বরিশাল কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনাল
সরোয়ার পরিবারের বিরোধিতা, টার্মিনাল স্থানান্তর অনিশ্চিত
বরিশাল পৌরসভা থেকে সিটি করপোরেশনে উন্নীত এবং শহর বর্ধিত হওয়ায় টার্মিনালটি এখন মধ্যভাগে পড়েছে। যানবাহনও বেড়েছে অনেক গুণ সমকাল
বরিশাল ব্যুরো
প্রকাশ: ২৪ মে ২০২৬ | ০৭:৫১ | আপডেট: ২৪ মে ২০২৬ | ১১:১০
| প্রিন্ট সংস্করণ
নাগরিক দুর্ভোগের আরেক নাম বরিশাল মহানগরে নথুল্লাবাদ কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনাল। ৪০ বছর আগের এই টার্মিনালটি স্থানান্তরের জন্য বিভিন্ন সময় সিটি করপোরেশন উদ্যোগ নিলেও প্রতিবারই তা ভেস্তে যায়।
সিটি করপোরেশন প্রশাসক বিলকিস আক্তার জাহান শিরিন আবার টার্মিনালটি স্থানান্তরের উদ্যোগ নিয়েছেন। তিনি জানিয়েছেন, খুব শিগগির প্রায় দুই কিলোমিটার দূরে ট্রাক টার্মিনালে অস্থায়ী বাস টার্মিনাল করা হবে। এর বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে অবস্থান নিয়েছেন জেলা বাস মালিক সমিতি ও জেলা ট্রাক মালিক সমিতি। দুই সমিতির বিরোধিতায় এবারও বাস টার্মিনাল স্থানাস্তর অনিশ্চয়তায় পড়েছে।
বাস মালিক সমিতির ভাষ্য, অন্যত্র স্থায়ী বাস টার্মিনাল না হওয়া পর্যন্ত তারা নথুল্লাবাদ টার্মিনাল ছাড়বেন না। ট্রাক মালিক সমিতি বলছে, তাদের জন্য নির্মিত টার্মিনালে বাস রাখতে দেওয়া হবে না। এ দুটি সংগঠন জোটবদ্ধ হয়ে টার্মিনাল স্থানান্তর ঠেকাতে ভেতরে ভেতরে প্রস্তুতি নিচ্ছে।
জানা গেছে, বরিশাল-৫ আসনের সংসদ সদস্য মজিবর রহমান সরোয়ারের ছোট ভাই মোশারফ হোসেন বাস মালিক সমিতির সভাপতি। ট্রাক মালিক সমিতির সভাপতি সাইদুর রহমান মামুন সরোয়ারের শ্যালক। ৫ আগস্টের পর এ দুজন দুটি সংগঠনের নেতৃত্বে আসেন। এর আগে বিএনপি যতবার ক্ষমতায় এসেছে সরোয়ার ও তাঁর ভাইয়েরা বাড়ির কাছের কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনাল নিয়ন্ত্রণ করেছেন। এ ছাড়া বরিশাল বিএনপিতে আধিপত্য বিস্তারের রাজনীতিতে এমপি সরোয়ার ও সিটির প্রশাসক শিরিন একে অপরের প্রতিপক্ষ।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ১৯৮৬ সালে কাশীপুর ইউনিয়নের নথুল্লাবাদে সাড়ে ৪ একর জমিতে কেন্দ্রীয় বাস টর্মিনালটি স্থাপিত
হয়েছিল। বরিশাল পৌরসভা থেকে সিটি করপোরেশনে উন্নীত এবং শহর বর্ধিত হওয়ায় টার্মিনালটি এখন মধ্যভাগে পড়েছে। যানবাহনও বেড়েছে অনেক গুণ। বিশেষ করে পদ্মা সেতু চালুর পর দক্ষিণাঞ্চলে
পরিবহন ব্যবসা
প্রসারিত হয়। ঢাকা থেকে কুয়াকাটাসহ বিভাগের চার জেলার পরিবহন নথুল্লাবাদ কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনাল হয়ে নগরের ভেতর দিয়ে যাতায়াত করে। টার্মিনালের ভেতরে স্থান সংকটের
জন্য বাস রাখা হয় মহাসড়কের ওপর।
এসব কারণে নথুল্লাবাদ এলাকায় যানজট স্থায়ী রূপ নিয়েছে। অন্তত ১৫ বছর আগে সে সময়ের মেয়র শওকত হোসেন হিরণ নগরের প্রবেশমুখ গড়িয়ারপাড়ে নতুন বাস টার্মিনালের জন্য ১২ একর নিচু জমি অধিগ্রহণ করেছিলেন। এরপর আর অগ্রগতি হয়নি।
জানা গেছে, প্রায় দুই সপ্তাহ আগে প্রশাসক শিরিন ঘোষণা দেন, নথুল্লাবাদ থেকে বাস টার্মিনালটি স্থানান্তর করে ২৯ নম্বর ওয়ার্ডের কাশীপুর হাইস্কুল অ্যান্ড কলেজের সামনে ট্রাক টার্মিনালে নেওয়া হবে। গড়িয়ারপাড়ে স্থায়ী বাস টার্মিনাল নির্মাণ শেষ হলে পরে সেখানে স্থায়ীভাবে স্থানান্তর করা হবে। এর আগ পর্যন্ত গড়িয়ারপাড়ে বাসের নির্ধারিত জমি অস্থায়ী ট্রাক টার্মিনাল হিসেবে ব্যবহৃত হবে। এর প্রস্তুতি হিসেবে গড়িয়ারপাড়ের জমিতে বালু ফেলে উঁচু করার কাজও শুরু হয়।
সিটি করপোরেশনের এ উদ্যোগে বাদ সাধে বাস ও ট্রাক মালিক সমিতি। ভেতরে ভেতরে তারা সংগঠিত হন ও সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোকে জানিয়ে দেন, তারা নিজ নিজ অবস্থান ছেড়ে যাবেন না। এ নিয়ে সৃষ্ট সমস্যা সমাধানে গত শুক্রবার সকালে বিভাগীয় কমিশনারের বাসায় সিটি করপোরেশন এবং বাস ও ট্রাক সমিতির নেতাদের নিয়ে ত্রিপক্ষীয় বৈঠক হয়।
জানতে চাইলে সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. রেজাউর বারী সমকালকে বলেন, নথুল্লাবাদ থেকে কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনাল স্থানাস্তরের সিদ্ধান্ত বহাল আছে। সে অনুযায়ী কাজ চলছে। আপাতত দূরপাল্লার পরিবহন ট্রাক টার্মিনালে স্থানান্তর করা হবে। অভ্যন্তরীণ বাস নথুল্লাবাদে বহাল থাকবে। ধাপে ধাপে পরে সব সরিয়ে নেওয়া হবে।
তবে সভায় এমন সিদ্ধান্ত হয়নি বলে দাবি করেন বাস মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মনোয়ার হোসেন। তিনি বলেন, বিভাগীয় কমিশনারের বাসার সভায় বাস টার্মিনাল স্থানান্তরের সিদ্ধান্ত স্থাগিত হয়েছে। গড়িয়ারপাড়ে নতুন বাস টার্মিনাল না হওয়া পর্যন্ত তারা কোথাও যাবেন না। মনোয়ারের তথ্য মতে, বরিশাল মালিক সমিতিভুক্ত ২০০ বাস এবং দূরপাল্লার বাস রয়েছে সহস্রাধিক।
ট্রাক মালিক সমিতির সভাপতি সাইদুল রহমান মামুন বলেন, ২০১৬ সালের দিকে সিটি করপোরেশন ৮ একর জমি অধিগ্রহণ করে আমাদের জন্য ট্রাক টার্মিনাল করেছে। এখনও সব কাজ শেষ না হওয়ায় টার্মিনালের পুরোটা ব্যবহার করা যাচ্ছে না। আমাদের টার্মিনাল ছেড়ে অন্য কোথাও যাব না। বিভাগীয় কমিশনারে সঙ্গে সভায় এ কথা জানিয়ে দিয়েছি।
বিভাগীয় কমিশনার মো. খলিলুর রহমান সমকালকে বলেন, শুক্রবারের বৈঠকে পরিবহন সংগঠন নেতারা যেসব অজুহাত দেখিয়েছেন তার সব ঠিক নয়। এসব নিয়ে অনেক বাগ্বিতণ্ডা হয়েছে। বিষয়টি এখন রাজনৈতিকভাবে সমাধান করতে হবে। বিভাগীয় কমিশনার আরও বলেন, পরিবহন নেতাদের জানিয়ে দেওয়া হয়েছে, তাদের আইন মানতে হবে। রাস্তার ওপর বাস-ট্রাক রাখা হলে জরিমানা করা হবে।
সভা থেকে বিদেশে অবস্থানরত স্থানীয় এমপি মজিবর রহমান সরোয়ারের সঙ্গে মোবাইল ফোনে কথা বলে সমকাল। তিনি বলেন, বরিশালে ফিরে এসব নিয়ে সবার সঙ্গে বসব।
এর আগে ২০২৩ সালের শুরুর দিকে তৎকালীন মেয়র সেরনিয়াবাত সাদিক আবদুল্লাহ বাস টার্মিনাল স্থানাস্তরের উদ্যোগ নিয়েছিলেন। তখন করপোরেশনের অর্থায়নে ট্রাক টার্মিনালের উন্নয়নসহ ৭০টি কাউন্টার নির্মাণ করা হয়। সাদিকের রাজনৈতিক দাপটের কারণে তখন প্রকাশ্যে এর বিরোধিতা কেউ করেনি। তবে
এটি বাস্তবায়নের আগেই সাদিক পরবর্তী নির্বাচনে দলের মনোনয়নবঞ্চিত হলে উদ্যোগটি ভেস্তে যায়।
- বিষয় :
- টার্মিনাল
