ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

নয় বছরেও ফেরেনি রোহিঙ্গারা, কাঁটাতারের ভেতরেই আরও একটি ঈদ

নয় বছরেও ফেরেনি রোহিঙ্গারা, কাঁটাতারের ভেতরেই আরও একটি ঈদ
×

ছবি: সমকাল

টেকনাফ প্রতিনিধি

প্রকাশ: ২৮ মে ২০২৬ | ০৯:৪৬

পবিত্র ঈদুল আজহা এলেও আনন্দের বদলে দীর্ঘশ্বাস আর অনিশ্চয়তাই যেন সঙ্গী হয়েছে কক্সবাজারের রোহিঙ্গা শরণার্থী বাসিন্দাদের। উখিয়া ও টেকনাফের ক্যাম্পগুলোতে বৃহস্পতিবার সকাল সাড়ে ৭টায় ঈদের জামাত অনুষ্ঠিত হলেও, নয় বছর ধরে নিজভূমি থেকে বিচ্ছিন্ন লাখো রোহিঙ্গার জীবনে উৎসবের সেই চিরচেনা আবহ আর নেই।

বাংলাদেশে আশ্রিত প্রায় ১২ লাখ রোহিঙ্গার অনেকেই এবারও ঈদ কাটিয়েছেন অভাব, হতাশা ও অনিশ্চয়তার মধ্যে। দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও একজন রোহিঙ্গাকেও স্থায়ীভাবে নিজ দেশে ফেরত পাঠানো সম্ভব হয়নি। বরং নতুন করে বাড়ছে অনুপ্রবেশের চাপ।

গত বছরের রমজানে কক্সবাজারের কুতুপালং শিবিরে রোহিঙ্গাদের সঙ্গে ইফতার অনুষ্ঠানে ড. মুহাম্মদ ইউনূস বলেছিলেন, ‘এই ঈদে না হোক, আগামী ঈদে রোহিঙ্গারা নিজ দেশে ঈদ করতে পারবে।’ জাতিসংঘ মহাসচিবকে পাশে রেখে দেওয়া সেই আশ্বাসে আশাবাদী হয়ে উঠেছিল শিবিরের বাসিন্দারা। তবে এক বছর পেরিয়ে গেলেও প্রত্যাবাসনে দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি হয়নি।

উল্টো নতুন করে দেড় লাখের বেশি রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট সূত্র। ঈদ এলেও শরণার্থী শিবিরগুলোতে নেই উৎসবের আমেজ। উখিয়া ও টেকনাফের ৩২টি ক্যাম্পে থাকা রোহিঙ্গাদের অধিকাংশই মানবেতর জীবনযাপন করছেন। খাবারের সংকট, নিরাপদ পানির অভাব, অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ ও অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ তাদের জীবনকে আরও দুর্বিষহ করে তুলেছে।

এ বিষয়ে টেকনাফের লেদা শিবিরের ডেভেলপমেন্ট কমিটির চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আলম বলেন, ‘কোরবানির ঈদ হলেও আমাদের ক্যাম্পে সরকারের পক্ষ থেকে কোনো ধরনের মাংস সহায়তা পাওয়া যায়নি। টানা তিন বছর ধরে এ ধরনের সহায়তা বন্ধ রয়েছে। তাছাড়া ঈদ এলেও আমাদের মাঝে তেমন আনন্দ কাজ করে না। কারণ নিজ দেশে ঈদ উদযাপন আর ভিনদেশে শরণার্থী হয়ে ঈদ পালন করার মধ্যে অনেক পার্থক্য রয়েছে। মিয়ানমারে আমাদের বাপ-দাদার কবর রয়েছে। যুগের পর যুগ সেখানে বসবাস করেছি। ঈদের নামাজ শেষে পরিবারের সবাই মিলে কবর জিয়ারত করতাম। এখন আর সেই সুযোগ নেই। এর চেয়ে কষ্টের আর কী হতে পারে?’

ড. মুহাম্মদ ইউনূসের বক্তব্যের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, ‘ক্যাম্প পরিদর্শনের সময় সাবেক প্রধান উপদেষ্টা বলেছিলেন, রোহিঙ্গারা যেন আগামী ঈদ নিজেদের মাতৃভূমিতে উদযাপন করতে পারে—এমন প্রত্যাশা তিনি করেন। সেই কথা শুনে আমাদের মাঝেও নিজ দেশে ফেরার স্বপ্ন নতুন করে জেগে উঠেছে। ঈদের নামাজে আমরা দোয়া করেছি, এটাই যেন বাংলাদেশে আমাদের শেষ ঈদ হয়। আগামী ঈদ যেন নিজভূমি আরাকানে পরিবার-পরিজন নিয়ে উদযাপন করতে পারি, এটাই আমাদের সবচেয়ে বড় প্রত্যাশা।’

টেকনাফের মৌচনী নতুন রোহিঙ্গা শিবিরের বাসিন্দা সৈয়দ আলম বলেন, ‘থাকা-খাওয়ার যে অবস্থা, সেখানে ঈদের কথা ভাবার সুযোগই নেই। ছেলেকে নতুন জামা কিনে দিতে পারিনি। পেটের খাবার জোগাড় করাই এখন সবচেয়ে বড় চিন্তা। আগের চেয়ে এখন রেশনও কমে গেছে।’

উখিয়ার বালুখালী ক্যাম্পের বাসিন্দা দিল মোহাম্মদ বলেন, ‘গত বছর বলা হয়েছিল ২০২৬ সালের ঈদ আমরা নিজ দেশ মিয়ানমারে উদযাপন করবো। কিন্তু এবারও কাঁটাতারের ভেতরেই বন্দী হয়ে ঈদ কাটাতে হচ্ছে।’

রোহিঙ্গা সংগঠনগুলোর নেতারাও প্রত্যাবাসন নিয়ে হতাশা প্রকাশ করেছেন। আরাকান রোহিঙ্গা সোসাইটি ফর পিস অ্যান্ড হিউম্যান রাইটসের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ জোবায়ের বলেন, ‘রোহিঙ্গাদের ঈদ মানেই এখন বিষাদের ঈদ। ক্যাম্প বন্দী জীবন খুব কঠিন। নিজভূমিতে ঈদ উদযাপনের যে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল, তা বাস্তবায়ন না হওয়ায় ক্যাম্পগুলোতে হতাশা তৈরি হয়েছে।’

এদিকে শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার (আরআরআরসি) মিজানুর রহমান বলেন, ‘আশ্রয়শিবিরে বিভিন্ন সেবা ও উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডে যুক্ত অনেক এনজিও তহবিল সংকটে রয়েছে। এ কারণে এবার কোরবানির পশুর সংখ্যা কমে গেছে। গত বছর দেড় কেজি করে মাংস বিতরণ করা হয়েছিল। এবার উখিয়া ও টেকনাফের ৩৩টি আশ্রয়শিবিরে থাকা দুই লাখ রোহিঙ্গা পরিবারে এক কেজি করে মাংস বিতরণ করা হবে।’

উল্লেখ্য, ২০১৭ সালের ২৫ আগস্টের পর মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে সেনা অভিযান ও নির্যাতনের মুখে পালিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেয় লাখো রোহিঙ্গা। বর্তমানে উখিয়া ও টেকনাফের শরণার্থী শিবিরগুলোতে ১২ লাখের বেশি রোহিঙ্গা অবস্থান করছে।

বছরের পর বছর কাঁটাতারের ভেতর বন্দী জীবন কাটাতে কাটাতে রোহিঙ্গাদের সবচেয়ে বড় আকাঙ্ক্ষা এখন একটাই—নিজভূমি আরাকানে নিরাপদ ও সম্মানজনকভাবে ফিরে গিয়ে পরিবারের সঙ্গে আবারও ঈদ উদযাপন করা।

আরও পড়ুন

×