর্মচারীদের থাকার জন্য জুট মিল চত্বরে আরও ১০-১২টি ছোট-বড় আবাসিক ভবন রয়েছে। নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহের জন্য রয়েছে নিজস্ব সাবস্টেশন। কিন্তু তদারকি ও লোকবলের অভাবে পুরো আবাসন ব্যবস্থা ধ্বংসের মুখে।
নিরাপত্তা রক্ষীরাই নিরাপত্তাহীনতায় ৬৩ দশমিক ১৮১ একর আয়তনের মিল এলাকা পাহারা দেওয়ার জন্য মাত্র ১৭ জন নিরাপত্তা কর্মী রয়েছেন। যার মধ্যে ১৩ জনই আনসার সদস্য। তাদের বেতন-ভাতা মিল থেকে দেওয়া হলেও বর্তমান পরিস্থিতিতে তারাও নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন।
দায়িত্বরত আনসার সদস্য শাহজামাল জানান, মিলের কার্যক্রম বন্ধ থাকায় পুরো এলাকায় সাধারণ শ্রমিকদের আনাগোনা কমে গেছে। এই সুযোগে বখাটে ও মাদকসেবীরা এসে আড্ডা জমায়। বাধা দিতে গেলে উল্টো মার খেতে হয়। আবাসিক লোক কম থাকায় কাজ করতে ভয় পাচ্ছেন তারা।
অথচ এই জুট মিলের অতীত এমন ছিল না। জুট মিলের প্রশাসনিক কার্যালয়ের ভেতরে গিয়ে দেখা গেল একটি বড় ঘরের ভেতর সারি সারি ১৫-২০টি কম্পিউটারের টেবিল সাজানো। সেখানেই বসেন মিলের বর্তমান ডেপুটি জেনারেল ম্যানেজার (ডিজিএম) আবুল কাশেম এবং অ্যাসিস্ট্যান্ট জেনারেল ম্যানেজার (এজিএম) আবুল কাশেম প্রশাসনিক ভবনে ৫০ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী কর্মরত আছেন।
ডিজিএম আবুল কাশেম জানান, ১৯৭৪ সালের ৯ মে বাণিজ্যিক উৎপাদনে যাওয়া এই মিলটি আশির দশকে যখন বাংলাদেশ জুট মিল করপোরেশনের অধীনে ছিল, তখন এখানে ৫-৬ হাজার শ্রমিক নিয়মিত কাজ করতেন। সে সময় এই কোয়ার্টার ও আশপাশে ১৫-২০ হাজার মানুষের বসবাস ছিল। দিন-রাত শ্রমিকদের কোলাহলে মুখর থাকত ব্রহ্মপুত্র তীরবর্তী এলাকা।
২০১৪ সালের অক্টোবর মাসে বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ‘শামীম এন্টারপ্রাইজ প্রাইভেট লিমিটেড’ মিলের দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেও প্রতিদিন ২৫-৩০ টন পাটপণ্য উৎপাদন হতো। ময়মনসিংহ অঞ্চলের স্থানীয় বাজার থেকে কাঁচা পাট কিনে গুদামজাত করা হতো। তা থেকে উৎপাদিত চট, বস্তা ও সুতা বিদেশে রপ্তানি হতো। সর্বশেষ মিলটি বন্ধ হওয়ার আগে দৈনিক উৎপাদন নেমে এসেছিল ৩ টনে।
কর্মকর্তাদের দুর্নীতি ও মালিকপক্ষের উদাসীনতা
শ্রমিকদের অভিযোগ, মিলের বেহাল অবস্থার জন্য সম্পূর্ণ দায়ী ডিজিএম আবুল কাশেম এবং তাঁর অধীনে থাকা কিছু অসাধু কর্মকর্তা। শ্রমিক মেঘলা ও পারুল বেগম জানান, মিল সচল রাখার জন্য মালিকপক্ষের টাকা ঢালার কোনো কমতি ছিল না। মালিক বারবার বিনিয়োগ করেছেন। কিন্তু ডিজিএমের নেতৃত্বে একদল অসাধু কর্মকর্তা ব্যাপক দুর্নীতি করে বারবার কাগজ-কলমে লোকসান দেখিয়েছেন। কর্মকর্তাদের এই সীমাহীন দুর্নীতির কারণে লোকসান গুনতে গুনতে মালিক একপর্যায়ে এখানে ব্যবসা করার আগ্রহ হারিয়ে ফেলেন।
এদিকে আর মাত্র এক সপ্তাহ পরেই পবিত্র ঈদুল আজহা। অথচ এখনও কোনো শ্রমিক-কর্মচারী বেতন-বোনাস পাননি। দুই মাস ধরে তাদের বেতন-ভাতা বন্ধ। বকেয়া বেতনের দাবিতে গত মঙ্গলবারও ৩০০-৪০০ শ্রমিক মিলের ভেতরে বিক্ষোভ-সমাবেশ করেন। যদিও কর্তৃপক্ষ আশ্বাস দিয়েছে, ঈদের আগেই সব পাওনা পরিশোধ করা হবে।
মিলের শ্রমিক মো. শাজাহান স্মৃতি চারণ করে বলেন, ‘১৯৮৫ সাল থেকে এই মিলে রক্ত পানি করছি। তখন সরকারি মিল ছিল। কিছু সরকারি কর্মকর্তার দুর্নীতির কারণে মিলটি লোকসানে পড়ে এবং বেসরকারি খাতে ছেড়ে দেওয়া হয়। মালিক বদল হলেও আমাগো ভাগ্যের চাকা ঘুরল না, শুধু কর্মকর্তাদের পকেট ভারী হলো।’
তবে শ্রমিকদের তোলা দুর্নীতির অভিযোগ অস্বীকার করেছেন ডিজিএম আবুল কাশেম। তাঁর ভাষ্য, তিনি দীর্ঘ ৩০ বছর বিজিএমসিতে চাকরি করার পর এখানে যোগ দিয়েছেন। মিলটি চালু রাখার জন্য মালিকপক্ষ আন্তরিকভাবে চেষ্টা করছে। ২০২৪ সালে সরকার পতনের পর সবকিছু ওলটপালট হয়ে গেছে। তাঁর বিরুদ্ধে কোনো অনিয়ম পেলে মালিক অবশ্যই ব্যবস্থা নেবেন।
শ্রমিক মোহাম্মদ এনামুল জীবনের প্রায় ৪০টি বছর এই মিলেই কাটিয়েছেন। ভাঙা গলায় তিনি বলেন, ‘মিলটা যদি আবার পুরোপুরি চালু
হইতো, তবে মরার আগে শান্তিতে দুই মুঠো খাইয়া বাঁচতে পারতাম।’
মিলের বর্তমান মালিক ময়মনসিংহ জেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি এনামুল হক শামীম। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট সরকার পতনের পর থেকেই তিনি আত্মগোপনে। মালিকের অনুপস্থিতিতে মিলের প্রশাসনিক কর্মকর্তারা মিল দেখভাল করলেও উৎপাদন শুরু করার লক্ষণ নেই।
একসময় সরকারিভাবে পরিচালিত ময়মনসিংহ জুট মিলের এই বেহাল অবস্থার পেছনে রয়েছে দীর্ঘ আইনি লড়াই ও হাতবদলের ইতিহাস। জানা গেছে, ১৯৯৩ সালের ১৩ মার্চ মিলটি লে-অফ ঘোষণা করা হয় এবং ২৭ এপ্রিল চূড়ান্তভাবে বন্ধ করে দেওয়া হয়। ১৯৯৩ সালে সিএ ফার্মের মূল্যায়ন অনুযায়ী ৬৩ একর জমির ওপর প্রতিষ্ঠিত মিলটির সম্পদের মূল্য ধরা হয়েছিল ৮৩ কোটি ৮৭ লাখ টাকা। ১৯৯৬ সালে সরকার এটি বিক্রির নিলাম ডাকলে মূল্য ওঠে মাত্র ১১ কোটি ২ লাখ টাকা। ওই মূল্যে মিলটি বিক্রি না করে, মিলের ‘শ্রমিক-কর্মচারী কল্যাণ বহুমুখী সমবায় সমিতি’র কাছে মাত্র ১১ কোটি ২ লাখ টাকায় হস্তান্তর করা হয়। শর্ত ছিল, ১ কোটি ৪৪ লাখ টাকা নগদ দিয়ে বাকি টাকা ১০ বছরে ১০টি কিস্তিতে শোধ করতে হবে। কিন্তু সমবায় সমিতি কিস্তি দিতে ব্যর্থ হয়ে ‘মেসার্স আব্বাস অ্যাসোসিয়েটস’-এর মালিক আব্বাস উল্লাহর কাছে ৮০ শতাংশ শেয়ার বিক্রি করে। এরপর শুরু হয় একের পর এক রিট, মামলা এবং নথি জালিয়াতির অভিযোগ।
দীর্ঘ আইনি লড়াইয়ের পর ২০১৪ সালের ৪ আগস্ট সরকার মিলটি পুনরায় অধিগ্রহণ করে। একই দিনে আরেকটি প্রজ্ঞাপনে পাট ও বস্ত্র মন্ত্রণালয় মিলটি পরিচালনার জন্য ‘শামীম এন্টারপ্রাইজ’-এর সঙ্গে চুক্তি করে। স্থানীয়রা বলছেন, বর্তমানে এই ৬৩ একর জমির ওপর অবস্থিত মিল ও আবাসিক কোয়ার্টারের বাজারমূল্য হাজার কোটি টাকার বেশি।
- বিষয় :
- মাদক
