ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

মৌলভীবাজার

অনেকেই চামড়া রেখেছেন পুঁতে, কেউ ভাসিয়েছেন নদীতে

অনেকেই চামড়া রেখেছেন পুঁতে, কেউ ভাসিয়েছেন নদীতে
×

হাটে আনা কোরবানির চামড়া

মৌলভীবাজার প্রতিনিধি

প্রকাশ: ৩০ মে ২০২৬ | ১৯:৩১ | আপডেট: ৩০ মে ২০২৬ | ১৯:৩৩

কোরবানির চামড়া কেনার মানুষ মেলেনি মৌলভীবাজারের গ্রামীণ জনপদে। অন্যান্য বছরের মত এবার চামড়া সংগ্রহে গণহারে ঘরে ঘরে ধর্না দেয়নি এতিমখানা ও মাদ্রাসার শিক্ষার্থীরা। এতে গ্রামে গ্রামে বিকাল অবধিও অনেকে চামড়া বিক্রি করতে পারেননি। শেষমেশ অনেকে মাটি খুঁড়ে চামড়া পুঁতে রাখেন, কেউ কেউ নদী-জলাশয়ে ভাসিয়ে দেন।  

হতাশা জানিয়ে সদর উপজেলার আমতৈল গ্রামের নওয়াব আলী বলেন,  ‘দু’খান চামড়া ৩০০ টাকায় কিনেছিলাম। আর ১০ খান চামড়া কোরবানি দাতারা দান করেছিলেন। শহরের পৌর বাস টার্মিনালে বিক্রি করতে এসে কোনো ক্রেতা এক টাকাও দাম দিতে রাজি নয়। এখন আসা-যাওয়ার রিক্সা ভাড়াসহ গচ্চা গেল। এতে আমের সাথে ছালাও গেছে।’ 

সঙ্গে থাকা চামড়া কোথায় ফেলে যাবেন সেই চিন্তায় নওয়াব আলীর চোখ-মুখ ছিল ফ্যাকাসে। এই চিত্র শুক্রবার বিকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত জেলার প্রধান চামড়া কেনাবেচার হাট বালিকান্দিসহ প্রায় সর্বত্র দেখা গেছে। 

সরেজমিন ঘুরে জানা যায়, মৌলভীবাজার সদর উপজেলার বালিকান্দি গ্রামে আজ থেকে প্রায় ২০০ বছর আগে চামড়া কেনাবেচার হাট শুরু হয়। এই গ্রামের এক সময়ের চামড়া ব্যবসায়ী সৈয়দ মুজাহিদ আলী বলেন, বংশ পরম্পরায় এই গ্রামের মানুষ কাঁচা চামড়ার ব্যবসা করে আসছে। কিন্তু গত ১০-১২ বছর ধরে চামড়ার বাজারে ধস নেমেছে। ফলে অনেকে বাপ-দাদার ঐতিহ্যবাহী ব্যবসা ছেড়ে অন্য পেশায় চলে গেছেন। তাদের অনেকের কারো লাখ লাখ, কারো কোটি কোটি টাকা ট্যানারি মালিকরা আটকিয়ে পথে বসিয়েছেন। 

সত্তরোর্ধ্ব বয়েসী চামড়া ব্যবসায়ী সুলেমান মিয়া গত শুক্রবার দিবাগত রাত সাড়ে ৯টার দিকে জানান, এখন পর্যন্ত  ৫০০টিরও বেশি চামড়া কেনা হয়েছে। ক্রয় করা চামড়ার মধ্যে ১০০ থেকে ৭০০ টাকা পর্যন্ত দাম রয়েছে। তিনি বলেন, ‘সারারাত চামড়া বেচাকিনি চলবে। শেষ পর্যন্ত কতো পিস কেনা হয় আগাম বলা যাবে না।’ তবে প্রয়োজনী লবণের অভাবে ক্রয় করা সব চামড়া প্রক্রিয়াজাত করা সম্ভব হবে না বলেও আশঙ্কা প্রকাশ করেন তিনি। ফলে নষ্ট চামড়া নিয়ে বিপাকে পড়তে হবে।

বালিকান্দিবাজার চামড়া ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি শওকত আলী মেম্বার সমকালকে বলেন, ‘ট্যানারি মালিক ও আড়তদারদের কাছে গত বছরের ৯৫ লাখ টাকা বকেয়ার এক টাকাও দেইনি। এ বছর বাকি দুই হাজারের মত চামড়া ক্রয় করে লবণ লাগানো হয়েছে।’ তিনি জানান,  এখন প্রয়োজন তিন-চারশ মণ লবণ। অথচ মজুত আছে মাত্র দেড়শ মণ। লবণের অভাবে দুর্গন্ধ ধরা চামড়া ও বর্জ্য মাটি চাপা দিতে হবে, নয়তো  মনু নদের জলে ভাসিয়ে দেওয়া ছাড়া উপায় নেই।  

১৫০ থেকে ৬০০ টাকা মূল্যের চামড়া কেনা হয়েছে জানিয়ে অভিযোগের সুরে এই চামড়া ব্যবসায়ী বলেন, ‘এতিমখানার হুজুরদের ন্যায্যমূল্যে লবণ দেওয়া হলেও তারা একটি চামড়াও প্রক্রিয়াজাত করেন না। তারা লবণের ডিও বিক্রি করে দেন ব্যবসায়ীদের কাছে।’ 

চামড়া থেকে মাংস আলাদা করা শ্রমিক মাহমদ আলী জানান,  যেসব চামড়া কেনাবেচা হচ্ছে সবই ১০০ থেকে ১৫০ টাকায়। তিনি বলেন, ‘চামড়া ব্যবসায়ীরা গল্প মারেন যে ৬০০-৭০০ টাকায় চামড়া কিনেছেন। কিছু এতিমখানার হুজুররা চামড়া লইয়া অমুক-তমুকের লগে ধর্না দিলেও কেউ কিনতে রাজি হচ্ছে না।’ 

সিলেটের বালাগঞ্জ উপজেলার আব্দুস শহীদ বলেন,  ‘৩০ খান চামড়া ছয় হাজার টাকা দিয়ে কিনে এনে বিপদে পড়েছি। ৩০-৪০ টাকা চামড়ার দাম বলছেন ক্রেতারা। তাই ঝির লগে পুতের বউ গাড়ি ভাড়া দিয়ে চামড়া কোথায় ফেলবেন হেই চিন্তায় আছি। এক এতিমখানার হুজুররা ১০০ চামড়া চার হাজার টাকায় বিক্রি করে ট্রাকের ভাড়া পরিশোধ করেছে।’

সরেজমিনে দেখা যায়, বালিকান্দিবাজারসহ রাস্তাঘাটে অসংখ্য মানুষ চামড়া থেকে মাংস ছিলা, লবণ লাগানোতে ব্যস্ত রয়েছেন। এসব কাজে জড়িত শ্রমিকদের দিন-রাতে হাজার থেকে সাড়ে তিন হাজার টাকা মুজুরি রয়েছে। মাংস ছিলা অনেকে চামড়া থেকে ছাড়ানো মাংস নেওয়ার শর্তে কাজ করেন। তারা এই মাংস দুই-আড়াইশ টাকা কেজিতে বিক্রি করছেন। এই তথ্য জানালেন চামড়া শ্রমিক দুলাল মিয়া। 

চামড়া ব্যবসায়ী মোহাম্মদ আলী বলেন, ‘আগেকার দিনে সারা বছর বালিকান্দির অন্তত ২৫-৩০ জন চামড়া কেনাবেচা করতেন। এখন শওকত মেম্বার, সুলেমান মিয়া, আনোয়ার মিয়া, জামাল মিয়া, সানুর মিয়া জড়িত রয়েছেন। আরও ২০-২৫ জন মৌসুমী ব্যবসায়ী রয়েছেন।’
 

আরও পড়ুন

×