ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

চট্টগ্রামে শিশু ধর্ষণ

বাকলিয়ার পর আগ্রাবাদেও অবরুদ্ধ পুলিশ

বাকলিয়ার ঘটনায় প্রস্তুতিতে ঘাটতি ছিল পুলিশের, আহত ৩০ পুলিশ সদস্য চিকিৎসাধীন

বাকলিয়ার পর আগ্রাবাদেও অবরুদ্ধ পুলিশ
×

 চট্টগ্রাম ব্যুরো 

প্রকাশ: ২৩ মে ২০২৬ | ০৯:১০ | আপডেট: ২৩ মে ২০২৬ | ০৯:১৪

| প্রিন্ট সংস্করণ

চট্টগ্রামের বাকলিয়ায় চার বছরের শিশু ধর্ষণ মামলার আসামি গ্রেপ্তারকে কেন্দ্র করে পুলিশ ও উত্তেজিত জনতার মধ্যে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ ঘটেছে। গত বৃহস্পতিবার রাতে প্রায় চার-পাঁচ ঘণ্টা ধরে চলে সংঘর্ষ। রণক্ষেত্রে পরিণত হয় গোটা তুলাতুলি এলাকা। অভিযুক্ত যুবককে জনতার হাতে তুলে দেওয়ার দাবিতে দুই গাড়িতে থাকা ১৪ পুলিশকে অবরুদ্ধ করা হয়। পরে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হলেও পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে।

এদিকে বাকলিয়ার ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতেই আগ্রাবাদ ও বায়েজিদে আরও তিন শিশুকে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগ উঠেছে। গতকাল শুক্রবার আগ্রাবাদের ঘটনায় স্থানীয় লোকজন অভিযুক্ত ব্যক্তিকে আটক করে পিটুনি দেয়। পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে গেলে উত্তেজিত জনতা প্রায় দুই ঘণ্টা তাদের অবরুদ্ধ করে রাখে। 
বাকলিয়ায় ধর্ষণকে কেন্দ্র করে উত্তেজনা সৃষ্টি হলে সুযোগ বুঝে সাধারণ মানুষের সঙ্গে যোগ দেয় স্থানীয় মাদক কারবারি, ছিনতাইকারী ও দুষ্কৃতকারীরা। এক পর্যায়ে উত্তেজিত লোকজন একটি পুলিশ ভ্যানে আগুন ধরিয়ে দেয়। এ পরিস্থিতিতে আসামিকে পুলিশের পোশাক পরিয়ে কৌশলে থানায় নিয়ে যাওয়া হয়। পরে পুলিশের পাশাপাশি র‍্যাব ও আর্মড পুলিশের বিপুল সদস্য যৌথ অভিযানে নামলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসে। 

ভয়াবহ এই সংঘর্ষের এক দিন পার হয়ে গেলেও কোনো মামলা হয়নি। সংঘর্ষের সময় আটক পাঁচ যুবক– মো. সানি, মোরশেদ,   আকাশ, সুমন ও রিয়াদকে ৫৪ ধারায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে আদালতে পাঠায় পুলিশ। শুনানি শেষে আদালত তাদের কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন। সংঘর্ষে আহত ৩০ পুলিশ সদস্য হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। 

ঘাটতি ছিল পুলিশের প্রস্তুতিতে 
গতকাল শুক্রবার নগর পুলিশের উপকমিশনার (দক্ষিণ) হোসাইন মো. কবির ভূঁইয়া বলেন, পুলিশ বাকলিয়া এলাকায় বিভিন্ন সময়ে মাদক ও ছিনতাইয়ের অভিযানে গিয়ে শতাধিক আসামি গ্রেপ্তার করে। তারা জামিনে মুক্ত হয়ে পুনরায় এই কাজে চলে আসে। তাদের সঙ্গে এলাকায় আধিপত্য বিস্তারকারী এবং কিশোর গ্যাংয়ের নেতা যারা আছে, তারা ফেসবুকে মেসেজ দিয়ে লোকজন জড়ো করে। 
তিনি বলেন, বাকলিয়ার যে ভবনে অভিযুক্তকে আটকে রাখা হয়েছিল, সেখানে বাইরে থেকে প্রথমে পাথর নিক্ষেপ করে পুলিশের ওপর হামলা করা হয়। সেজন্য সীমিত আকারে টিয়ার গ্যাসের শেল ব্যবহার করা হয়। এ সময় আরও লোকজন জড়ো হয়ে যায় এবং ঘটনাকে অন্য খাতে প্রবাহিত করতে চেষ্টা করে। পুলিশের ওপর হামলা ও সরকারি কাজে বাধা দেওয়ার অভিযোগে একটি মামলার প্রক্রিয়া চলছে বলেও জানান তিনি। 

বাকলিয়া থানার এক পুলিশ কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘সাধারণ মানুষের আবেগকে পুঁজি করে উত্তেজনা সৃষ্টি করে এলাকার দুষ্কৃতকারীরা পুলিশের ওপর হামলা চালায়। প্রথমে পুলিশের সংখ্যা কম থাকায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। পরে অতিরিক্ত পুলিশ এলাকায় এলে ধীরে ধীরে দুষ্কৃতকারীরা ছত্রভঙ্গ হয়ে যায়। তবে ঘটনাটি এত বড় হয়ে যাবে– তা প্রথমে চিন্তায় আসেনি। আমাদের আরও সতর্ক হয়ে অভিযানে যাওয়ার দরকার ছিল।’ 

আদালতে আসামির স্বীকারোক্তি 
চার বছরের শিশুকে ধর্ষণের অভিযোগের সত্যতা স্বীকার করে আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দিয়েছেন আসামি মনির হোসেন। গতকাল বিকেলে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আবু বক্কর সিদ্দিকের আদালতে তিনি এই জবানবন্দি দেন। পরে তাকে চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন আদালত। 
এর আগে কঠোর নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে দুপুরে তাকে চট্টগ্রাম আদালতে নিয়ে যায় পুলিশ। গতকাল সকালে নগরের বাকলিয়া থানায় মনিরকে একমাত্র আসামি করে ধর্ষণ মামলা দায়ের করেন ওই শিশুর বাবা। আসামি মনির কুমিল্লার মুরাদনগর উপজেলার বাখরাবাদ গ্যাস ফিল্ড ঘারঘাটা এলাকার মো. আলমের ছেলে। 

চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের জনসংযোগ কর্মকর্তা সহকারী পুলিশ সুপার আমিনুর রশিদ বলেন, ধর্ষণের শিকার শিশুটির বাবা বাদী হয়ে বাকলিয়া থানায় মামলা করেছেন। সেই মামলায় আসামিকে পুলিশ আদালতে পাঠিয়েছে। তবে রাতে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ, গাড়িতে আগুন ও মারামারির ঘটনায় এখনও মামলা করা হয়নি। 
মামলার এজাহারে উল্লেখ করা হয়, ভুক্তভোগী শিশুটির মা গার্মেন্টে চাকরি করেন। বৃহস্পতিবার গার্মেন্টে যাওয়ার আগে তিনি শিশুটিকে তার নানির বাসায় রেখে যান। নানির বাসার সামনে খেলার সময় তাকে ফুসলিয়ে পাশের এক গুদামে নিয়ে ধর্ষণ করা হয়। বৃহস্পতিবার চট্টগ্রাম নগরের বাকলিয়া থানা এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। 

অভিযুক্ত মনিরকে হাতেনাতে আটক করে জাতীয় জরুরি সেবা নম্বর ৯৯৯-এ ফোন করেন স্থানীয় লোকজন। খবর পেয়ে বাকলিয়া থানা পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে গিয়ে আসামিকে থানায় নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে। এ সময় আসামিকে গণপিটুনি দেওয়ার উদ্দেশ্যে পুলিশের হাত থেকে ছিনিয়ে নিতে চাইলে চরম উত্তেজনাকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। এক পর্যায়ে রাতে কয়েক দফায় স্থানীয় লোকজনের সঙ্গে পুলিশের রক্তক্ষয়ী সংর্ঘষ বাধে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ ফাঁকা গুলি ও টিয়ার গ্যাসের শেল নিক্ষেপ করে। এই সংঘর্ষের মধ্যে পড়ে গুলিবিদ্ধ দুই সাংবাদিকসহ অন্তত ১৫-২০ জন সাধারণ মানুষ আহত হন। 

আগ্রাবাদ ও বায়েজিদে তিন শিশুকে ধর্ষণচেষ্টা, গ্রেপ্তার ২
নগরীর বাকলিয়ার ঘটনার পর আগ্রাবাদ ও বায়েজিদে তিন শিশুকে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগ উঠে। 

দুই ঘটনায় পুলিশ কলোনি কেয়ারটেকার মো. এহেসান (৫৫) ও ভুক্তভোগীর প্রতিবেশী মো. হাসানকে গ্রেপ্তার করেছে। 
গতকাল দুপুরে আগ্রাবাদ হাজিপাড়ায় ৬ ও ১০ বছরের দুই বোনকে টিনের বেড়ার ভেতর ডেকে নেয় কেয়ারটেকার এহেসান। চিৎকার শুনে আশপাশের লোকজন এসে শিশুদের উদ্ধার করেন। পরে বিক্ষুব্ধ লোকজন অভিযুক্ত ব্যক্তিকে পিটুনি দেন। খবর পেয়ে ডবলমুরিং থানা পুলিশের একটি দল ঘটনাস্থলে পৌঁছালে পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। ক্ষুব্ধ লোকজন পুলিশের কাছ থেকে ওই ব্যক্তিকে ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে। পুলিশ সেখানে প্রায় দুই ঘণ্টা অবরুদ্ধ হয়ে পড়ে। অতিরিক্ত পুলিশ গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। ডবলমুরিং থানার এসআই সাইফুল ইসলাম খান জানান, মামলা দায়েরের পর আদালত আসামি এহেসানকে জেলহাজতে পাঠিয়েছেন। 

এদিকে, বায়েজিদের মোহাম্মদনগরে গত বৃহস্পতিবার বিকেলে পাঁচ বছরের এক শিশুকে নিজের ঘরে নিয়ে নির্যাতন করে প্রতিবেশী মো. হাসান। রাতে শিশুটি অসুস্থ হয়ে পড়লে তার মা থানায় মামলা করেন। ঘটনাটি জানাজানি হলে গতকাল শুক্রবার জুমার নামাজের পর ক্ষুব্ধ এলাকাবাসী হাসানের বাড়ি ঘেরাও করে। 

 

আরও পড়ুন

×