১০ মাস বন্দিদশা শেষে লিবিয়া থেকে দেশে ফিরলেন রায়হান
ছবি : সমকাল
নবীগঞ্জ (হবিগঞ্জ) প্রতিনিধি
প্রকাশ: ২৬ মে ২০২৬ | ০৫:২৮
ইতালিতে পাঠানোর প্রলোভন দেখিয়ে লিবিয়ায় নিয়ে ১০ মাস ধরে আটকে রেখে নির্যাতনের শিকার হন হবিগঞ্জের নবীগঞ্জ উপজেলার যুবক রায়হান চৌধুরী (৩০)। দীর্ঘ বন্দিদশা শেষে অবশেষে দেশে ফিরেছেন তিনি। তার ফিরে আসায় পরিবারে স্বস্তি ফিরেছে।
রায়হান নবীগঞ্জ উপজেলার আউশকান্দি ইউনিয়নের বেতাপুর গ্রামের আবু তাহের চৌধুরীর ছেলে। গত ২৪ মে রাতে তিনি দেশে ফেরেন। লিবিয়ায় বাংলাদেশ দূতাবাসের সহযোগিতায় ‘আউট পাস’ (জরুরি ট্রাভেল পারমিট) এবং আইনি সহায়তার মাধ্যমে তাকে দেশে ফিরিয়ে আনা হয়। আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা (আইওএম) পুরো প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ায় সহায়তা করে।
দেশে ফিরে রায়হান জানান, ইতালিতে পাঠানোর কথা বলে মানবপাচারকারী চক্র তাকে প্রথমে সৌদি আরব, পরে মিশর হয়ে লিবিয়ায় নিয়ে যায়। সেখানে পৌঁছানোর পর তাকে একটি ঘরে বন্দি করে রাখা হয়। প্রতিদিন অস্ত্রের মুখে রেখে পরিবারের সঙ্গে কথা বলানো হতো। তার দাবি, একে-৪৭ হাতে দুইজন পাহারাদার তাকে নজরদারিতে রাখত।
তিনি বলেন, প্রতিদিন নির্যাতন করা হতো। আমাকে মারধর করে কোমরের মেরুদণ্ড ক্ষতিগ্রস্ত করা হয়েছে। সারাদিনে একটি রুটি খেতে দিত। ১০ মাসে কোনোদিন ভাত খেতে পারিনি।
রায়হান জানান, বিভিন্ন সময় মুক্তিপণ হিসেবে তার পরিবারের কাছ থেকে প্রায় ৪০ লাখ টাকা আদায় করা হয়। এরপরও তাকে ইতালি পাঠানো হয়নি। একপর্যায়ে হাত-পা কেটে পঙ্গু করার হুমকি দেওয়া হয়। পরে সুযোগ বুঝে আরও কয়েকজনের সঙ্গে পালিয়ে যান তিনি।
তিনি বলেন, আমরা ১৫ জন একটি কক্ষে ছিলাম। এক রাতে একজন পাহারাদার খাবার আনতে যায়, আরেকজন ঘুমিয়ে পড়ে। তখন তাকে বেঁধে রেখে দরজার তালা ভেঙে পালাই। পরে বেনগাজীতে পুলিশের হাতে ধরা পড়ে দুই মাস জেলে ছিলাম। সেখান থেকে আইওএমের মাধ্যমে দেশে ফিরেছি।
তিনি আরও জানান, গত বছরের আগস্টে তার সহপাঠী শামীম ওমরাহ ভিসায় তাকে সৌদি আরবে নিয়ে যায়। পরে মিশর হয়ে লিবিয়ায় নেওয়া হয়। সেখানে পৌঁছানোর পর থেকেই তিনি পাচারকারী চক্রের জিম্মায় ছিলেন।
এ ঘটনায় রায়হানের বাবা আবু তাহের চৌধুরী গত ১৫ ফেব্রুয়ারি নবীগঞ্জ থানায় মানবপাচার আইনে মামলা দায়ের করেন। মামলার এজাহারে উল্লেখ করা হয়, পূর্বপরিচয়ের সূত্র ধরে শামীম ও তার সহযোগীরা রায়হানকে ফ্রি ভিসায় ইতালি নেওয়ার প্রলোভন দেয়। পরে বিভিন্ন সময়ে ২৭ লাখ ৯০ হাজার টাকাসহ বিপুল অর্থ হাতিয়ে নেয় তারা।
মামলায় আরও বলা হয়, রায়হানকে নির্যাতনের ভিডিও পরিবারের সদস্যদের দেখিয়ে আরও টাকা আদায় করা হয়। একপর্যায়ে তার একটি আঙুল কেটে ফেলার অভিযোগও রয়েছে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে টাকা না দিলে হাতের কবজি কেটে ফেলার হুমকি দেওয়া হয়। বাধ্য হয়ে পরিবার জমি ও স্বর্ণ বিক্রি করে টাকা পরিশোধ করে।
রায়হানের বাবা আবু তাহের চৌধুরী বলেন, ছেলেকে ফিরে পেয়ে আমরা খুশি। কিন্তু মামলা তুলে নিতে এবং আসামিদের জামিন করিয়ে দিতে এখন বিভিন্নভাবে হুমকি দেওয়া হচ্ছে।
দেশে ফিরে রায়হান চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। একই সঙ্গে মানবপাচারকারী চক্রের বিচার দাবি করেছেন তিনি।
